বাংলাদেশ সদ্য হয়ে যাওয়া নির্বাচনে বিএনপি-র ভরাডুবির সঙ্গে, ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের বিপর্যয়ের তুলনা টানলেন শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এটা মানুষকে না জানাতে পারলে, ফল ভাল হয় না।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক কথায় ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে হাসিনার আওয়ামি লিগ। সেই জয়ের দু’দিন পর বিদেশ থেকে আসা সাংবাদিক এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের মুখোমুখি হলেন দলনেত্রী। মঙ্গলবার ঢাকার শের-ই বাংলা নগরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ওই বৈঠক হয়। গণভবনে হাসিনার সঙ্গে এ দিনের বৈঠকে ছিলেন তাঁর দুই উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং গওহর রিজভি। এ ছাড়া ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব বিপ্লব বড়ুয়া।

৩০০টির মধ্যে ২৯৯ আসনে গত রবিবার নির্বাচন হয়। এর মধ্যে একটি আসনের ফলঘোষণা এখনও বাকি। রবিবার ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়, বিরোধীদের ভরাডুবি ঘটছে। ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি। তাঁর দল আওয়ামি লিগ একক ভাবেই জিতেছে ২৫৫টিতে। সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনও অস্তিত্বই থাকল না।

 

স্বাভাবিক ভাবেই, হাসিনাকে এ দিন বেশ খোশমেজাজে দেখা গিয়েছে। মাঝে মাঝে মজা করেও কথা বলছিলেন। জাতীয় সংসদে বিরোধীদের ধুয়েমুছে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি ভারতীয় রাজনীতির উদাহরণ তুলে ধরেন। কংগ্রেসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘গত নির্বাচনে ওরা ক’টা আসন পেয়েছিল? আসলে ভোটে জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, কংগ্রেস সেটা ঠিক করেনি। এত বছরের পুরনো একটা দল। কিন্তু দলের নেতা কে হবেন, সেটা স্পষ্ট করতে পারেনি। আর সে কারণেই মানুষ ওদের ভোট দেয়নি।’’ হাসিনার আরও সংযোজন, ‘‘আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই, রাজীব গাঁধী যে বার ভোটে জিতলেন, সে বার বিজেপি মাত্র দুটো আসন জিতেছিল। এখন সেই বিজেপি-ই কিন্তু ও দেশে ক্ষমতায়। আসলে ঠিক মতো কাজ করলে সব দলেরই সুযোগ আসে।’’

আরও পড়ুন: বিভ্রান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি বিএনপি জোট, এই মহাবিপর্যয় তারই ফল

বাংলাদেশে বিরোধীরা তেমন করে নিজেদের তুলে ধরতে পারল না কেন? এতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে না? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমানের নাম না করে হাসিনা বলেন, ‘‘বিরোধী কারা? এক জন সেনা একনায়কের হাতে ওই দলটা তৈরি হয়েছিল। প্রথমে তিনি ক্ষমতা হস্তগত করেছিলেন। তার পর রাজনীতিতে আসেন। এর পরেই রিগিং-এর জন্ম দেন।’’ হাসিনা আরও বলেন, ‘‘ওই দলের জোটসঙ্গীরা যুদ্ধাপরাধী। ওদের নেত্রী দুর্নীতি মামলায় জেলে রয়েছেন। তাঁর ছেলে আবার দেশ ছেড়ে পলাতক। যদি একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পালিয়ে বেড়ায়, তবে তাদের কাছ থেকে মানুষ কী আশা করবে!’’

 

বৈঠকে হাসিনা বলেন, তিনি স্বৈরাচার এবং সামরিক শাসন কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারেন না। তাঁর কথায়, ‘‘আমি সহৃদয় ভাবে সরকার চালিয়েছি। কোনও ভাবেই সন্ত্রাসবাদ, মাদক এবং দুর্নীতি আমি বরদাস্ত করিনি। করবও না। এ সব থেকে নাগরিকদের বাঁচানোই আমার সরকারের কর্তব্য।’’ এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, জঙ্গিদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে তাঁর দল এবং সরকার কঠোর পদক্ষেপ করবে। জামাত এবং বিএনপি-কে লক্ষ্য করে এ দিন তাঁর কড়া মনোভাবের কথা শুনিয়েছেন হাসিনা।

একটা সময়ে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে যেতে চাইত না বলে মত হাসিনার। তাঁর দাবি, মানুষের খারাপ অভিজ্ঞতা ছিল এ বিষয়ে। আওয়ামি লিগ সরকার একটা পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষকে ফের ভোট দিতে যাওয়ার রাস্তায় নিয়ে এসেছে। সে কারণেই মানুষ এ বার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এবং নির্ভয়ে ভোট দিয়েছে বলে তাঁর দাবি। তাঁর কথায়, ‘‘আপনারা দেখেছেন, মানুষ কী উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিয়েছে। বিশেষ করে যুব সম্প্রদায় এবং নারীশক্তি। দেশের উন্নয়ন করতে গেলে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে! আমরা সেই কাজটাই করেছি।’’

বিপুল এই জয়ের পর তাঁর সরকারের প্রথম এবং প্রধান কাজই হবে দেশের উন্নয়ন, এ দিনের বৈঠকে সেই কথাটাই বারে বারে বলেছেন হাসিনা। তাঁর কথায়, ‘‘দেশের মানুষের জন্য উন্নয়নের ধারাকে বজায় রাখতে এই জয় আসলে আমাদের কাছে আরও একটা সুযোগ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমরা সেই উন্নয়নের রাস্তাতেই হাঁটছি। এটুকু বলতে পারি, জনগণ সেই উন্নয়নের ফল পেতে শুরু করেছে।’’ এর পরেই হাসিনা বলেন, ‘‘আপনারা জিজ্ঞেস করছেন, মানুষ আমাকে কেন ভোট দিয়েছে? আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, কেন দেবে না বলুন তো? আমি বা আমার পরিবার বা আমার সরকারের কেউ তো লাভবান হয়নি। উন্নয়নের সুফল তো সাধারণ মানুষই পেয়েছে।’’

আরও পড়ুন: ২৯৮-এ হাসিনার জোট ২৮৮, পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক শুরু

হাসিনা এ দিনের বৈঠকে জানিয়েছেন, ভোট জনগণের অধিকার। তাঁরা নিজেদের পছন্দ মতো প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু, নির্বাচিত সরকার সকলেরই। কে কোন দলের সেটা আর বিচার্য নয়। ফের সরকার গড়তে যাওয়ার আগে হাসিনার মন্তব্য, ‘‘‘আমি সকলেরই প্রধানমন্ত্রী।’’ পর পর তিন বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে চলা মুজিবকন্যা একই সঙ্গে এ দিন বলেন, ক্ষমতায় থাকা নয়, মানুষের কাজ করে যাওয়াটাই তাঁর লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ‘‘আমি মনে করি না, আমাকে ক্ষমতাতেই থাকতে হবে!’’