রেলমন্ত্রী হিসেবে এক সময়ে পীযূষ গয়ালের দাবি ছিল, সহায়তার জন্য অর্থ মন্ত্রকের দ্বারস্থ হওয়া তাঁর ঘোর অপছন্দ। তার বদলে বরং আয় বাড়িয়ে রেলকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর পক্ষপাতী তিনি। কিন্তু ভোট দরজায় কড়া নাড়তেই সেই গয়ালের গলায় অন্য সুর। রেলের আর্থিক স্বাস্থ্য বেহাল জেনেও কোনও ভাবেই টিকিটের দাম বাড়াতে নারাজ তিনি।  

রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান চান, বেহাল রেলের স্বাস্থ্য মেরামতির জন্য অবিলম্বে টিকিটের দাম কিছুটা অন্তত বাড়ুক। যাতে কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা ভাঁড়ারে আসে। সামান্য হলেও সামাল দেওয়া যায় সমস্যা। কিন্তু তাতেই বেঁকে বসেছেন গয়াল। ভোটের মুখে ওই তেতো দাওয়াই প্রয়োগে তীব্র আপত্তি তাঁর।

রেলের শীর্ষ কর্তারা দীর্ঘ দিন ধরেই সাধারণ ও স্লিপার শ্রেণি এবং লোকাল ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে। তাঁদের দাবি, সারা দেশেই লোকাল ট্রেনের ন্যূনতম ভাড়া সেই এলাকার বাসের ন্যূনতম ভাড়ার অর্ধেক। রেল কর্তাদের আক্ষেপ, ডিজেলের দাম বাড়লে বাসের ভাড়া বাড়ে। কিন্তু রেল ভাড়া থাকে একই। প্রায় এক দশক তা সে ভাবে বাড়েনি। অথচ এখন রেলের ভাড়ার ৪৩% খরচ বহন করে কেন্দ্র। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার জন্য টিকিটে হাত পড়ে না সাধারণত। 

মাঝে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি খাতে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে কেন্দ্র। কিন্তু তাতে তেমন লাভ হয়নি। উপরন্তু খরচ বাড়ায় সঙ্কটে রেল। চড়চড়িয়ে বাড়ছে অপারেটিং রেশিও। এ বছরে তা ৯২ বলে দাবি বাজেটে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে রেলের খরচ হচ্ছে ৯২ টাকা। রেল সূত্রের বক্তব্য, পেনশন খাতের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা  হলে তা ১০৫ ছাড়াত।

                                        শিয়রে সঙ্কট
•রেলের আর্থিক স্বাস্থ্য বেহাল। এতটাই যে, ভাড়া বাড়িয়ে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা আয় বাড়ানোর পক্ষপাতী রেল বোর্ড

•বাজেটে দাবি, অপারেটিং রেশিও ৯২। কিন্তু পেনশন খাতের ৬,০০০ কোটি ধরলে তা ১০৫-এ পৌঁছবে বলে সূত্রের দাবি।
•কিছু ট্রেনে চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে (ডায়নামিক) ভাড়া নেওয়ার নিয়ম চালু করে, সম্পূর্ণ বাতানুকূল ট্রেন চালিয়েও তেমন লাভ হয়নি।
•চিঁড়ে ভেজেনি বিজ্ঞাপনের মতো বিকল্প আয়ের পরিকল্পনাতেও।
•প্রায় এক দশক সে ভাবে ভাড়া বাড়েনি স্লিপার শ্রেণি, লোকাল ট্রেনে। অথচ কেন্দ্রকে ভর্তুকি জোগাতে হয় ৩০-৩২ হাজার কোটি টাকা।
•বাতানুকূল কামরায় ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিএজি। কিন্তু তা আর বেশি বাড়লে, আশঙ্কা বিমানের কাছে যাত্রী খোয়ানোর।
•পণ্য পরিবহণের মাসুল বেড়ে যেখানে পৌঁছেছে, তাতে বাজার ছিনিয়ে নিচ্ছে সড়ক পরিবহণ।

                                   ভোটের বালাই
•ভোটের অাগে ভাড়া বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে নারাজ মন্ত্রী। বিশেষত সাধারণ শ্রেণি, স্লিপার ক্লাস, লোকাল ট্রেনে।
•জ্বালানির (বিশেষত ডিজেল) দর লাফিয়ে বাড়লেও, উপায় নেই টিকিটের দাম বৃদ্ধির।
•যে গয়াল রেলকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর কথা বলতেন, এখন ভোটের মুখে আয় বাড়াতে টিকিটের দামে হাত দিতেও পিছপা তিনি।

এই পরিস্থিতিতে রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান অশ্বিনী লোহানি চেয়েছিলেন ভাড়া বাড়িয়ে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে। কিন্তু বাদ সাধেন গয়াল। বেড রোলের দাম বাড়িয়ে, ডায়নামিক ভাড়া চালুর মতো ঘুরপথে আয় বৃদ্ধিতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু ভোটের মুখে ভাড়া বাড়িয়ে জনতাকে চটাতে নারাজ তিনি। রেলের সব ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বললেও, ভাড়ার ক্ষেত্রে সংস্কারে এখন প্রবল আপত্তি গয়ালের।

অথচ অন্য জায়গা থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ কম। সিএজি-র সুপারিশি ছিল, সমস্ত বাতানুকূল কামরায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার। কিন্তু সস্তার বিমান পরিষেবার কাছে যাত্রী খোয়ানোর ভয়ে তা করা কঠিন। সড়ক পরিবহণের থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় তেমন বাড়ানোর জায়গা নেই পণ্য মাসুলও। বিশেষত মসৃণ হাইওয়ে আর চেক পোস্ট উঠে যাওয়া এই জমানায়। তাই সবেধন উপায় ছিল সাধারণ টিকিটে ভাড়া বৃদ্ধি। কিন্তু সেখানে আটকে গেলেন গয়াল। পূর্বসূরিদের মতোই।