ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মঙ্গলবারটা সম্ভবত ভুলবেন না। ভারতীয় সময় অনুযায়ী বুধবার, আমেরিকান ঘড়িতে তখনও মঙ্গলবার, জনমত স্পষ্ট হয়ে গেল। আর সেই জনমতের সূচিমুখ একটাই— আমেরিকা খুশি নয় ট্রাম্পকে নিয়ে। নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের সার্বিক জয়ে এই বার্তাটা পরিষ্কার।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এটাই ছিল প্রথম বড় মাপের ভোট। নিউ ইয়র্কে মেয়র পদে জ়োহরান মামদানি জিতলেন। ভার্জিনিয়া এবং নিউ জার্সির গভর্নর পদে জিতলেন মধ্যপন্থী বলে পরিচিত দুই মহিলা ডেমোক্র্যাট— অ্যাবিগেল স্প্যানবার্গার এবং মিকি শেরিল। এবং ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে জিতে মামদানির মতোই ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত গাজ়ালা হাশমি।
অ্যাবিগেল স্প্যানবার্গার। ছবি: পিটিআই।
মিকি শেরিল। ছবি: রয়টার্স।
গাজ়ালার জন্ম ভারতের হায়দরাবাদে। চার বছর বয়সে আমেরিকায় চলে যান। গাজ়ালার বাবা জিয়া হাশমি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী, পরে সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। নিজে দুই মেয়ের মা গাজ়ালাও প্রায় ৩০ বছর অধ্যাপনা করেছেন। রাজনীতিতে এলেন ২০১৯ সালে। সবাইকে চমকে দিয়ে ভার্জিনিয়া জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে রিপাবলিকানদের থেকে একটি আসন ছিনিয়ে নিলেন। ২০২৪-এ ভার্জিনিয়া সেনেটের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য কমিটির চেয়ারপার্সন। ভার্জিনিয়া সেনেটে গাজ়ালাই প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয়, মামদানির মতোই। এই গাজ়ালাই এ বার সরাসরি লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে। ট্রাম্পের বিরোধী স্বর হিসেবে তাঁর পরিচিতি যথেষ্ট।
গাজ়ালা হাশমি। ছবি: পিটিআই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা এর পাশাপাশি আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্যালিফোর্নিয়া এবং পেনসিলভেনিয়াকে। ক্যালিফোর্নিয়াতে ভোট ছিল আসন পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবকে ঘিরে। ট্রাম্পের পরামর্শ মেনে এ বছর টেক্সাসে আসন পুনর্বিন্যাস হয়েছে। অর্থাৎ ডিস্ট্রিক্টগুলিকে এমন ভাবে পুনঃসীমায়িত করা হয়েছে, যাতে রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোর সুবিধা হয়। এর পাল্টা হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ‘প্রোপোজ়িশন ৫০’ নামে একটি প্রস্তাব আনেন, যাতে ক্যালিফোর্নিয়ার ডিস্ট্রিক্টগুলিকে এমন ভাবে পুনঃসীমায়িত করা যায়, যাতে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা হবে। এই ভোটে সেই প্রস্তাবকে জিতিয়ে এনে নিউসম বলেছেন, ‘‘এটা শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার জয় নয়, এটা গোটা দেশের জয়।’’ ইলিনয়, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড এবং নিউ ইয়র্ককেও একই পথে হাঁটার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি এবং সেটা যদি সফল হয়, তা হলে ২০২৬-এর অন্তর্বর্তী হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনে ট্রাম্পের মাথাব্যথার কারণ আছে।
পেনসিলভেনিয়া দোদুল্যমান বা ‘সুইং স্টেট’ বলে পরিচিত। অর্থাৎ কখনও লাল, কখনও নীল। সেই পেনসিলভেনিয়ার স্টেট সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন ছিল। সেখানে তিন জন বিচারপতিই তাঁদের আসন ধরে রাখলেন, ফলে ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য বজায় রইল। ফলে আগামী দিনে ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে তাদের হাত শক্ত হয়ে রইল।
মঙ্গলবারের ফলাফল বুঝিয়ে দিল— মামদানির জয় ঐতিহাসিক বটে, কিন্তু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া বা ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা কেউই মামদানির মতো সমাজবাদী নন। কিন্তু প্রত্যেকের প্রচারেই অভিন্ন সুর ছিল দু’টি— ট্রাম্পের বিরোধিতা আর জনতার পক্ষে সাশ্রয়ী নীতি ও প্রকল্পের উপরে জোর। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার— নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া এবং সাম্প্রতিক কালে ক্যালিফোর্নিয়াও ‘নীল রাজ্য’ বা ডেমোক্র্যাট ঘাঁটি বলেই পরিচিত। ফলে সে দিক থেকে এই ফলাফল খুব অপ্রত্যাশিত হয়তো নয়। তবে ২০২৪-এর নভেম্বরে যে আমেরিকা দ্বিতীয় বার ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছিল, এক বছরে সেই ট্রাম্প-প্রীতি দৃশ্যত ক্ষইতে শুরু করেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)