পাঁচলার গাববেড়িয়ার জরির ওস্তাগর বছর পঞ্চাশের শেখ বাহারুদ্দিন ঠিক করেছেন, নিজের কারখানার সব কারিগরকে পুজোর পরেই বসিয়ে দেবেন। কারণ, কাজ নেই। সে কথা তিনি জানিয়েও দিয়েছেন কারিগরদের। 

বাহারুদ্দিন বলেন, ‘‘কারিগরদের বলেছি, পুজোর পরে বিকল্প কাজ খুঁজে নিতে। টুকটাক যা বরাত আসবে তা নিজে পারলে করব। না হলে আমিও কারখানা বন্ধ করে বিকল্প কাজ খুঁজব।’’

জরি শিল্পের মরসুম শুরু হয় অগস্ট মাস থেকে। তা চলে পরের বছর মার্চ মাস পর্যন্ত। জরি শিল্পীদের কাছে এই সময়টাই ‘উৎসবের মরসুম’। এই সময় কাজ তুঙ্গে ওঠে। কারিগররা সূচ, সুতো, সলমা-দফকা নিয়ে বসে পড়েন কারখানায়। গমগম করতে থাকে কারখানা। কিন্তু এ বার সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পার। কাজের জোয়ার নেই। বাহারুদ্দিনের বক্তব্য, ‘‘দুর্গাপুজো, কালীপুজো সবই তো এসে গেল। এই ব্যবসায় জড়িত আছি প্রায় ৩০ বছর। অথচ, এই তিন-চার মাস ধরে আমাদের কারবারে যে রকম মন্দা চলছে তা আগে দেখিন‌ি।’’

হাওড়ার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নেয় পাঁচলার জরিশিল্প। প্রায় ৩০ হাজার পরিবার একসময়ে সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন সাকুল্যে ১০ হাজার পরিবার যুক্ত। অথচ, এখানকার জরিশিল্পীদের কাজের গুণমানের জন্যই দেশজুড়ে পাঁচলার নাম। উলুবেড়িয়া, বাউড়িয়া ও সাঁকরাইল জুড়ে যে সব চটকল রয়েছে, সেগুলি যখন বন্ধ হয়ে যেত, তখন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করত এই জরিশিল্প। পাঁচলার দেখাদেখিই উলুবেড়িয়া, বাউড়িয়া, সাঁকরাইলেও জরির কাজ ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচলার মতো না-হলেও হুগলির আরামবাগেও জরির কাজ হয়। কিন্তু এখানেও ওই শিল্পে ভাটার টান। প্রশাসনেরই একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, জরির কাজের সঙ্গে ২০১৬- ১৭ সাল পর্যন্ত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে এক লক্ষেরও বেশি পরিবার যুক্ত ছিলেন। এখন সেই সংখ্যা ৪০ হাজারের নীচে নেমে গিয়েছে।

কিন্তু কেন এই অবস্থা?

দেশজুড়ে যে মন্দা চলছে, এটা তারই ফল বলে জানালেন ‘সারা ভারত জরি শিল্পী কল্যাণ সমিতি’র সম্পাদক মুজিবর রহমান মল্লিক। তিনি বলেন, ‘‘জরি হাব করার কথা হলেও তা বাস্তবায়িত হল না। ওস্তাগর (দক্ষ কারিগর ও কারখানা-মালিক) ও কারিগররা ব্যাঙ্ক ঋণ পান না। চলে এল নোটবন্দি ও জিএসটি। এ সবের জন্য এমনিতেই জরিশিল্প ধুঁকছিল। কিন্তু দেশজুড়ে যে সাম্প্রতিক মন্দা চলছে তা ওস্তাগর ও কারিগরদের একেবারে শেষ করে দিল।’’

মূলত কলকাতার মহাজনদের কাছ থেকে শাড়ি, সালোয়ার, লেহঙ্গা প্রভৃতির বরাত নিয়ে আসেন ওস্তাগররা। মহাজনরাই কাপড় দিয়ে দেন। উপকরণ কিনে তাতে জরির নকশা করে সেই কাজ মহাজনের কাছে দিয়ে আসেন ওস্তাগররা। মহাজনের মাধ্যমে সেই কাজ ছড়িয়ে পড়ে নানা জায়গায়। কিন্তু নোটবন্দির পর থেকেই বাজারে নগদের জোগানে টান ধরায় মহাজনদের থেকে বরাত আসা কমতে থাকে বলে কারিগররা জানিয়েছেন। অনেক ওস্তাগর কাজ বন্ধ করে দেন। গাববেড়িয়ারই আর এক ওস্তাগর ফজলুল হক বলেন, ‘‘নোটবন্দি, জিএসটি-র পরে বাজার পড়ছিল ঠিকই। কিন্তু তার মধ্যেও মরসুমের শুরু থেকে কাজে একটা গতি আসত। গত বছর পর্যন্ত তা আমরা দেখেছি। কিন্তু এ বছর একেবারে ভিন্ন ছবি। ভবিষ্যৎ ভেবে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে।’’ অন্যদিকে বাহারুদ্দিন বললেন, ‘‘নিয়ম করে মহাজনদের কাছে যাচ্ছি। তাঁরা জানিয়ে দিচ্ছেন মুম্বই, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু থেকে ক্রেতারা সে ভাবে আসছেন না।’’

খানাকুলের জরি কারবারি বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের খেদ, ‘‘মাস ছয়েক ধরে সমস্যা বেড়েছে। কাঁচামালের দাম যথেচ্ছ বেড়েছে। তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হয়নি। মহাজনরা। আগে একটা শাড়ির জন্য ১৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতেন। এখন একই নকশার কাজে মজুরি মিলছে ৭০-৮০ টাকা।’’

জরিশিল্পে কাজ হারিয়ে এখন পাঁচলার কারিগররা ছুটছেন ধুলাগড়ি, আলমপুরে গড়ে ওঠা কারখানায়। ১৮০ টাকা দৈনিক পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ১২ ঘণ্টা করে কাজ করছেন। অনেকে টোটো চালাচ্ছেন। আরামবাগের অনেক জরিশিল্পী দিনমজুরি শুরু করেছেন। মহিলারা গৃহ-সহায়িকার কাজ করে বেশি উপার্জন করছেন। সংসার চালাতে হবে তো!