আজকের পাঠক কেন অতীতের যুদ্ধের ইতিহাস পড়বেন? স্যর যদুনাথ সরকার তাঁর ‘মিলিটারি হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ বইয়ের শুরুতেই এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন। তাঁর মতে, ইতিহাস কেবল অতীত জানার নয়, রণনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের মাধ্যমও বটে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগেও ইতিহাস থেকে লব্ধ শিক্ষা নতুন সমরকৌশল তৈরিতে সহায়ক হয়। তাই সামরিক কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও ভারতের যুদ্ধ-ইতিহাসের জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মূল নথিপত্র ঘেঁটে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার যে মানদণ্ড যদুনাথ তৈরি করেছিলেন, তার অন্যতম উদাহরণ বইটি সম্প্রতি বঙ্গানুবাদে প্রকাশ পেল। আলেকজ়ান্ডার ও পুরু থেকে শুরু করে পানিপথ বা হলদিঘাটের মতো যুদ্ধের কৌশলগত বিশ্লেষণ রয়েছে, পাশাপাশি দৌলম্বাপুরের মোগল-পঠান যুদ্ধ বা বাজিরাওয়ের পালখেড় অভিযানের মতো তুলনামূলক ভাবে কম আলোচিত অথচ কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের অনুপুঙ্খ বিবরণও পড়া যাবে। পাঠক অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতের সমরকৌশলের বিবর্তনপথ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। দ্রুতগামী ঘোড়া বা আগ্নেয়াস্ত্রের মতো উপকরণের নির্ণায়ক ভূমিকার পাশাপাশি, কখনও আবার রণক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থান নির্বাচন ও ব্যূহ রচনার মুনশিয়ানায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল সামরিক শক্তিও কী ভাবে যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে তার চমৎকার বর্ণনা পড়া যাবে। বাংলা ভাষায় সামরিক ইতিহাস-চর্চায় বইটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, বলা চলে।
ভারতের সামরিক ইতিহাস
যদুনাথ সরকার
৩৭৫.০০
খড়ি প্রকাশনী
দেখা— এই শব্দটিকেই বলা যেতে পারে এ-বইয়ের বীজমন্ত্র। এক-এক বয়সের এক-এক রকম দেখা, কেবল দেখার ক্ষমতাতেই মানুষের জীবনের এক পরম প্রাপ্তিও সম্ভব, লেখেন অবন বসু। এক অর্থে এ-বই আত্মস্মৃতি যেমন, আবার ভ্রমণকথাও, শৈশব থেকে শুরু করে অধুনাকাল পর্যন্ত কাছে-দূরের জগৎ, জীবন, প্রকৃতি ও সমাজের বীক্ষণ-পর্যটন। কাজ ও লেখালিখির সূত্রে বহু বিখ্যাত মানুষের সংস্রবে এলেও তাঁদের ‘দেখা’র কথা বলার লোভ তিনি পরিহার করেছেন বরং, লিখেছেন পথে ও চলার পথে দেখে-চলা অগণিত সাধারণ জীবনের কথা। তিনটি পর্বে, বত্রিশটি নাতিদীর্ঘ লেখা, অনেকটা যেন জার্নালের চলনে, চকিত চলতে চলতে কখনও দাঁড়িয়ে পড়ছে চোখের সামনে এসে-পড়া আর এক জীবননাট্য দেখতে, কখনও আলগোছে তুলে নিচ্ছে ভালবাসার ফুল, তেষ্টা-মেটানো আঁজলা-ভরা জল। লেখক এখানে কথক নিশ্চয়ই, তারও বেশি দর্শক, যেন এক চিত্রশালায় দেখিয়ে দিচ্ছেন এক-একটি ছবি— পল্লীশ্রী গ্রামের অতুল সহিস, দোকানে-বসা দীপেশদাদু, ইস্কুলের শিক্ষিকা অজিতাদি, ইতিহাস-পড়ানো চরিতবাবু স্যর, অচিন চোর, রহমান গুণিন, আরও কতজন! বৃহত্তর মানবসমাজের প্রান্তে বা দৃষ্টিসীমারও বাইরে হয়তো এঁদের অবস্থান, কিন্তু লেখকের জীবনে প্রত্যেকে দিয়ে গেছেন অমূল্য স্মৃতিসম্পদ— সারান্ডার জঙ্গলে মালগাড়ির ড্রাইভার রঞ্জিতদা ট্রেন ডিসট্যান্ট সিগন্যাল পেরোতেই মস্ত ট্রাভল ব্যাগ থেকে বার করেন হারমোনিয়াম আর গেয়ে ওঠেন ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে কুড়াই ঝরাফুল একেলা আমি’, এরও বেশি প্রাপ্তি এ-জীবনে আর কী! এক-জীবনের সব দেখাকে ‘দিনশেষের ঝুঁঝকো আলোয়’ তুলে ধরার এই প্রয়াস নজর ও মন দুই-ই কাড়ে।
পান্থজনের পদাবলি
অবন বসু
৩৫০.০০
বইওয়ালা বুক ক্যাফে
বাঙালির কাছে কোরাপুট অচেনা জায়গা নয়, বর্ষা এলে কাছাকাছি ভ্রমণ-গন্তব্যগুলির মধ্যে খোঁজ পড়ে দক্ষিণ ওড়িশার এই জায়গাটিরও। তবে পূর্বঘাট পর্বতমালার এই স্থানটি শুধু নিসর্গসৌন্দর্যের জন্যই নয়, সমৃদ্ধ তার সংস্কৃতির সুবাদেও। প্রাচীন কৃষি-ঐতিহ্য, বর্ণময় নৃত্যগীত, মনোহর বস্ত্রশিল্প ও এখানকার মানুষের কৌম কৃষ্টি কোরাপুটকে করে তুলেছে ভারতের লোকসংস্কৃতি-চর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। প্রাঞ্জল ইংরেজি ভাষায়, রঙিন আলোকচিত্রে সাজিয়ে তোলা এই বইটি প্রধানত সেই সব পাঠকের কথা মাথায় রেখে তৈরি, একটি জায়গাকে তার ভূগোল ইতিহাস সমাজ সংস্কৃতির আয়নায় যাঁরা দেখতে আগ্রহী। দেওমালি পাহাড়, ডুডুমা জলপ্রপাত, কোলাব নদীর দান কোরাপুটকে সমৃদ্ধ করেছে, এখানকার কৃষিজীববৈচিত্রও গবেষণার দাবিদার। বইটিতে এ অঞ্চলের জনজাতি গোষ্ঠীগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট তথ্য পাবেন পাঠক, জানতে পারবেন তাঁদের জীবন, বিশ্বাস, বৃত্তি, সংস্কার, আচার-উৎসব ইত্যাদি নিয়েও। বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ নিঃসন্দেহে কোরাপুটের লোকসাংস্কৃতিক পর্বটি: গীতবাদ্যযন্ত্র, কোটপাড ও কেরাং বস্ত্র-ঐতিহ্য, কাঠ বাঁশ বেত ও পোড়ামাটির কাজ, খাদ্য-পানীয়েরও পরিচয়।
কোরাপুট কথা
অনন্যা ভট্টাচার্য, মধুরা দত্ত
মূল্য অনুল্লিখিত
অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন, কনট্যাক্ট বেস/বাংলানাটক ডট কম
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)