Advertisement
E-Paper

সুরের আকাশে নতুন নক্ষত্র

ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের পাতিয়ালা ঘরানায় এই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম তিনি। নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর সাঙ্গীতিক পরিসরে। নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলতে পেরেছেন কৌশিকী চক্রবর্তী।ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের পাতিয়ালা ঘরানায় এই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম তিনি। নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বৃহত্তর সাঙ্গীতিক পরিসরে। নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলতে পেরেছেন কৌশিকী চক্রবর্তী।

পায়েল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৭ ০১:০৩
ছবি: কুনাল বর্মণ

ছবি: কুনাল বর্মণ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে বাংলা ও বাঙালির স্থান ঠিক কোথায়? পরীক্ষার হল-এ এটা নিশ্চয়ই ‘কমন’ প্রশ্নের তালিকাতেই পড়বে। আর অমনি হইহই করে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসবে একগুচ্ছ নাম, বর্ণনা করব কলকাতার বুকের সেই সব উজ্জ্বল দিন-রাত্রি, জমজমাট মেহফিলের কথা, যেখানে গান গাইছেন গওহরজান। দর্শকাসন পরিপূর্ণ করেছেন শহরের ধনী, সঙ্গীতপ্রেমী পৃষ্ঠপোষকরা। পরে এঁদেরই কারও স্মৃতিচারণে বাঙালির সোনালি দিনের কথা জানতে পারব এবং ভাল জমাটি উত্তর লেখার স্টাইলে আমরা উদ্ধৃত করব অমিয়নাথ সান্যালের ‘স্মৃতির অতলে’। কিন্তু আসল হিরে কোথায়? মানে, বাংলার মুখ হয়ে সর্বভারতীয় স্তরে রাজত্ব করেছেন, এমন হাড়ে-মজ্জায় বাঙালি ক’জন পেয়েছি আমরা?

ইতিহাস কিন্তু খুব গৌরবোজ্জ্বল নয়। ঊনবিংশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে হিন্দুস্তানি সংগীতের প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখব, বাংলায় যে ভাবে সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা হয়েছে বা বাঙালিরা যে ভাবে সর্বভারতীয় স্তরে ‘অসাধারণ শ্রোতা’র তকমা লাভ করে খুশি হয়েছে, ততখানি পূর্ণাঙ্গ শিল্পী ভারতকে দিতে পেরেছে কি না সন্দেহ।

মওজুদ্দিন খান তখন কাঁপিয়ে দিচ্ছেন সারা দেশ, যেমন তাঁর গলার জোর, তেমনই অসাধারণ গায়কি। বন্দিশি বা বোল-বনাও ঠুমরীতে সে সময় তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই। কলকাতার গর্ব গওহরজানের খেয়াল বা ঠুমরীতে তাঁর বিস্তারিত প্রভাব রয়েছে, গওহর নিজেই সে কথা স্বীকার করেছেন একাধিক বার। কিন্তু গওহর বাঙালি নন। সেই সময় বাংলায় শিক্ষক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন বদল খাঁ, কিরানা ঘরানা।

কিন্তু বাঙালি তথাকথিত ‘অভিজাত’ ও ‘ভদ্র’ পরিবারের ঘরের মেয়েদের ও বধূদের ভিতর উচ্চাঙ্গ সংগীত প্রশিক্ষণ চালু করার কৃতিত্ব গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর, যিনি ধ্রুপদ শিখেছিলেন নাসিরুদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে, খেয়াল শিখেছেন এনায়েত হুসেন খাঁ সাহেবের কাছে ও ঠুমরীর তালিম নিয়েছেন ভাইয়া গণপত রাওয়ের কাছে। কাজেই শিল্পীর চেয়েও বেশি প্রশিক্ষক ও বাংলায় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ধারক ও বাহক হিসেবে তাঁর সুনাম হল বেশি। বাঙালি, যাঁর কণ্ঠসংগীতের খ্যাতি আসমুদ্রহিমাচল নাড়িয়ে দিয়েছিল, তিনি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। আফসোস হয়, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটা সুস্থির হলে হয়তো ভারতীয় সংগীতের ক্ষেত্র আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।

একই ভাবে বলা যায়, লখনউয়ের বাঙালি চিন্ময় লাহিড়ীর কথাও। স্বকীয়তায় তিনি চিনিয়েছেন শিল্পীসত্তা, কিন্তু স্বশাসন ও শৃঙ্খলার অভাব ছাপ ফেলেছে তাঁর স্থায়িত্বে। বাঙালি শ্রোতার মনে এখনও তাঁকে নিয়ে কিছু স্মৃতিমেদুরতা আছে বটে, কিন্তু সর্বভারতীয় মননে চিন্ময় লাহিড়ী বিস্মৃতপ্রায়। প্রসিদ্ধ ‘নাকুবাবু’ অর্থাৎ তারাপদ চক্রবর্তী কলকাতার উচ্চাঙ্গসংগীত মহলে অতি সম্মাননীয়। কিন্তু তিনি বাংলায় যতখানি প্রসিদ্ধ হয়েছেন, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তাঁর স্বীকৃতি নিয়ে কোথাও যেন একটা প্রশ্ন যেন থেকেই গিয়েছে, অনেকেই বলেন হয়তো সেটা তাঁর লয়কারির দুর্বলতায়।

সাংস্কৃতিক পীঠস্থান হিসেবে যতই সুখ্যাত হোক, বাংলার সুদীর্ঘ সঙ্গীত ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকটি নাম বাদ দিলে অজয় চক্রবর্তী উঠে এসেছেন একজন পূর্ণমাত্রিক শিল্পী হিসেবে। প্রশিক্ষণ, সাংগীতিক গভীরতা, নিজস্বতা ও শৃঙ্খলা সব দিক থেকেই সমগ্র দেশের তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন আদর্শ বাঙালি প্রতিভূ। তাঁর সাফল্যকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন কন্যা ও শিষ্যা কৌশিকী চক্রবর্তী। একজন প্রথিতযশা শিল্পীর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অনেকখানি দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা ও সাহস প্রয়োজন। কৌশিকীর সেটা আছে বলেই ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের কঠিন ধারায় এই প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম, এই প্রতিযোগিতার মধ্যেও সর্বভারতীয় নিরিখে কণ্ঠসংগীতে নিজের স্থান দখল করে নিতে পেরেছেন তিনি।

কৌশিকীর সৌভাগ্য তিনি বড় হয়েছেন এমন একটি পরিবারে, যেখান থেকে তাঁর সেরা হোমওয়ার্ক ও গ্রুমিং হওয়া সম্ভব ছিল এবং তেমনটাই হয়েছে। বাবা অজয় চক্রবর্তীর শিক্ষা তো বটেই, কৌশিকী প্রশিক্ষণের জন্য পেয়েছেন তাঁর মা চন্দনা চক্রবর্তীকে, যিনি শুধু কলকাতার নন, ভারতের এক জন অন্যতম সেরা শিক্ষক। খুব ছোট থেকেই কৌশিকী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন দিকপাল শিল্পীর সামনে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন এবং সেই সব কঠিন প্রায় পরীক্ষাসম উপস্থাপনা তাঁর আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিয়েছে ধীরে-ধীরে। সবচেয়ে বড় কথা, তরুণ বয়সে কৌশিকীর জনপ্রিয়তা ভারতীয় রাগ-সঙ্গীতেরও একটি অন্য দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কারণ কাঠিন্য বা দুর্বোধ্যতার কারণে যে প্রজন্মের একটি বড় অংশ সঙ্গীতের এই বিশেষ ধারাটি সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল, তাঁদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে কৌশিকীর বিশুদ্ধ সঙ্গীত। বাংলা ও ভারতকে তিনি গৌরবান্বিত করেছেন বিভিন্ন সময়ে দেশের শুধু নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া সম্মান ও পুরস্কারে। এই অল্প বয়সেই তিনি পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত অনুষ্ঠান ও সঙ্গীত-উৎসবে পারফর্ম করেছেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ তো বটেই, নিজের যোগ্যতাতেই এখন কৌশিকী যে সুনাম অর্জন করেছেন, তাতে তাঁর দিকেই সারা বাংলা আক্ষরিক অর্থেই ‘তাকিয়ে’ রয়েছে। কারণ কৌশিকী শুধু শ্রুতিনন্দন নন, দৃষ্টিনন্দনও বটে।

নিজেকে বৃহত্তর সাংগীতিক পরিসরের ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই তিনি বাংলা ও হিন্দি প্লেব্যাকে নিজস্ব স্বাক্ষর রেখেছেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দক্ষিণী ধারাতেও দেখিয়েছেন পারদর্শিতা। তাঁর কণ্ঠস্বর সুন্দর এবং রাগসংগীতের বিভিন্ন কারুকার্য ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম, কৌশিকী সেটা জানেন বলেই হয়তো বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তাঁর প্রবণতা বেশি। নিজের উৎসাহে তৈরি করেছেন ‘সখি’, বিভিন্ন প্রদেশে তাঁর সাঙ্গীতিক বন্ধুদের নিয়ে একটি দল। সেই দল নারীত্বকে মর্যাদা দেয়, যেখানে গানে রয়েছেন কৌশিকী, তবলায় শাওনি তলওয়ালকর, পাখোয়াজে মহিমা উপাধ্যায়, বেহালায় নন্দিনী শঙ্কর, বাঁশিতে দেবপ্রিয়া চট্টোপাধ্যায় এবং কথকনৃত্যের প্রয়োজনে ভক্তি দেশপাণ্ডে। দেশে ও বিদেশে এই প্রজন্মের ব্যস্ততম বাঙালি কণ্ঠসংগীতশিল্পী কৌশিকীর সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান হওয়ার কোনও কারণ নেই।

যাকে ভালবাসি, আশঙ্কায় তার জন্যই মন উদ্বেল হয় সবচেয়ে বেশি। সাফল্যের যে খিদে তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মনে হয় এখন সেটা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়া প্রয়োজন। বাণিজ্যিক স্বার্থে হয়তো নিজেকে বিভিন্ন খাতে নিজেকে প্রবাহিত করার দরকার হয়, কিন্তু সেই প্রয়োজনটুকু বাদ দিয়ে বাকি ক্ষেত্রে এখন হয়তো তিনি একটু সংযমী হলেই ভাল।

হিন্দুস্তানি সংগীত তাঁর স্বক্ষেত্র এবং এই মুহূর্তে সেখানে একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞীর আসন কিন্তু শূন্য। কৌশিকী তাঁর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা দিয়ে সেই স্থান দখল করে নিতে পারেন অনায়াসেই, কিন্তু তাঁকে আরও বেশি লক্ষ্যকেন্দ্রিক হতে হবে। এতে অর্থের পরিমাণ হয়তো কিছু কমতে পারে, কিন্তু যশ ও প্রতিপত্তি প্রশ্নাতীত। কৌশিকী নিজেকে পাতিয়ালা ঘরানার প্রতিনিধি বলেন। শিল্পী হিসেবেও তাঁর উচিত এই সগর্ব ঘোষণাকে আরও অনেক দূর পৌঁছে দেওয়ার। মুনাওয়ার আলি খাঁ-র পর অজয় চক্রবর্তী ও কৌশিকী ছাড়া এই ঘরানারও উজ্জ্বল শিল্পী কেউ নেই। কৌশিকী সেই জায়গায় মর্যাদাসহ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি বাংলাকে আরও গর্বিত করবেন। নিজের উপস্থাপনা নিয়েও কিন্তু তাঁর এত ভূমিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই শ্রোতাদের কাছে। সঙ্গীতের বিশুদ্ধতা এক বিরল বস্তু। কৌশিকী জানেন সেই পরশপাথর কোথায় রয়েছে, কীভাবে তাকে ছুঁয়ে দেখতে হয়।

কৌশিকী আমাদের ঘরের মেয়ে, আদরের মেয়ে। বাঙালি ঘরের ‘রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী’র অভিধা সার্থক করেছেন তিনি, আশা করব ‘কথা কম কাজ বেশি’ এ আপ্তবাক্যটিও তিনি সফল করবেন অচিরেই। চোখ বন্ধ করে প্রস্তর-প্রতিমার মতো গান গাওয়া তাঁর পছন্দ নয়। কারণ কৌশিকী নিজে হয়তো মনে করেন, দর্শক-শ্রোতাদের সঙ্গে গল্প করা তাঁর একান্ত নিজস্বতা, কিন্তু দিনের শেষে গল্প নয়, তাঁর প্রিয় শ্রোতাদের কানেও ‘গান’ই থেকে যায়, একথাও তিনি সম্ভবত উপলব্ধি করেন। আসলে কৌশিকীকে নিয়ে বাঙালির প্রত্যাশা অন্তহীন। ঋদ্ধিমানের ইনিংস সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া বাংলার ‘মুখ’ কোথায়? কৌশিকী চক্রবর্তী কিন্তু আছেন, আর এ কথা নিয়ে লিখব বলেই তো এক বিস্তীর্ণ অতীতের সামনে এনে দাঁড় করালাম তাঁকে। অনেক ইতিহাস পেরিয়ে এসেছে বাঙালির সংগীত। সেই বাংলাকে আরও এক বর্ণময় ভবিষ্যতের সাক্ষী করার ক্ষমতা আছে কৌশিকী চক্রবর্তীর। তিনি আমাদের গর্ব তো বটেই। এই গর্বের দীর্ঘস্থায়িত্বই আমাদের কামনা।

Poila Baisakh Special Poila Baisakh Celebration Bengali New Year Celebration Kaushiki Chakraborty
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy