অর্থবর্ষের শেষ মাসটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না। যুদ্ধে উত্তাল শেয়ার বাজার। বড় মাপের উত্থান-পতনে কাঁপুনি ধরেছে লগ্নিকারীদের মনে। শুধু লগ্নিকারী না, ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের তিন সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ আতঙ্ক ছড়িয়েছে গৃহস্থের ঘরেও। দাম বাড়লেও গ্যাস এবং তেল এখন পাওয়া যাচ্ছে। তবে যুদ্ধ আরও কিছু দিন চললে বেশি দামেও তা পাওয়া যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। একই কারণে বাড়তে পারে খাদ্যপণ্য-সহ আরও অনেক কিছুর দাম। অন্য দিকে, তলিয়ে যাচ্ছে টাকা, নতুন উচ্চতায় উঠছে ডলার। সব মিলিয়ে ঘুম উড়েছে সরকার, শেয়ার বাজার এবং সাধারণ মানুষের।
সব পক্ষেরই শক্তিক্ষয় হচ্ছে। তবু যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার লক্ষণ নেই। যে কারণে মাঝে-মধ্যে ধস নামছে শেয়ার বাজারে। গত সপ্তাহের প্রথম তিন দিনে সেনসেক্স ২১৪০ পয়েন্ট উঠলেও বৃহস্পতিবার একলপ্তে খুইয়ে বসে ২৪৯৭। সপ্তাহ শেষে হয় ৭৪,৫৩৩। সংঘাত শুরুর পরে সূচকটি হারিয়েছে মোট ৬৭৫৪ পয়েন্ট। সর্বোচ্চ জায়গা (৮৫,৮৩৬) থেকে তলিয়ে গিয়েছে ১১,৩০৩ নীচে (১৩.১৭%)। তাই গত কয়েক মাসে যাঁরা শেয়ার এবং শেয়ার ভিত্তিক ফান্ডে লগ্নি করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই লোকসান দেখছেন। যুদ্ধ চললে বাজার আরও পড়বে। এই অবস্থায় মোটা টাকা একসঙ্গে লগ্নি না করে কিছুটা অপেক্ষা করা ভাল। তবে লম্বা মেয়াদের লগ্নিতে চিন্তা নেই। যাঁরা কিস্তিতে (এসআইপি) লগ্নি করছেন, তাঁদেরও সেটা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
ইরান যুদ্ধ এরই মধ্যে বড় আঘাত হেনেছে বিভিন্ন অর্থনীতিতে। চার বছর ধরে চললেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এতটা ক্ষতি হয়নি। সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে সমস্যায় পড়বে ভারতের অর্থনীতি। হরমুজ় প্রণালী বন্ধ থাকায় তেল-গ্যাস আমদানি তলানিতে। হাতে যা মজুত আছে তাই দিয়ে বেশি দিন চলবে না। এরই মধ্যে রান্না এবং অটোর জ্বালানির দাম বাড়ানোয় শঙ্কিত মধ্যবিত্ত। চিন্তা, এর পর জোগান ঠিক থাকবে তো? দাম বাড়ানো হয়েছে প্রিমিয়াম পেট্রল এবং শিল্পে ব্যবহৃত ডিজ়েলের। জোগান কমলে এর পরে দাম বাড়ানো হতে পারে পেট্রল এবং ডিজ়েলেরও। এখনও বাড়েনি দু’টি কারণে। অনেক দিন ধরে তেল যখন সস্তা ছিল (৬৫ ডলার বা তার কম) এবং তার থেকেও কম দামে রাশিয়া থেকে কেনা হচ্ছিল, তখন দেশে সেগুলির দাম কমানো হয়নি। সামনে আছে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যে ভোট। এখন তাই দাম বাড়ানোর আগে সময় নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব বাজারে তেল ১১২.৫০ ডলার ছুঁয়েছে। দেশে ডলার এখন ৯৩.৭১ টাকা। অর্থাৎ আমদানি খরচ অনেক বেড়েছে। তবে যুদ্ধ থামলেই যে সঙ্কট কমে যাবে, তা নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত তেল-গ্যাস উৎপাদনের পরিকাঠামো স্বাভাবিক হতে সময় নেবে। চিন্তা আছে আরও অনেক বিষয় নিয়ে। হরমুজ় বন্ধ থাকায় রাসায়নিক সার আমদানি কমেছে। এতে ঘাটতি হলে কৃষি মার খাবে। ফলে বাড়তে পারে খাদ্যপণ্যের দাম। এ ছাড়া, কমেছে নানা রকম পণ্যের আমদানি-রফতানি। সব মিলিয়ে চাপে অর্থনীতি। মূল্যবৃদ্ধি মাথা তুললে ফের সুদ বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যা সাধারণ ঋণগ্রহীতা ও শিল্পের জন্য ভাল নয়। এই অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধ হলে বাজার বাড়বে বটে। তবে আগের জায়গায় পৌঁছতে সময় লাগবে। যাঁরা শেয়ার এড়িয়ে চলেন এবং ব্যাঙ্ক-ডাকঘরে টাকা রাখেন, তাঁরা এখন খানিকটা স্বস্তিতে। তবে অভিজ্ঞরা জানেন, সুদিন ঠিক আসবে। ক্ষতি পুষিয়ে লাভে ফিরবে সূচক। অতীতে অনেক বার এমন হয়েছে। প্রত্যেক বার সূচক পরে নতুন উচ্চতায় উঠেছে। গত বছরের ৪ মার্চ সেনসেক্স নেমেছিল ৭২,৯৯০ অঙ্কে। গত ২ জানুয়ারি হয় ৮৫,৭৬২। অর্থাৎ লম্বা মেয়াদের লগ্নিকারীরা তেমন চিন্তিত নন। বরং কম দামে বুঝেশুনে পড়তি বাজারে অনেকে নতুন সওদা করছেন।
(মতামত ব্যক্তিগত)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)