জমি দিতে এ বারেও অনিচ্ছুক সিঙ্গুরের কৃষকদের একাংশ। টাটা মোটরসের ন্যানো কারখানার পরে এ বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভার জন্য। আগামী রবিবার (১৮ জানুয়ারি) হুগলির সিঙ্গুরের সেই ‘টাটার মাঠে’ সভা করার কথা প্রধানমন্ত্রী মোদীর। কিন্তু স্থানীয় সিংহের ভেড়ি এবং গোপালনগর মৌজার বাসিন্দা জমি মালিকদের একাংশ অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের সম্মতি ছাড়াই জোর করে সভার জন্য জমি নেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গুরের বিডিও-কে লিখিত ভাবে অভিযোগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কৃষকেরা। তাতে জমির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (দাগ, খতিয়ান প্রভৃতি) দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘আগামী ১৮.০১.২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত টাটা প্রজেক্টের জমিতে সভার জন্য আমার জমি ব্যবহার করা হইতেছে, যার বিররণ নিম্নে প্রদত্ত হইল। কিন্তু জমির মালিক হিসাবে আমার নিকট হইতে কোনওপ্রকার মৌখিক বা লিখিত অনুমতি নেওয়া হয়নি। যার জন্য আমি তীব্র আপত্তি জানাচ্ছি।’ ছাপানো ‘ফরম্যাটে’র ওই অভিযোগপত্রে বিডিওর কাছে ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ করার দাবিও জানানো হয়েছে আবেদনকারী কৃষকদের তরফে।
এই ঘটনায় বিজেপির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সিঙ্গুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের কৃষি বিপণনমন্ত্রী বেচারাম মান্না। তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সিঙ্গুরের যে জমিতে সভা করবেন, সেই জমির মালিকদের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি।’’ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তরফে প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গুরের জনসভা আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ খারিজ করে বলেছেন, ‘‘এসপিজির উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সভা সংক্রান্ত অগ্রিম নিরাপত্তা বৈঠক হয়ে গিয়েছে। সরকারি অনুষ্ঠানে মোদীজি আসছেন। সমস্ত অনুমতি জেলা প্রশাসন দিয়ে দিয়েছে। এখন এ সবের অর্থ নিম্নস্তরের রাজনীতি।’’
আরও পড়ুন:
প্রসঙ্গত, চলতি সপ্তাহে পর পর দু’দিন তিনি পশ্চিমবঙ্গে জনসভা করবেন। ১৭ জানুয়ারি, শনিবার উত্তরবঙ্গের মালদহে। ১৮ জানুয়ারি দক্ষিণবঙ্গের সিঙ্গুরে। ১৮ জানুয়ারির সভাটি মোদী করবেন ‘টাটার মাঠে’। সিঙ্গুরে ন্যানো প্রকল্পের জন্য যে জমি অধিগ্রহণ হয়েছিল, এটিই এখন তার ডাকনাম। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় হাজার একরের প্রান্তর জুড়ে অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমেছিল। কারণ, তৃণণূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি রক্ষা আন্দোলনের আবহে টাটা গোষ্ঠীর তৎকালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর থেকে তিনি প্রকল্প সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন গুজরাতের সাণন্দে। শুনিয়েছিলেন এক ‘গুড এম’ (মোদী) এবং এক ‘ব্যাড এম’ (মমতা)-এর কথা। দাবি করেছিলেন, তাঁর মাথায় শুধু বন্দুক ধরা হয়নি, ট্রিগার টিপে দেওয়া হয়েছে। তাই ন্যানো প্রকল্প সরিয়ে গুজরাতের সাণন্দে নিয়ে যাচ্ছেন ন্যানো কারখানা। যে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তখন মোদী।
সাড়ে ১৭ বছর পরে সেই মোদী, সেই সিঙ্গুর, সেই ‘টাটার মাঠ’ আবার এক বিন্দুতে এসে মিলছে। শুধু গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গিয়েছেন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর যে কোনও জনসভার জন্যই পশ্চিমবঙ্গে ‘হ্যাঙার’-এর ব্যবস্থা হয়। ইস্পাতের সার সার স্তম্ভ, তার উপরে ইস্পাতেরই তৈরি দোচালা ছাউনির মতো দেখতে কাঠামো। সে কাঠামোর উপরে পুরু, সাদা ত্রিপলের আচ্ছাদন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি হওয়া মঞ্চ শুধু নয়, দর্শকাসনও সেই ছাউনির নীচেই থাকে। সিঙ্গুরের ময়দানে একটি ‘হ্যাঙার’ ইতিমধ্যেই মাথা তুলেছে, ঘটনাচক্রে যার আদল সেই কারখানার ছাউনির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।