• ঋজু বসু
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সিনেমার মধু-পুঁটি সাহস যোগাচ্ছে রবি-বিনুদের

couple
জুটি: চিরকুটে ভালবাসার বার্তা। নিজস্ব চিত্র

Advertisement

—রবি, ইউ আর সুইটার দ্যান রসগোল্লা, কিন্তু রেগে গেলে কালবৈশাখী।

—শয়তান আই লাভ ইউ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসব...।

দেওয়ালের ক্যানভাসে গোলাপি কাগজে গুচ্ছের খুনসুটির সংলাপ! আনকোরা দাম্পত্যের উত্তাপ বেগুনি-সবুজ দেওয়ালঘেরা ঘরে। দমদম এলাকার গলিতে একচিলতে রান্নার জায়গা, শৌচাগার সমেত মাথা গোঁজার ঠাঁই। মিথ্যে কথার এই শহরে যেন এখানেই থমকে সেই বাংলা গানের ‘লাল-নীল সংসার’।  

ঠিক এক বছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গ থেকে কার্যত তাড়া খেয়ে কলকাতায় এসেছিলেন রবি রায় ও বিনন্দন সরকার। এক কামরার ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়ার সময়ে বাড়িওয়ালা দাদার কাছে নিজেদের পিসতুতো ভাই বলেই পরিচয় দিয়েছিলেন ওঁরা। এর পরের একটা বছর শুধু বিশ্বাস, ভালবাসার বুকের জোরে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প! পরীক্ষা দিয়ে সরকারি অফিসারের চাকরি পেয়েছেন বিনু। চলছে আইএএসের প্রস্তুতি। আর পলিটেকনিক ডিপ্লোমাধারী রবি চান ফ্যাশন ডিজ়াইনিং শিখতে। বড় পর্দার পুঁটি-মধুকে দেখার পরে  আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন এই সমপ্রেমী জুটি।

আরও পড়ুন: ভিক্ষা করতে বসে নগদ ছ’ হাজার টাকা হাতে পেয়ে তাজ্জব বৃদ্ধা​

কলকাতায় এমন ছক-ভাঙা দম্পতিরা অবশ্য উজান ঠেলে লড়ছে অনেক দিনই। কিন্তু এই ২০১৯-এ দাঁড়িয়ে আরও কিছুটা স্পর্ধিত, অকুণ্ঠ তাঁদের প্রেমের প্রকাশ! চিত্র পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বলছিলেন, ‘‘রূপান্তরকামী মেয়ে-পুরুষেরা দলে-দলে আমার ‘নগরকীর্তন’ ছবিটা দেখতে আসছেন। খোলাখুলি আলোচনা করছেন। ২০১০-এ ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ও দর্শকদের ছুঁয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন তৃতীয় লিঙ্গভুক্তদের ভিড় এতটা দেখিনি।’’ লিঙ্গান্তর অস্ত্রোপচারের ধাপ পেরিয়ে আসা ট্রান্স-নারী তনুশ্রী চক্রবর্তীরও অভিজ্ঞতা, ‘‘শ্রীরামপুরের একটা সিনেমা হলে দর্শকদের দেখে ভাবছিলাম, আমাদের মতো মানুষের কষ্টটা তাহলে অনেকেই বুঝছেন।’’

‘নগরকীর্তন’-এর মধু-পুঁটিদের মতো লড়াইয়ের শরিক রবি আর বিনুও। শরীরে পুরুষ, মনে মেয়ে রবি বলছিলেন, ‘‘সিনেমায় ওর প্রেমিকের বৌদিকে পোশাক ছাড়তে দেখে ‘নকল মেয়ে’ পুঁটির চাউনিটায়, আমার নিজের অপূর্ণ নারী শরীরের জন্য আকুতিই তো দেখলাম!’’ বিনু হাসেন, ‘‘ছবির আদরের সিনটার পরে পুঁটি যে মধুকে বলল, বিছানায় তোমার কি এক বারও মনে হয় আমি মেয়ে নই,  তখন ভাবছিলাম, এ-ও তো ঠিক আমাদের মতো!’’

তথাকথিত পুরুষালি বিনন্দন একটুতেই কাঁদেন সিনেমা দেখতে বসে। রবি হাসেন, ‘‘ছবিটায় মধুকে যখন ওর দাদা বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন, আমি বার বার দেখছিলাম, বিনু কান্নাকাটি করছে না তো!’’ কর্ণজোড়ার রবির সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নেননি অঙ্কে স্নাতকোত্তর, বালুরঘাটের বিনুর বাড়ির লোক। তবে রবির মা পাশে ছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে শান্তিতে বাঁচার জন্য স্থানীয় পুলিশ, এমনকি নবান্নে প্রশাসনের উঁচু তলার সাহায্যও নিতে হয়। বিনু বলেন, ‘‘আমার মা-বাবা কিন্তু ভিলেন নন! হয়তো কখনও ওঁরা আমার অবস্থাটা বুঝবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’’

গত সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারা অপরাধের তকমামুক্ত হওয়ার বিশেষ দিনটাতেই কিন্তু কালীঘাটে গিয়েছিলেন রবি-বিনু। জলপাইগুড়িতে অনীক, অধুনা অ্যানি ও সাগ্নিকের মতো লোক খাইয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান সারার ভাগ্য তাঁদের হয়নি! তবু ওঁরাও কালীঘাটে পান্ডাকে দক্ষিণা দিয়ে ‘বিয়ে’  করেন। যৌথ যাপনের এক বছরের মুখে একে অপরকে চক্ষে হারাচ্ছেন। সরস্বতী পুজোয় রবি বাড়ি যেতে বিনুও দু’দিনের মধ্যে সেখানে হাজির। ‘নগরকীর্তন’ ছাড়াও ‘এক লড়কি কো দেখা’, ‘ইভনিং শ্যাডোস’-এর মতো বিভিন্ন ছবি ইদানীং সমপ্রেমী দম্পতি এবং তাঁদের অভিভাবকদের টানাপড়েনের গল্প বলছে। সমাজকর্মী বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এই ধরনের ছবির হাত ধরে কিছুটা হলেও সমাজের মন বদলাচ্ছে। সমপ্রেমীরা নিজের মতো করে বাঁচার সাহস পাচ্ছেন।’’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন