বছরে ৩৫ কোটি! এআই স্লপ ভিডিয়ো তৈরি করে ইউটিউব চ্যানেল ‘বন্দর আপনা দোস্ত’-এর উপার্জনে চমকাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরাও
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত বিষয়ের উত্থান পরীক্ষা করে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল ভিডিয়ো এডিটিং প্ল্যাটফর্ম ‘কাপউইং’। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার থাকা ১৫,০০০ ইউটিউব চ্যানেল পর্যালোচনা করেছে সংস্থাটি।
‘টাকা ছাপছে’ কৃত্রিম মেধা বা এআই দিয়ে তৈরি ভিডিয়ো। ডিজিটাল মাধ্যমে ‘এআই স্লপ’ বা ‘ব্রেন রট’ কন্টেন্ট তৈরি করে বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে একটি ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল। তেমনটাই উঠে এল একটি সমীক্ষায়।
কিন্তু সবার প্রথমে দেখে নেওয়া যাক কী এই ‘ব্রেন রট’ বিষয়বস্তু বা কন্টেন্ট? ‘ব্রেন রট’ বলতে বোঝায় মানসিক ক্লান্তি এবং মস্তিষ্কের অবক্ষয়, যা দ্রুত গতির, ছোট এবং প্রায়শই অর্থহীন ডিজিটাল বিষয় অতিরিক্ত পরিমাণে দেখার পর হয়।
এই সব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ছোট টিকটক ভিডিয়ো, অযৌক্তিক এবং অবাস্তব মিম, রিল-সহ আরও অনেক কিছু। সেই সব বিষয়ের মধ্যে কোনও অর্থ বা শিক্ষণীয় বিষয় না থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় সেগুলি দেখে।
ফলে মানুষের মনোযোগ কমে যায়। গভীর চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাও কমে। এটি কোনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষিত রোগ না হলেও বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে লেখালিখিও হয়েছে বিস্তর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি ওই ‘এআই স্লপ’ বা ‘ব্রেন রট’ কন্টেন্টগুলি তৈরি করতে খাটনি কম। মানুষের তৈরি অর্থবহ কোনও কন্টেন্টের পরিবর্তে কেবল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তৈরি করা হয় সেগুলি।
আরও পড়ুন:
এআই সৃষ্ট বিষয়ের উত্থান পরীক্ষা করে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল ভিডিয়ো এডিটিং প্ল্যাটফর্ম ‘কাপউইং’। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি অনুসরণকারী থাকা ১৫,০০০ ইউটিউব চ্যানেল পর্যালোচনা করে সংস্থাটি।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ওই ১৫,০০০-এর মধ্যে ২৭৮টি ইউটিউব চ্যানেল সম্পূর্ণ রূপে এআই নির্মিত বিষয় আপলোড করে। চ্যানেলগুলি থেকে যে সব ভিডিয়ো আপলোড করা হয়েছে, তা সম্মিলিত ভাবে ৬৩০০ কোটি বারেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। চ্যানেলগুলির মোট সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ২২.১ কোটি।
বিষয়টি আরও বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখতে প্রতিটি দেশের শীর্ষ ১০০টি চ্যানেলও পরীক্ষা করা হয়েছিল ‘কাপউইং’-এর তরফে। ভারতীয় চ্যানেলগুলিকে নিয়েও সেই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। ‘কাপউইং’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বন্দর আপনা দোস্ত’ নামের ইউটিউব চ্যানেলটি বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক দেখা ‘এআই স্লপ’ চ্যানেল।
সমীক্ষা অনুযায়ী, চ্যানেলটি সম্পূর্ণ রূপে এআই জেনারেটেড বা কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি ভিডিয়ো আপলোড করার জন্য পরিচিত। ২০০ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে চ্যানেলের ভিডিয়োগুলি।
আরও পড়ুন:
সেই চ্যানেলের বিবরণে লেখা, ‘‘বন্দর আপনা দোস্ত-এ আপনাকে স্বাগত। বল্টু বাঁদরের জীবন মজা, আবেগ এবং অতি-বাস্তববাদী গল্প বলার এক অনন্য মিশ্রণ! এখানে আপনি একটি বাঁদরের হাস্যকর, নাটকীয় এবং হৃদয়স্পর্শী সংক্ষিপ্ত ভিডিয়ো দেখতে পাবেন।’’
চ্যানেলটিতে কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি একটি বাঁদর এবং একটি পেশিবহুল চরিত্রকে হাস্যরসাত্মক এবং অযৌক্তিক পরিস্থিতিতে চিত্রিত করে অ্যানিমেশনে ভিডিয়ো আপলোড করা হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার সময়, চ্যানেলটির সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষেরও বেশি। মোট ৬১৯টি ভিডিয়ো আপলোড হয়েছিল ওই চ্যানেল থেকে।
আর সেই সব ভিডিয়োর মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ৪২.৫ লক্ষ ডলার বা ৩৫ কোটি টাকা আয় করেছে চ্যানেলটি। অবিশ্বাস্য মনে হলেও তেমনটাই উঠে এসেছে ওই সমীক্ষায়।
প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অধিকারের গবেষক রোহিনী লক্ষণে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে জানিয়েছেন ‘বন্দর আপনা দোস্ত’-এর জনপ্রিয়তা সম্ভবত এর অযৌক্তিক, অবাস্তব এবং অতি-পুরুষালি কন্টেন্টের জন্য তৈরি হয়েছে।
মজার বিষয় হল, ‘বন্দর আপনা দোস্ত’ চ্যানেলটি নতুন নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে সুরজিৎ নামে অসমের বাসিন্দা এক যুবক তৈরি করেছিলেন। বেশ কয়েক বছর ধরে এটি খুব একটা সক্রিয় ছিল না। এ বছরের শুরুতে হঠাৎ সক্রিয় হয় চ্যানেলটি। তার পর থেকে সেই চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিয়োগুলি দ্রুত লক্ষ লক্ষ ভিউ অর্জন করে।
তবে আপলোড করা ভিডিয়োগুলি ভাল ভাবে দেখলে বোঝা যাবে, এর বেশির ভাগ ভিডিয়োই কম প্রচেষ্টায় তৈরি। ভিডিয়োর গুণমান এবং বর্ণনাও সীমিত। তবুও প্রচুর মানুষ সেই ভিডিয়োগুলি দেখে সময় অতিবাহিত করছেন।
‘কাপউইং’য়ের বিশ্লেষণে আরও দেখা গিয়েছে, বর্তমানে গ্রাহকেরা ইউটিউবে যা দেখেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এআই দিয়ে তৈরি, যা ইউটিউবের সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষক এবং শিল্প পর্যবেক্ষকেরাও। তাঁদের উদ্বেগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত এই ধরনের বিষয় আপলোড করা চ্যানেলগুলির গ্রাহকের সংখ্যা মানুষের তৈরি প্রকৃত সৃজনশীল কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তুর চ্যানেলগুলিকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।
এই তথ্য প্রকাশের পর ঝড় উঠেছে সমাজমাধ্যমে। দ্রুত সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বিষয়টি। নেট ব্যবহারকারীরা এআই সৃষ্ট কন্টেন্টের মান এবং লাভ নিয়েও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
যদিও এআই সৃষ্ট কন্টেন্ট কেবল ইউটিউবেই সীমাবদ্ধ নয়। ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলিতেও এর ব্যবহার অনেক। ইতিমধ্যেই এআই ভিডিয়োগুলির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে প্ল্যাটফর্মগুলি। এ মাসের শুরুর দিকে দু’টি বড় চ্যানেল ব্লক করেছে ইউটিউব। চ্যানেল দু’টি এআই সৃষ্ট সিনেমার ‘ট্রেলার’ আপলোড করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।