জাতিব্যবস্থার ব্যাপ্তি কি বিশ্বজনীন? জাতির বিশ্বব্যাপী ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা কি সম্ভব? আলোচ্য গ্রন্থে সুরজ মিলিন্দ ইয়েংড়ে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছেন। জাতিকে একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা হিসাবে পেশ করে ইয়েংড়ে বহির্বিশ্বে জাতচেতনা ও জাত-বিরোধী আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরেছেন। পুস্তকের ভূমিকায় মূল বিষয়বস্তুর অবতারণা করতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন, কী ভাবে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের জাতিব্যবস্থা ও অস্পৃশ্যতার চিত্র উঠে এসেছে ফা-হিয়েন, হিউয়েন-সাং এবং আল-বিরুনির ভ্রমণকাহিনিতে। সেই সঙ্গে তিনি বেদবিরোধী, নাস্তিক ও সুখবাদী লোকায়ত বা চার্বাক দর্শনের গুরুত্বের প্রতি পাঠকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ইয়েংড়ের মতে, লোকায়ত ভাবদর্শনের মধ্যেই সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী প্রবণতার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।
প্রথম অধ্যায়ে ইয়েংড়ে জাতিব্যবস্থার উৎস সম্পর্কিত প্রধান দৃষ্টিকোণগুলি বর্ণনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি লুই ডুমো ও নিকোলাস ডার্কস-এর তত্ত্ব আলোচনা করেছেন। সুসান বেলির বিশ্লেষণের উপরে ভিত্তি করে ইয়েংড়ে মোগল আমলে ভূমিসম্পর্কে ধার্মিক মাত্রার সংযুক্তিকরণ এবং তার ফলে শ্রেণিসদৃশ গোষ্ঠীগুলির জাতিগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া আলোচনা করেছেন। প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, মধ্যযুগীয় ভ্রমণকাহিনি এবং ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণার আলোচনার মাধ্যমে ইয়েংড়ে তুলে ধরেছেন যে, এই নানাবিধ পর্যালোচনায় ব্রাত্য থেকে গেছে স্বকীয় দলিতচেতনা ও নিম্নবর্ণের মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তবতার মননশীল অনুধাবন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইয়েংড়ে মরাঠি দলিত সাহিত্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বর্ণনা করেছেন। আলোচনায় যা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে তা হল, জনার্দন ওয়াঘমারের মতো সাহিত্যিকদের আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ও দলিত এবং জাতি (কাস্ট) ও বর্ণ (রেস)-এর মধ্যে সাদৃশ্য তুলে ধরার প্রচেষ্টা। তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে দলিত আন্দোলন কর্তৃক জাতি ও বর্ণের সাদৃশ্য কৌশলগত ভাবে ব্যবহার করার প্রয়াস। এই সূত্রে ইয়েংড়ের আলোচনায় উঠে এসেছে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত মহারাষ্ট্রের দলিত প্যান্থার আন্দোলনের প্রসঙ্গ। সেই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অজানা তথ্য— আম্বেডকর ও বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ডব্লিউ ই বি ডু বোয়স-এর মধ্যে দলিত ও কৃষ্ণাঙ্গদের অনুরূপ পরিস্থিতি নিয়ে পত্রালাপ। এ ছাড়াও ইয়েংড়ে তুলে ধরেছেন আম্বেডকর কর্তৃক দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নীতির শিকার কৃষ্ণাঙ্গদের পরিস্থিতি এবং ভারতীয় গ্রামগুলিতে দলিতদের পরিস্থিতির মধ্যে তুলনা টানার প্রচেষ্টা। পরিশেষে ইয়েংড়ে বিশদে আলোচনা করেছেন, কী ভাবে বিগত কয়েক দশক ধরে দলিত আন্দোলনকারীরা জাতিভিত্তিক বৈষম্যকে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন অল ফর্মস অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন, জ়েনোফোবিয়া অ্যান্ড রিলেটেড ইনটলারেন্স’-এর অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে তাঁরা জাত-সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটাতে পেরেছেন, সীমিত ভাবে হলেও।
কাস্ট: আ গ্লোবাল স্টোরি
সুরজ মিলিন্দ ইয়েংড়ে
৮৯৯.০০
পেঙ্গুইন অ্যালেন লেন
চতুর্থ অধ্যায়টির বিষয়বস্তু হল ত্রিনিদাদে ভারতীয় প্রবাসীদের মধ্যে জাতির প্রভাব, যাঁরা ত্রিনিদাদের জনসংখ্যার প্রায় ৪০%। লেখক দেখিয়েছেন যে, ত্রিনিদাদে জাতির পেশাগত ভিত্তি, দৈনন্দিন জীবনে জাতিবৈষম্য এবং জাতিকেন্দ্রিক হিংসা অবলুপ্ত হয়ে গেলেও ধর্মীয় আচারপ্রক্রিয়ায় ব্রাহ্মণের প্রভাব ক্রমবিদ্যমান। পুরোহিত হিসাবে এখনও শুধুমাত্র ব্রাহ্মণকেই স্বীকার করা হয়। কিন্তু ত্রিনিদাদের হিন্দুরা ধর্মপরায়ণ হলেও যথেষ্ট উদার এবং প্রগতিশীল। তাঁদের কাছে হিন্দু পরিচয় অপরিহার্য, কারণ তাঁরা হিন্দু ধর্মকে অতীত এবং পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার একটি উপায় হিসাবে দেখেন। ত্রিনিদাদের বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালাচ্ছে, কিন্তু তাদের সেই প্রচেষ্টা মুসলিম-বিরোধী নয়, যদিও ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, হিন্দু চেতনার গভীরতা ও ব্যাপকতার ফলে স্বতন্ত্র জাতি-বিরোধী রাজনীতি ত্রিনিদাদে অনুপস্থিত।
পঞ্চম অধ্যায়ে ইয়েংড়ে লিপিবদ্ধ করেছেন বহির্বিশ্বের আন্দোলনের কর্মকাণ্ড, যা প্রবাসী ভারতীয় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতিভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াস করে চলেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন আম্বেডকরপন্থী দলিত সংগঠনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও কার্যকলাপ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর আলোচনায় ঠাঁই পেয়েছে উলভারহ্যাম্পটনে অবস্থিত ডক্টর আম্বেডকর মেমোরিয়াল কমিটি অব গ্রেট ব্রিটেন, এবং আমেরিকার আম্বেডকর আন্তর্জাতিক মিশন ও ভলান্টিয়ার্স ইন সার্ভিস টু ইন্ডিয়া’জ় অপ্রেসড অ্যান্ড নেগলেক্টেড। সেই সঙ্গে ইয়েংড়ে বহির্বিশ্বে দলিত আন্দোলন গড়ে তুলতে রাজু কম্বলে ও লক্ষ্মী বেড়বা-র মতো ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবদান উল্লেখ করেছেন।
ইয়েংড়ের গবেষণা দু’টি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তিনি জাতিকে নৃতাত্ত্বিক ও নির্বাচনী রাজনীতিকেন্দ্রিক পর্যালোচনায় আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতাকে অতিক্রম করে জাত-কে মানবতার পরিপন্থী একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যারূপে উত্থাপন করেছেন, এবং জাতিবিরোধী আন্দোলনের প্রসার ঘটাতে আন্তর্জাতিক সংহতির দাবি জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি জাতির প্রকৃত চরিত্র অনুধাবনের জন্য জাতিব্যবস্থার দ্বারা বঞ্চিত ও প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর জীবন-অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার উপরে নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সর্বোপরি, ইয়েংড়ে জাতিব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে কিছু পরিচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের প্রাঞ্জল বর্ণনা পেশ করেছেন। তবে ত্রিনিদাদের হিন্দু সমাজ সম্পর্কে আলোচনার অংশটিকে নতুন গবেষণার পরিশ্রুতি হিসাবে ধরা যেতে পারে। অন্যান্য দেশের দলিত সংগঠনগুলোর আলোচনাতেও নতুনত্ব রয়েছে, যদিও নিকোলাস জাউল, ইভা-মারিয়া হার্ডম্যান ও অন্য গবেষকরা ইতিমধ্যেই তাঁদের পর্যালোচনায় অনুরূপ তথ্য পেশ করেছেন।
যদি শুধুমাত্র গবেষণাধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তা হলে বইটির কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়বে। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স-এর ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ়-এ আয়োজিত এই বইয়ের উপরে এক আলোচনাসভায় দলিত নারীবাদী গবেষক কিরুবা মুনুসামি ইয়েংড়ের বিশ্লেষণে দলিত নারীদের সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। তদুপরি কিরুবা সমালোচনা করেছেন এই বইয়ের আলোচনায় মহারাষ্ট্রের মাহার জাতিগোষ্ঠীর আন্দোলনকেই দলিত আন্দোলনরূপে দেখানোর প্রবণতাকে। কিরুবার মতে, এর ফলে পারায়া-র মতো অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী দলিত জাতিগোষ্ঠীর অবদান ও সংগ্রাম সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। ‘গ্লোবাল কাস্ট’-এর ধারণায় অন্তরালে বিভিন্ন ধরনের জাতিভিত্তিক অভিজ্ঞতার অতিসাধারণীকরণ ঘটেছে, যার ফলে জাতিবিন্যাস ও জাতিবিরোধী আন্দোলনের আঞ্চলিক বৈচিত্র উপেক্ষিত হয়েছে। কিরুবা তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বিশেষ ভাবে স্মরণ করিয়েছেন যে, দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যেকার আন্তর্গোষ্ঠীগত বিভাজন বিবেচনা করা বিশেষ ভাবে প্রয়োজনীয়, যে-হেতু জাতি একটি ক্রমবিভক্ত (গ্রেডেড) অসম ব্যবস্থা।
আলোচনার জন্য যে বিষয়গুলি নির্বাচন করা হয়েছে তাদের মধ্যে যোগাযোগের সুস্পষ্টতা এবং গতানুগতিক গবেষণা-পদ্ধতির বাইরে গিয়ে তার্কিক (পোলেমিক) ও সামাজিক ভাষ্যকে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এই বইটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে প্রচলিত জ্ঞানবিদ্যার অতিক্রমণ হিসাবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু, গবেষণার স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী বইটির বিশ্লেষণকে গবেষণাধর্মী পর্যালোচনা হিসাবে গণ্য করা যায় কি না, সেই প্রশ্নটি থাকবে। তদুপরি, দলিত-কৃষ্ণাঙ্গ সংহতির উপর এখানে অতিরিক্ত গুরুত্ব ও প্রত্যাশা আরোপ করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, দলিত-কৃষ্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মোর্চা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে ব্যবহারিক দ্বন্দ্ব ও সমস্যা রয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা করা হয়নি। তবে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বলা চলে— এই বইটি বিশ্বজনীন জাতিবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে কার্যকর বৌদ্ধিক পৃষ্ঠভূমি গঠন করার এক অভূতপূর্ব এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)