E-Paper

শ্রেণি ও অসাম্যের সম্পর্ক

২৮৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ভারত ও চিন এই দুই দেশের অসাম্য নিয়ে সাল-তারিখ ধরে ধরে বিভিন্ন পর্ব-উপপর্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত আলোচনা এই বইয়ে রয়েছে।

মানস ভৌমিক

শেষ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ ০৭:৩৯

অসাম্য নিয়ে গবেষণায় ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ভামসি বকুলাভরণম বিশ্বব্যাপী অতি-সুপরিচিত নাম। অসাম্য নিয়ে তাঁর এক দশক অতিক্রান্ত গবেষণা এবং বিভিন্ন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নালে এই বিষয়ে প্রকাশিত বিবিধ গবেষণাপত্র গবেষক-মহলে বহুল পঠিত হয়েছে। ওঁর দীর্ঘ গবেষণার নির্যাস এ বার গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেল। টমাস পিকেটি-র ২০১৪ সালের বই ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি প্রকাশের পরে অসাম্য নিয়ে আলোচনার এক নবদিগন্ত খুলে গেছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এ-হেন গবেষণায় ভারত এবং চিন এই দু’টি দেশের অসাম্য সংক্রান্ত বিশ্লেষণ সর্বত্রই গুরুত্ব পায়। অসাম্য নিয়ে সেই দীর্ঘ আলোচনার সূত্র ধরেই এই বই সময়ের দাবি পূরণ করেছে। এই বইটির একটি বিশেষত্ব হল এই যে, শুধু ভারত নিয়ে নয়, চিনের অসাম্য নিয়েও সুদীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য হল চিনের ১৯৫০ থেকে ১৯৭৬ (অর্থাৎ, মাও জে দং-এর সময়কাল), এই সময়কাল নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা খুব বেশি দেখা যায় না। এই বই সেই শূন্য স্থান পূরণ করেছে।

বইটিতে ন’টি অধ্যায় রয়েছে। তিনটি অধ্যায়ে চিন এবং তিনটি অধ্যায়ে ভারতের অসাম্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। তার সঙ্গে সূচনা ও উপসংহার ছাড়া অষ্টম অধ্যায়ে চিন, ভারত এবং বর্তমান বিশ্বে এই দুই দেশের তুলনামূলক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, বইটি এক জন অর্থনীতির অধ্যাপকের লেখা হলেও এতে কোনও গাণিতিক সমীকরণের ব্যবহার করা হয়নি। যদিও আলোচনার দাবি মেনেই প্রভূত পরিমাণে তথ্যসমৃদ্ধ সারণির ব্যবহার করা হয়েছে। এরই সঙ্গে এ কথাও বলে রাখা ভাল যে, এই বই একেবারে গোগ্রাসে গিলে ফেলার মতো বই নয়। বরং এই বই পাঠককে ধৈর্য সহকারে বারে বারে ফিরে আসার দাবি জানায়। ২৮৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ভারত ও চিন এই দুই দেশের অসাম্য নিয়ে সাল-তারিখ ধরে ধরে বিভিন্ন পর্ব-উপপর্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত আলোচনা এই বইয়ে রয়েছে। এই আলোচনা পাঠকের মনোযোগ দাবি করে।

তিন ভাগে ভাগ করে এখানে অসাম্যের আলোচনা করা হয়েছে— এক, ব্যক্তি-মানুষের আয় ও সম্পদের অসাম্য; দুই, ব্যক্তি-মানুষের অসাম্যকে মার্ক্সীয় শ্রেণি-কাঠামোয় প্রোথিত করা; তিন, এই দু’টি আলোচনাকে বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিরিখে দেখা। সাইমন কুজ়নেটের অতিসরলীকৃত অসাম্য নিয়ে দেওয়া নিদান এই যে, দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির প্রথম দিকে অসাম্য বাড়লেও পরবর্তী ধাপে গিয়ে অসাম্য কমে যায়। এই বই তাঁর সুগভীর ব্যাখ্যা সহযোগে আমাদের প্রতিপ্রশ্ন করতে শেখায়— বিভিন্ন উন্নত দেশেও ১৯৭০-এর পরে অসাম্য বাড়তেই দেখা গেছে এবং ১৯৫০-এর দশক থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেখানে অসাম্য বাড়তে দেখা যায়নি।

বইটির নাম থেকে পাওয়া ক্লাস বা শ্রেণি ও অসাম্যের দ্যোতনাই আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, এই বই গবেষণার মার্ক্সবাদী ঘরানার ফসল। আর তাই ক্লাস বা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবন কী কী ভাবে আবর্তিত হল এই সুদীর্ঘ কাল জুড়ে, তার বিশদ, বিস্তারিত তথ্য-পরিপূর্ণ আলোচনা এখানে পাওয়া যাবে। ক্লাস বা শ্রেণি-ভাবনা এই বইয়ের হৃৎস্পন্দন। মার্ক্সীয় শ্রেণিকাঠামোর মধ্যে থেকেই তথ্যেরা এখানে ডালপালা মেলে দিয়েছে। লেখকের কথা ধার করেই এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে ক্লাস বা শ্রেণির ধারণাটি কোনও সনাতন মার্ক্সবাদী ধারাকে অনুসরণ করেনি, বরং তথ্য আহরণ ও তথ্য বিশ্লেষণের জন্য ক্লাস বা শ্রেণি-ধারণার বিবর্তন সাধন করা হয়েছে। যেমন পঞ্চম অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, ভারতের ক্ষেত্রে শ্রেণিকাঠামো হল— শহরের ক্ষেত্রে মালিক-ম্যানেজার; পেশাদার (প্রফেশনাল); সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী; অসংগঠিত ক্ষেত্র; শহরের বাকিরা এবং গ্রামের ক্ষেত্রে— গ্রামীণ এলিট; ছোট ও মাঝারি চাষি; কৃষি শ্রমিক; অন্যান্য শ্রমিক; গ্রামীণ বাকিরা। এ ছাড়াও শ্রেণি বিষয়ে আরও গভীরে গিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অধ্যাপক ভামসি বকুলাভরণমের শ্রেণি নিয়ে কাজ অর্থনীতি চর্চায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র সংযুক্তি।

ক্লাস অ্যান্ড ইনইকুয়ালিটি ইন চায়না অ্যান্ড ইন্ডিয়া, ১৯৫০-২০১০ভামসি বকুলাভরণম

১৪৯৫.০০

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস

মাওয়ের সময়কালে অসাম্য নিয়ে ভাবনা ছাড়াও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে গণপরিসরে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল— এই বইয়ে তার সুফলের কথা আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৮২ সালে চিনের সাক্ষরতার হার ছিল ৬৫.৫ শতাংশ, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে সেই হার ছিল ৪৩.৬ শতাংশ। এ ছাড়াও চিনের বিভিন্ন স্থান ও জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রেও বৈষম্য কম ছিল। ফলস্বরূপ ১৯৭৮-পরবর্তী চিনের উল্লম্ফন মাওয়ের সময়ের এই ধরনের উদ্যোগের ফলে ব্যাপক ভাবে সফল হয়েছে। মাও-পরবর্তী সময়ে চিনে সম্পদের বৈষম্য অনেকটাই বেড়ে যায়।

বেশ কিছু তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়েও খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখানে আছে— যার মধ্যে একটি হল শ্রেণি বা ক্লাস অ্যানালিসিস। এ ছাড়াও রেগুলেশন থিয়োরি বা নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব নিয়ে আলচনা, বিভিন্ন ধরনের ধনতন্ত্রের তাত্ত্বিক দিক, প্রবৃদ্ধির তত্ত্ব (গ্রোথ মডেলস) ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। চিন দেশের ১৯৭৮-এর পরের অবস্থা বুঝতে গেলে স্মিথ, ওয়েবার নাকি মার্ক্স, কার কাজের মাধ্যমে ভাল বোঝা যায়? চিনের সরকারের সঙ্গে ধনতন্ত্রের সম্পর্কের প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে ১৯৫১ থেকে ১৯৮৩ এবং ১৯৮৩ থেকে ২০১০, এই ভাবে দু’টি বড় পর্বে অসাম্যের আলোচনাকে দু’টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৫১-১৯৮৩, এই পর্বে লেখক দেখিয়েছেন যে, চিনের তুলনায় অসাম্য কমানোর দিকে জোর ছিল তুলনায় কম। এর ফলস্বরূপ ধীরগতিতে হলেও পুঁজিপতিদের বিকাশ ঘটে— সবুজ বিপ্লবের মতো নীতির জন্যে ধনী কৃষক, শহরের ধনী প্রফেশনাল এদের উন্নতি ঘটে। অন্য দিকে, এই সময়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, শহরে ও গ্রামে শ্রমিকদের অবস্থার তুলনামূলক অবনতি ঘটে।

অন্য দিকে, ১৯৮৩ সালের পর থেকে ভারতের শহরাঞ্চলে দু’টি শ্রেণির বিপুল উন্নতি ঘটে, যথা— শহরের মালিক এবং ম্যানেজার-প্রফেশনাল শ্রেণি। এ ছাড়াও এই সময়কালে বিপুল ভাবে গ্রামীণ এলিটরা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে শহুরে এলিট শ্রেণিতে চলে আসেন। এবং এই সময়ে শহুরে অসংগঠিত শ্রমিক, গ্রামীণ ছোট চাষি, কৃষি শ্রমিক— এই শ্রেণির মানুষজনের অবস্থার অবনতি ঘটে। এখানে ১৯৮০-র দশকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৯৮০-র দশককে ফিরে দেখার কথাও বলা হয়েছে, কারণ এই সময় ভারত ও চিনে এক দিকে যেমন বৃদ্ধির হারে জোয়ার এসেছিল, অন্য দিকে অসাম্যের মাত্রায় তেমন বৃদ্ধি হয়নি। পরবর্তী কালে জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অসাম্যেরও বৃদ্ধি হয়।

এই বইটিতে ভারত নিয়ে বিশ্লেষণ ২০১০ সাল অবধি রয়েছে। ২০১০-পরবর্তী সময় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা তেমন নেই, লেখকের মতে তথ্য সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ২০১০-পরবর্তী পর্বে হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী দিনে লেখক ২০১০-পরবর্তী সময় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা আমাদের সামনে নিয়ে আসবেন।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy