ঋণগ্রহীতারা সুদের বোঝা আরও কমার আশায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুধবারের ঋণনীতি ঘোষণায় রেপো রেট (যে সুদে ব্যাঙ্কগুলিকে ধার দেয় আরবিআই) ৫.৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রেখে দিল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্র স্পষ্ট জানালেন, মাথা নামাতে থাকা মূল্যবৃদ্ধি সুদ কমানোর পথ তৈরি করেছিল বটে। কিন্তু তাঁরা সেই পথে হাঁটলেন না দু’টি কারণে— এক, বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। দুই, শীর্ষ ব্যাঙ্কের আগের পদক্ষেপগুলির সুবিধার পুরোটা এখনও সাধারণ মানুষ এবং শিল্পের কাছে না পৌঁছনো। এ দিন অবশ্য চলতি অর্থবর্ষে আর্থিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আরবিআই, কমিয়েছে মূল্যবৃদ্ধির অনুমান। সঞ্জয় জানিয়েছেন, গত এপ্রিল-জুনে ৭.৮% জিডিপি বৃদ্ধির হার মাথায় রেখেই ঋণনীতি কমিটি মনে করছে গোটা অর্থবর্ষের বৃদ্ধি আগের ৬.৫% অনুমানের থেকে বেশি হবে। তাই তা বাড়িয়ে ৬.৮% করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, কেন্দ্র জিএসটির হার কমানোয় বহু পণ্যের দাম কমার কথা। তাতেও চাহিদা এবং উৎপাদন বাড়তে পারে। এতেও মূল্যবৃদ্ধির হার যেমন কমবে, তেমনই মাথা তুলবে আর্থিক বৃদ্ধি। যে কারণে এই অর্থবর্ষে মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। আগের অনুমান ছিল ৩.১%। নামানো হয়েছে ২.৬%।এই দফার ঋণনীতিতে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার কমাবে কি না, এই প্রশ্নে দুই শিবিরে ভাগ হয়েছিল দেশ। একটির দাবি ছিল, সমস্ত পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে এপ্রিল-জুনের ৭.৮% আর্থিক বৃদ্ধি এবং মূল্যবৃদ্ধির তলানিতে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফের সুদ কমানো হবে। বাকিরা দাবি করেন, আমেরিকার শুল্ক নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে আর্থিক ক্ষেত্রের সমস্যা পর্যালোচনা করার প্রক্রিয়া চলছে। আয়কর এবং জিএসটির হার কমানোর ফল কী দাঁড়ায়, চলছে তারও বিচার-বিশ্লেষণ। এ সবের প্রভাব খতিয়ে না দেখে এখনই ফের সুদে হাত দেবে না আরবিআই।
সঞ্জয় নিজেও এ দিন জানান, পূর্বের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলাফলে চোখ রাখা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে মোট ১০০ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমিয়েছে আরবিআই। এই নিয়ে তা অপরিবর্তিত রইল টানা দু’দফা। নিজেদের অবস্থান অবশ্য ‘নিউট্রাল’-ই রেখেছে তারা। অর্থাৎ, সুদ বৃদ্ধি বা ছাঁটাই, কোনও দিকেই না ঝুঁকে প্রয়োজন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকারের মতে, আমেরিকার শুল্ক নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে দেশের অর্থনীতি সমস্যার মধ্য দিয়ে চলেছে। জোগান বাড়াতে সুদ কমিয়ে লগ্নির রাস্তা চওড়া হয় ঠিকই। কিন্তু ভারতের সমস্যা এখন চাহিদার ঘাটতি। বিশেষত আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমায় রফতানি বাণিজ্য সঙ্কটে। এর জের পড়েছে উৎপাদনে। তা ছাড়া মানুষের কেনাকাটার ক্ষমতা বাড়িয়ে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সবেমাত্র ছাঁটা হয়ছে জিএসটির হার। তার ফল না দেখে নগদের জোগান বাড়ানোর আরও একটি পদক্ষেপ করতে নারাজ আরবিআই। তিনি আরও বলেন, ‘‘ব্যাঙ্কের সুদ কমলে সুদ নির্ভর প্রবীন নাগরিকদের কেনকাটার ক্ষমতাও সঙ্কুচিত হবে। কারণ, তাতে আয় কমবে তাঁদের। দেশে ওই শ্রেণির মানুষের সংখ্য কম নয়।’’
ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারম্যান-এমডি দেবব্রত সরকার বলেন, ‘‘সুদ কমালেই চাহিদা বাড়বে মনে করি না। চাহিদা বাড়াতে সাধারণ মানুষের হাতে খরচযোগ্য নগদের জোগান বৃদ্ধি জরুরি। আয় বৃদ্ধির মাধ্যমেই যা সম্ভব।’’ বিভিন্ন পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেবব্রতর বক্তব্য, ‘‘সরকারের হিসাব বলছে মূল্যবৃদ্ধি তলানিতে। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে তার ছাপ নেই।’’ আইসিএআই-এর পূর্বাঞ্চলের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অনির্বাণ দত্তের দাবি, আয়কর কমানোর সুবিধা মিলছে গত এপ্রিল থেকে। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হল জিএসটির হার কমানোর সুবিধা। এতে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু তা কাজে না দিলে সুদের হার কমিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির রাস্তা চওড়া করে কী লাভ। ওই সমস্ত পদক্ষেপের পরিণতি কী হয়, তা না দেখে সুদের হার বদলের রাস্তায় হাঁটবে না রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)