Advertisement
E-Paper

নিখুঁত স্যুটের অন্দরে নিপাট ধুতি-পাঞ্জাবি

বিশ্বব্যাঙ্কের যাবতীয় কাজের চাপও তাঁর ভিতরে থাকা বাঙালি ভদ্রলোকটিকে এলেবেলে আর দুইডোকু-র কাছে আসা থেকে আটকাতে পারে না। আন্তর্জাতিক ও বাঙালি, দুই সত্তাতেই সমান উজ্জ্বল কৌশিক বসু।বিশ্বব্যাঙ্কের যাবতীয় কাজের চাপও তাঁর ভিতরে থাকা বাঙালি ভদ্রলোকটিকে এলেবেলে আর দুইডোকু-র কাছে আসা থেকে আটকাতে পারে না। আন্তর্জাতিক ও বাঙালি, দুই সত্তাতেই সমান উজ্জ্বল কৌশিক বসু।

অমিতাভ গুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৭ ০১:১০
ছবি: সুব্রত চৌধুরী

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সদ্য ইন্টারনেটের নাগাল পেয়েছি। ফেসবুক তো বটেই, সে জমানায় অর্কুটও ছিল না। কাজেই, ইন্টারনেট খুলে খানিক লেখাপড়াও করতাম। সে ভাবেই পড়লাম একটা সদ্য-প্রকাশিত পেপার। কিছুটা বুঝলাম, কিছুটা মাথার ওপর দিয়ে গেল। সার্চ করতে লেখকের ই-মেল ঠিকানা পাওয়া গেল। কী মনে হল, নিজের না-বোঝার কথা খোলসা করে লিখে একটা মেল পাঠিয়ে দিলুম তাঁকে। জবাব আসবে, মোটেও ভাবিনি। কী আশ্চর্য, পরের দিন ইমেল খুলেই দেখি, লেখক উত্তর দিয়েছেন। একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলেছেন, দিন কয়েকের মধ্যেই দিল্লিতে পৌঁছবেন। যে কথাগুলো আমি বুঝতে পারিনি, তখন ফোন করলে বুঝিয়ে বলবেন।

সেই ফোনেই প্রথম আলাপ কৌশিক বসুর সঙ্গে। কী খটকা ছিল, এখন আর মনেও পড়ে না। তাতে ক্ষতি নেই। এক অকিঞ্চিৎকর ছাত্রের খটকা দূর করার জন্য তিনি সময় দিতে দ্বিধা করেননি একটুও, এটুকু মনে রাখাই তো যথেষ্ট।

কৌশিক বসু মানুষটা আসলে এই রকমই। যখন ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন, তখনও; যখন বিশ্ব ব্যাঙ্কের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হলেন, তখনও— অহেতুক পায়াভারী হওয়ার বঙ্গীয় রোগটি থেকে আশ্চর্য রকম মুক্ত। স্মিত হাসি ছাড়া তাঁকে দেখেছেন, গোটা দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম। তাঁর রসবোধে মুগ্ধ হননি, এমন মানুষ বোধ হয় আরও কম। বছর দশেক আগে তাঁর সম্পাদিত ‘দ্য হ্যান্ডবুক অব ইন্ডিয়ান ইকনমি’ বইটার প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এক ইতিহাসবিদ। বইটার সম্বন্ধে বলতে উঠে তিনি সেই বইয়ে না থাকা কিছু বিষয়ের কথা উল্লেখ করে বললেন, এগুলো থাকলে ভাল হত। কৌশিকবাবুর চকিত উত্তর ছিল, ভাল হত তো বটেই, কিন্তু সব রাখতে গেলে বইটার নাম হ্যান্ডবুক না রেখে ডিকশনারি রাখতে হত, এই যা!

উত্তর কলকাতায় জন্ম। বাবা কেশবচন্দ্র বসু ছিলেন খ্যাতনামা আইনজীবী, কলকাতার মেয়র হয়েছিলেন ১৯৬০-এর দশকে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে পড়া শেষ হতে বাবা বললেন, তিনি চান ছেলে পদার্থবিজ্ঞান পড়ুক। পুত্র জানালেন, তিনি কিছুই পড়তে চান না। দুইয়ের মাঝামাঝি রফা হল— দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে অর্থনীতি পড়তে ভর্তি হলেন কৌশিক। সেখান থেকে দিল্লি স্কুল, তার পর লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স। অমর্ত্য সেনের কাছে পিএইচ ডি করলেন। থিসিস শেষ, কিন্তু জমা করার জন্য বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হল— দু’বছরের কম সময়ে থিসিস জমা দেওয়ার নিয়ম নেই যে! তত দিনে অর্থনীতির সঙ্গে তাঁর সখ্য গভীর হয়েছে— যুক্তির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে গিয়েছেন তিনি। ১৩ বছর কাটল দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স-এর অধ্যাপক হিসেবে, তার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। এখনও সেখানেই।

তাঁর লেখা যে পেপারটা প্রথম পড়েছিলাম, তার বিষয় ছিল, কেন ট্যাক্সি চড়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছনোর পরও আমরা ভাড়া না দিয়েই পালিয়ে যাই না! কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থাকে মেনে নিলে কী মুশকিল হতে পারে; কেন এক বিশেষ ধরনের ঘুষ দেওয়াকে আইনসম্মত করে তোলা প্রয়োজন; যদি পরিবারের শিশুর মঙ্গলের কথা ভেবে টাকা দেওয়া হয়, তবে সে টাকা বাবার হাতে দিলে সন্তানের ভাল, না কি মায়ের হাতে দিলে; অর্থনীতির যুক্তি মেনে কোনও একটি জাত সময়ানুবর্তী হয়ে উঠতে পারে কি না— এমন বিচিত্র সব বিষয়ে পেপার রয়েছে তাঁর। অর্থনীতির যুক্তি দিয়ে কত কীই যে বুঝে নেওয়া যায়, সেই দিগন্ত আবিষ্কারে অন্তহীন উৎসাহ তাঁর।

দুনিয়ার প্রথম সারির অর্থনীতিবিদদের তালিকায় কৌশিক বসুর নাম বেশ কিছু দিন ধরেই পাকা। মূলধারার অর্থনীতি, বাজারই যার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু, সেই বাজারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বই লিখেছেন তিনি। ‘বিয়ন্ড দি ইনভিজিব্‌ল হ্যান্ড’-এ তিনি দেখিয়েছেন, বাজারের নিয়ম কোথায় এবং কেন ব্যর্থ হয়, সেই ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের পথই বা কী। একেবারে মূলগত সমালোচনা, কিন্তু মূলধারার অর্থনীতির ভিতরে থেকেই। প্রতিষ্ঠানকে যদি ভাঙতে হয়, তবে তা ভিতর থেকেই ভাঙতে হবে— বস্তুত, নতুন করে গড়তে হবে— এই বিশ্বাসের এক আশ্চর্য বাস্তবায়ন ছিল তাঁর বইটি।

তবে, শুধু অর্থনীতির জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি, সেই সম্ভাবনার পথ নিজের হাতেই বন্ধ করে দিয়েছেন। আরও অন্তত একটা কারণে তাঁকে মনে রাখতেই হবে। Duidoku। সুডোকু নামের একা একা খেলার সংখ্যার খেলা তাঁর অসম্ভব প্রিয়। তাঁর নিজের কথায়, ‘সুডোকু খেলে বহু সময় নষ্ট করার পর আমি নতুন খেলা তৈরি করে ফেললাম— যাতে দুজন লোক এক সঙ্গে সুডোকু খেলে দ্বিগুণ সময় নষ্ট করা যায়!’ খেলাটার নাম দুইডোকু। হ্যাঁ, নিয্যস বাংলার ‘দুই’। ওয়াশিংটন ডিসি-তে বিশ্বব্যাঙ্কের সদর দফতরে বসেও তাঁর ভিতরকার বাঙালি লড়ে যায় নিজের মতো। (নষ্ট করার মতো সময় হাতে থাকলে www.duidoku.com-এ গিয়ে খেলে দেখতে পারেন।)

