হাতিশাল এবং আস্তাবল হয়েছে সিনেমা হল।

নাচমহলে হয়েছিল টেনিস কোর্ট। এখন পরিত্যক্ত। তবে, সেই নাচমহলের দেওয়ালে এখনও রয়েছে নানা কারুকাজ। হাতে টানা পাখা।

এ সব নির্দশন যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্য আন্দুল রাজবাড়িকে ইতিমধ্যেই ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। রয়েছে সংস্কারের ভাবনাও। সেই রাজবাড়িকে ঘিরে জাদুঘরের প্রস্তাব দিয়েছেন ওই পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা। তাঁদের দাবি, সরকার সেই প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। এলাকার প্রবীণেরা বলেন, একটি রাজবাড়ি ও দু’টি জমিদার বাড়িই শহর আন্দুলের জন্মদাতা।

বিশাল সিংহদরজা, তিন মহলা প্রাসাদ নিয়ে রাজবাড়িটি এখন ভগ্নপ্রায়। কিন্তু এর নির্মাণশৈলী এবং বিশালত্ব এখনও মানুষের সম্ভ্রম আদায় করে। ইতিমধ্যেই রাজবাড়িকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যে সরকারের তরফ থেকে পরিদর্শনও হয়ে গিয়েছে। ওই পরিবারের বর্তমান সদস্য অরুণাভ মিত্র বলেন, “সরকার হেরিটেজ ঘোষণা করার পরে বাড়িটিতে জাদুঘর গড়ার প্রস্তাবও মেনে নিয়েছে। কিছু ভবন শুধু বাইরের দিকে সংস্কার হবে। কারণ, ভিতরে আমরা বসবাস করি। কিছু মহল আবার ভিতরেও সংস্কার হবে। নাচমহলটির সংস্কার করে সেখানে জাদুঘর হলে আমাদের পরিবারের পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র, বাসনকোসন, তরবারি রাখা হলে কোনও আপত্তি নেই।”

আন্দুল রাজ পরিবারের সৃষ্টি হয় রামলোচন রায়ের হাত ধরে। তিনি ছিলেন লর্ড ক্লাইভের দেওয়ান। পরে ওয়ারেন হেস্টিংসেরও দেওয়ান হন। ওই সময়েই তিনি প্রভূত ধনম্পত্তির অধিকারী হন। আন্দুল রাজ পরিবারের সঙ্গে একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় শোভাবাজার রাজপরিবারের নাম। দু’টি পরিবারের সৃষ্টির ইতিহাস সমসায়য়িক বলেই জানান আন্দুল রাজ পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা।

রাজবাড়িটি তৈরি হয় ১৮৩৪ সালে। তৈরি করেন রামলোচনের বংশধর রাজা রাজনারায়ণ রায়বাহাদুর। কী না ছিল সেই রাজবাড়িতে! বর্তমান সদস্যেরা জানান, কত যে বেলোয়াড়ি ঝাড়বাতি সব মহলে ছিল, তার ইয়ত্তা নেই। ছিল হাতে টানা পাখা। তার জন্য পাঙ্খাপুলার। রাজবাড়ি সংলগ্ন অন্নপূর্ণা মন্দিরে এখনও রাখা আছে সেই আমলের কামান। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত রাজপরিবারের দুর্গাপুজোয় তোপ দাগা হত।

অন্নপূর্ণার মন্দির।

সেই রাজা আজ আর নেই। নেই রাজত্বও। রাজবাড়ির বর্তমান সদস্যেরা কেউ ব্যবসা করেন, কেউ চাকরি। কেউ বা প্রোমোটার। তবে, সকলেই চান, ঐতিহ্য রক্ষা করতে। এখনও শীতের মরসুমে ছুটির দিনগুলিতে জীর্ণ রাজবাড়ি দেখতেও পর্যটকদের ভিড় হয়। শুধু রাজবাড়ির সদস্যেরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও মনে করেন, রাজবাড়িটি সংস্কার হলে এলাকায় পর্যটনের প্রসার হবে।

আধুনিক আন্দুল শহরে মিশে রয়েছে আরও ঐতিহ্য। জমিদার দত্তচৌধুরী বাড়ির মূল ভবনটিও ভগ্নপ্রায়। সেখানে নতুন বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছেন পরিবারের বর্তমান সদস্যেরা। এই বাড়িরই ছেলে ছিলেন অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী। দত্তচৌধুরী পরিবারের সাড়ে চারশো বছরের দুর্গাপুজো এখনও আন্দুলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

আরও এক জমিদারবাড়ি মল্লিকবাড়ি। তাঁদের তৈরি গোলাপবাগান ছিল বিখ্যাত। একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এই বাগান। হাওড়ার জেলাশাসক থাকাকালীন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই বাগানে এসেই লেখালেখি করতেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যেরা।

আন্দুলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীচৈতন্যের নামও। অনেকেই বলেন, আন্দুল হয়েই তিনি পুরী পাড়ি দিয়েছিলেন। শিষ্যদের নিয়ে যাওয়ার সময় প্রচুর ধুলো উড়েছিল। সেই ধুলোই স্থানীয় মানুষের কাছে ছিল ‘আনন্দধুলি’। তা থেকেই হয়েছিল আন্দুলের নামকরণ। এখানেই রয়েছে সাধক প্রেমিক মহারাজের আশ্রমও। ওই বংশের বর্তমান সদস্য কাশীনাথ ভট্টাচার্য এবং সৌমেন ভট্টাচার্য জানান, প্রেমিক মহারাজের কাছেই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন স্বামী বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত। সন্ন্যাসী হওয়ার পরে স্বামী বিবেকানন্দও বার তিনেক এই আশ্রমে এসেছিলেন। তাঁদের স্মৃতিতে আশ্রমটিকে ঘিরেও পর্যটনকেন্দ্র গড়া যায় বলে মনে করছেন তাঁরা।

দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও এ শহরের অবদান রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রফুল্ল মুখোপাধ্যায় ১৯২০ সালে হাওড়া আদালতে ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে দিয়েছিলেন। এর জন্য এলাকার মানুষ এখনও গর্ব করেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর শিষ্য কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়িও ছিল এই শহরে। তিনি একটি সভার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। খবর চলে যায় ব্রিটিশ পুলিশের কাছে। পরিবারের মহিলারা শাড়ি পরিয়ে তাঁকে পুলিশের নাগালের বাইরে নিয়ে যান বলে দাবি কমলাকান্তের পরিবারের বর্তমান সদস্য অশোক ভট্টাচার্যের।

শহরের প্রবীণা দেবিকা মিত্রের আক্ষেপ, “এত ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে আন্দুল এখনও কেন ব্রাত্য বুঝতে পারি না!” কবিতা চৌধুরী নামে আর এক বাসিন্দাও বলেন, “তন্ত্রসাধক তথা পণ্ডিত ভৈরবীচরণ বিদ্যাসাগরের প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো মন্দির এবং সেখানে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কলকাতার কাছের এই শহরে এত বৈচিত্র্য রয়েছে। সরকার উদ্যোগী হলেই পর্যটনের প্রসার ঘটবে।”

একই মত আরও অনেকের।

 

“সরকার হেরিটেজ ঘোষণা করার পরে বাড়িটিতে জাদুঘর গড়ার প্রস্তাবও মেনে
নিয়েছে। নাচমহলটির সংস্কার করে সেখানে জাদুঘর হলে আমাদের পরিবারের
পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্র, বাসনকোসন, তরবারি রাখা হলে কোনও আপত্তি নেই।”

অরুণাভ মিত্র, রাজ পরিবারের সদস্য

 

ছবি: সুব্রত জানা।