সফট্ওয়্যার বা চিপ-ডিজাইনিং যে পথ দেখাতে পারেনি, সেই পথ দেখাতে পারে অ্যানালিটিক্স বা তথ্য বিশ্লেষণ।
তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ভিড়ের মধ্যেই স্বতন্ত্র জায়গা করে নিতে পারে কলকাতা। বাজি সেই মানবসম্পদ। এ বার রাজ্যে অ্যানালিটিক্স হাব তৈরি করতে সরকার, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তির মধ্যে যোগসূত্র হয়ে উঠল বণিকমহল। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে শহরের আলাদা পরিচিতি তুলে ধরতে তথ্য বিশ্লেষণকেই ব্র্যান্ডিং-এর হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা।
বুধবার বণিকসভা বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্স-এর ‘বিজনেস অ্যানালিটিক্স ইনোভেশন সামিট’ মঞ্চে প্রকাশিত হল অ্যানালিটিক্স হাব তথা নলেজ সিটি ‘আইডিওপোলিস’-এর রূপরেখা। প্রস্তাবিত হাব-এর নকশা তৈরি করেছেন স্থানীয় স্থপতি দুলাল মুখোপাধ্যায়। এতে প্রয়োজন ২৫০ একর জমি। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৩০০০ কোটি টাকা।
বিশ্ব জুড়ে অ্যানালিটিক্স-এর বাজারের মাপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে লগ্নির এই নতুন দৌড়ের কারণ। গার্টনার-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসেবে তথ্য বিশ্লেষণের বিশ্ব বাজারের মাপ ৯৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৬ সালে তা ১২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এবং
মন্দার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও ২০১৩ সালে ৮ শতাংশ হারে বেড়েছে এই বাজার।
শুধুই বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির বাজার নয়। ২০২০ সালের দিকে নজর রেখে তৈরি করতে হবে অ্যানালিটিক্স-এর কেন্দ্র। বিশ্বের প্রথম চার বিশেষজ্ঞ সংস্থার অন্যতম কেপিএমজি ইন্ডিয়ার অন্যতম কর্তা অম্বরীশ দাশগুপ্ত বলেন, “তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে শহরের নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে তথ্য বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্র কলকাতার জন্য উপযুক্ত। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভাবনী শক্তি, পুঁজি ও ব্যবসায়িক কৌশল, সব হাতের কাছে রয়েছে।”
সফটওয়্যারে রাজ্যের দৌড়টা অনেক পেছন থেকে শুরু হয়েছিল। চিপ ডিজাইনিং-এর দৌড় আবার মাঝ পথেই থমকে গিয়েছে। অ্যানালিটিক্স বা তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাই এগিয়ে থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না রাজ্য। কারণ সফট্ওয়্যার ও চিপ ডিজাইনিং-এর মতো পরিকাঠামো তৈরির চাপ এ ক্ষেত্রে অনেকটাই কম। তাই জমি ও মোটা অঙ্কের বিনিয়োগের সমস্যাও কম। ফলে মানবসম্পদের জোরেই ফিনিশিং লাইনে প্রথম পৌঁছে যাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট কল্লোল দত্ত ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট অলক রায়, দু’জনেই।
শুধুই বিশ্ব বাজার নয়। ন্যাসকমের হিসেব অনুযায়ী দেশের বাজারও বাড়ছে। ২০১৩ সালে ১৬.৩ কোটি ডলারের বাজার ২০১৮ সালে ৩৭ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ন্যাসকমের দাবি।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে দেশের মধ্যে প্রথম তিনে আসার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে পশ্চিমবঙ্গ। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে অ্যানালিটিক্সকে হাতিয়ার করা জরুরি বলে একই সুরে জানালেন এল অ্যান্ড টি ইনফোটেকের প্রধান চন্দ্রশেখর কাকাল, মৈনাক গোষ্ঠীর অপরূপ সেনগুপ্ত ও ডেলয়েটের রাজর্ষি সেনগুপ্ত।
বিশাল এই বাজারের দিকে চোখ রেখে বাজি ধরছে ওর্যাক্ল, আই বি এম, স্যাপ, মাইক্রোসফট্-এর মতো সংস্থা। আর এদের লগ্নির দিকে নজর রেখে এই হাব দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। হাতের কাছে মজুত রয়েছে এই ব্যবসার মূল উপাদান— মানবসম্পদ ও সেই মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা কেন্দ্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
একই সঙ্গে এই সব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ভিত্তিক পরিকাঠামো কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জোগাড় করতে পারে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। ক্যাম্পাস ও বাণিজ্যিক ময়দানের যোগসূত্র তৈরি করে দেবে হাব। আর সহায়ক হিসেবে থেকে এই যোগসূত্র তৈরি করে দেবে রাজ্যও।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের উপর জোর দিয়ে শিল্প পরিকাঠামো গড়তে চায় রাজ্য, সেই মডেলেও তৈরি হতে পারে এই হাব। সে ক্ষেত্রে লগ্নি টানার পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ নিতে পারে খোদ সরকারও। বিভিন্ন নীতি তৈরির আগে বাজারের বাস্তব হাল ও চাহিদা ঝালিয়ে নিতে পারার বাড়তি সুবিধা পাবে রাজ্য সরকার, যেমন ভাবে কাজ করে সিঙ্গাপুরের অ্যানালিটিক্স রিসার্চ সেন্টার। বিভিন্ন শিল্প সংস্থার হয়ে কাজের পাশাপাশি সরকারি নীতি তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা নেয় এই কেন্দ্র।
এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্প তথা অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। দুই মন্ত্রীই জানান, প্রকল্পের কাজে তাঁরা সহায়তা করবেন।