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের অনুরোধে ভারতের মুখ্য অর্থনীতিবিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অধ্যাপক বসু। সারা জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপদ আশ্রয়ে কাটিয়ে আসা অর্থনীতিবিদের আমলাতন্ত্রের মহামন্দিরে কী হাল হবে, ভেবে অনেকেই আঁতকে উঠেছিলেন। তিনি নিজে ঘাবড়াননি? তাঁর উত্তরটা শোনার মতো। ‘ভেবে দেখলাম, নৃতাত্ত্বিকরা যখন প্রত্যন্ত সব গ্রামে গিয়ে মাসের পর মাস থাকতে পারেন, তখন আমিও বোধ হয় নর্থ ব্লকের ধাক্কা সামলে উঠতে পারব!’ ধাক্কা সামলেছিলেন বিলক্ষণ— রসবোধ মোক্ষম হলে অনেক ধাক্কাই সামলে ফেলা যায়।

মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদটাকে প্রায় পাকাপাকি ভাবে বদলে দিয়েছিলেন কৌশিক বসু। আমলাতন্ত্রের লালফিতের ফাঁসে জড়িয়ে যাওয়া নয়, এই পদের অধিকারীর প্রধান কাজ যে সরকারি ভাবনায় মুক্ত চিন্তার হাওয়া নিয়ে আসা, অর্থনীতির যুক্তিকে খর্ব না করেই তাকে রাজনীতির খোপে বসাতে পারা, কৌশিক বসু এই কথাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণবণ্টন ব্যবস্থায় চুরি কমানোর দাওয়াই থেকে খাদ্যশস্য নীতি, সরকারি কাজে খুচরো দুর্নীতি, বহু ক্ষেত্রেই তাঁর চিন্তা সরকারি অলিন্দে ছিল অ-পূর্ব। তিনিই যখন বিশ্বব্যাঙ্কের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হলেন, তখন তাঁর অন্যতর পরিচয় হল উন্নয়নশীল দুনিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্বব্যাঙ্কের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ভারতীয় মুখ্য অর্থনীতিবিদ। উন্নয়নশীল দুনিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে দ্বিতীয়। তাত্ত্বিক অর্থনীতির ওপর অগাধ দখলের পাশাপাশি সরকারি নীতির চলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় আছে, এমন অর্থনীতিবিদের সংখ্যা দুনিয়ায় খুব বেশি নয়।

তিন বছরের দিল্লি-প্রবাস তাঁর গল্পের খনি। নর্থ ব্লকের অফিসে প্রথম দিন। সরকারি সাদা অ্যাম্বাসাডর আনতে গিয়েছে তাঁকে। গাড়ির সামনের আসনে উঠে অভ্যেসমত সিটবেল্ট বাঁধতে গেছেন, সরকারি ড্রাইভার হাঁ হাঁ করে উঠলেন। অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাতেই ড্রাইভারসাহেব জানালেন, অধ্যাপক বসুর গাড়িতে লালবাতি রয়েছে— পুলিশই যখন ধরবে না, তখন আর সিটবেল্ট লাগানোর মানে কী? গাড়ি অফিসের সামনে পৌঁছতেই আর এক কাণ্ড। অধ্যাপক বসুর ভাষাতেই বলা যাক— ‘ব্যাগ হাতে গাড়ি থেকে নামতেই এক জন সেই ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটা লাগাল। ইতালিতে এক বার ঠিক এই ভঙ্গিতেই ব্যাগ ছিনতাই হয়েছিল। কাজেই, এই যাত্রায় তৎপর হলাম। দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে চেপে ধরতে জানা গেল, সে আমার আর্দালি। সরকারি অফিসে কেউ নিজের ব্যাগ বয়, এমন সম্ভাবনার কথা সে কল্পনাও করতে পারে না!’

দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা আর ভেঙে বলার প্রয়োজন নেই। সেই গুরুত্বের জলে কৌশিক বসু প্রায় হাঁসের ভঙ্গিতে সাঁতার কেটেছেন। জল পার হয়ে এসেছেন, কিন্তু শরীরে তার ছাপ বহন করেননি। বরং, বিস্তর মজা পেয়েছেন চার ধারের কাণ্ডকারখানা দেখে। পদের গুরুত্ব কেন তাঁর স্বাভাবিকতায় আঁচ ফেলতে পারেনি? তিনি একটা গল্প শুনিয়েছিলেন তাঁর বইয়ে— সেই গল্পের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তরের আভাস আছে। গল্পটা বলি। দিল্লির যে বাংলোয় তিনি থাকতেন, সেখানকার গৃহপরিচারিকা ভদ্রমহিলা ছিলেন বেশ চৌকস। লেখাপড়া জানতেন না বটে, কিন্তু চোখকান খোলা থাকায় জাগতিক জ্ঞানে টেক্কা দিতে পারতেন অনেককেই। এক দিন অধ্যাপক বসু শুনলেন, সেই ভদ্রমহিলা পাশের বাড়ির গৃহপরিচারিকার কাছে তাঁর পরিচয় দিচ্ছেন— ‘আরে, জানিস না, আমার সাহেব কে? চিফ ইকনমিক অ্যাডভাইসার। বাজারে যে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, সেটা উনিই বাড়ান!’ নিজের সম্বন্ধে এহেন কথা শুনে যিনি এতখানি আমোদ পান যে গল্পটা বইয়ে লিখে ফেলতে পারেন, তাঁর মনের ভিতরকার ঝকঝকে ভাবটা বাইরে থেকেও দিব্য দেখতে পাওয়া যায়।

সেই মনের ভিতরে এক জন নিপাট বাঙালির বাস। বহু হিসেবেই তিনি গড়পড়তা বাঙালির চেয়ে ঢের আলাদা। আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বনাগরিক। কিন্তু, নিখুঁত স্যুটের আবরণ থেকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালিও বেরিয়ে আসে ফাঁক পেলেই। সেই বাঙালি সাহিত্যপ্রেমী, সঙ্গীতপ্রিয়, ভোজনরসিক। তবে, শুধু বাঙালি-রসনা নয়, দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের খাবারে আগ্রহ তাঁর। আগ্রহ রাজনীতিতেও। রাজনীতি ছাড়া কি বাঙালি হয়?

বাঙালিয়ানা কী ভাবে জড়িয়ে থাকে তাঁর আন্তর্জাতিক মনকে, অর্থনীতির বৌদ্ধিক চর্চার দুনিয়াতেও বাংলার মায়ার পালক তাঁর হাতছাড়া হয় না, তার উদাহরণ Ele’ Bele’। কথাটা নিতান্তই এলেবেলে। আমাদের আটপৌরে জীবনের এলেবেলে— বাচ্চাদের খেলার দুধুভাতু। এই শব্দটা ছিল কৌশিক বসুর একটা বইয়ের প্রথম লেখার শিরোনাম। দুনিয়ার পাঠককে তিনি শিখিয়েছিলেন, কাকে বলে এলেবেলে।

শিখিয়েছিলেন তিনি, না তাঁর ভিতরে থাকা বাঙালি ভদ্রলোকটি? বিশ্বব্যাঙ্কের যাবতীয় কাজের চাপও যাঁকে এলেবেলে আর দুইডোকু-র কাছে আসা থেকে আটকাতে পারে না?

Poila Baisakh Special Poila Baisakh Celebration Bengali New Year Celebration Celebration Celebrities Kaushik Basu
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy