Advertisement
E-Paper

তাহেরপুরে মোদীর সভায় যোগ দিতে এসে ট্রেন দুর্ঘটনায় জখম, চিকিৎকদের চেষ্টায় ২০ দিন পর সুস্থ বড়ঞার ভৈরব

চিকিৎসকদের পরিভাষায় ‘রেয়ার টু দ্য রেয়ারেস্ট’। দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেনলাইন থেকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল হয়ে কল্যাণী এইমসের আধুনিক ট্রমা কেয়ার ও বিরল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ ভৈরব। কল্যাণী এইমসের চিকিৎসকদলের হাত ধরে এক অসম্ভবকে সম্ভব করে বাড়ি ফিরলেন বড়ঞার এই বাসিন্দা।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৩:১৪
এইমসের আধুনিক ট্রমা কেয়ার ও বিরল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ মুর্শিদাবাদের বড়ঞার ভৈরব ঘোষ।

এইমসের আধুনিক ট্রমা কেয়ার ও বিরল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ মুর্শিদাবাদের বড়ঞার ভৈরব ঘোষ। — নিজস্ব চিত্র।

টানা ২০ দিন কার্যত যমে-মানুষে টানাটানির পর অবশেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন নদিয়ার তাহেরপুরে প্রধানমন্ত্রীর সভায় যোগ দিতে আসা প্রৌঢ়। ট্রেন লাইনে প্রাতকৃত্য সারতে গিয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন পাঁচ জন। বাকি সঙ্গীদের প্রাণ গিয়েছিল ট্রেন দুর্ঘটনায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় কল্যাণীর এইমস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। হাসপাতালের ডিরেক্টর অধ্যাপক অরবিন্দ সিনহা ও মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট অধ্যাপক মহুয়া চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে আইসিইউ-তে চলা দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১১ জানুয়ারি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন মুর্শিদাবাদের বড়ঞার ভৈরব ঘোষ।

চিকিৎসকদের পরিভাষায় ‘রেয়ার টু দ্য রেয়ারেস্ট’। দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রেনলাইন থেকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতাল হয়ে কল্যাণী এইমসের আধুনিক ট্রমা কেয়ার ও বিরল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ ভৈরব। কল্যাণী এইমসের চিকিৎসকদলের হাত ধরে এক অসম্ভবকে সম্ভব করে বাড়ি ফিরলেন বড়ঞার এই বাসিন্দা।

হাসপাতাল সূত্রে খবর, গত ২০ ডিসেম্বর ভৈরবকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তাঁর বাঁ দিকের ফুসফুস ও পাঁজরের হাড় দুর্ঘটনায় চুরমার হয়ে গিয়েছিল। পাঁজরের একাংশ ভেঙে যাওয়ার ফলে তাঁর শ্বাসক্রিয়া উল্টে গিয়েছিল। অর্থাৎ শ্বাস নিলে বুক ফোলার বদলে বসে যাচ্ছিল। তাঁর বাঁ দিকের পাঁজরের হাড় চুরমার হয়ে ফুসফুস কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফ্লেইল চেস্ট’। পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে সাধারণ পদ্ধতিতে প্লেট বসানো সম্ভব ছিল না। গত ২৫ ডিসেম্বর প্রণয় কবিরাজ ও দেবময় ঘটকের নেতৃত্বে চিকিৎসকেরা পিঠের দিক দিয়ে একটি অস্ত্রোপচার করেন। পাঁজরের হাড় যখন স্ক্রু ধরার মতো অবস্থায় ছিল না, তখন চিকিৎসকেরা মেরুদণ্ডের টি-৫ প্রসেসের হাড়কে নোঙর হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে বিশেষ ধাতব প্লেট আটকে পাঁজরের কাঠামো নতুন করে গড়ে তোলেন।

অস্ত্রোপচার পরবর্তী পর্যায়ে আইসিইউ-তে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার লড়াই। কয়েক দিন ভেন্টিলেশনে থাকার পর তাঁকে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে ফিরিয়ে আনা হয়। এর মাঝে ফুসফুসের সংক্রমণ এবং ট্রমা-পরবর্তী তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি বা ডেলিরিয়াম দেখা দিলেও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসিইউ টিমের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। ফিজিওথেরাপিস্টদের অধীনে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং ধীরে ধীরে হাঁটাচলার মাধ্যমে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

অস্ত্রোপচারের জটিলতা প্রসঙ্গে ট্রমা টিমের অন্যতম চিকিৎসক দেবময় ঘটক বলেন, “এটা অত্যন্ত বিরল একটি কেস ছিল। পাঁজরের হাড় এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে মেরুদণ্ডের হাড়কে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া আমাদের কাছে পথ ছিল না। উন্নত ট্রমা ম্যানেজমেন্ট এবং আইসিইউ টিমের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু না হলে ওঁকে ফেরানো কঠিন ছিল।”

মুমূর্ষু অবস্থা থেকে ফিরে ভৈরব ঘোষের কথায় ফুটে উঠল কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদীর সভায় তাঁকে দেখব বলে এসেছিলাম। ভোরের কুয়াশার মধ্যে হঠাৎই সব অন্ধকার হয়ে গেল। পরে জেনেছি আমার সঙ্গীরা আর নেই। আমি তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু এইমসের ডাক্তাররা আমায় নতুন জীবন দিলেন। আমি এখন নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি। অলৌকিক মনে হচ্ছে।”

ভৈরবের আত্মীয় লক্ষণ ঘোষ আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “জেঠুকে যখন এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল ডাক্তারেরা বলেছিলেন অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন। সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে মারা গিয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম উনিও আর ফিরবেন না। কিন্তু হাসপাতাল আমাদের থেকে একটা পয়সাও নেয়নি। বরং নিজেদের থেকে দামি প্লেট কিনে চিকিৎসা করলেন। ডাক্তারবাবুরা আমাদের কাছে ভগবানের সমান।”

হাসপাতালের তরফে দাবি করা হয়েছে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল ট্রমা কেয়ারে উপযুক্ত পরিকাঠামো ও আধুনিক চিন্তাধারা থাকলে মুমূর্ষু রোগীকেও মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Murshidabad
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy