পরিবর্তনটা চোখে পড়ছে গত বছর থেকেই।

নবদ্বীপের রাসে বিদ্যুত্‌ ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে গত বছর থেকেই সক্রিয় ছিল প্রশাসন। তার সুফলটা এ বারেও পেল নবদ্বীপ। মাত্র কয়েক ঘণ্টা ছাড়া দিনের বেশিরভাগ সময়েই ‘আড়ং’- এর দিন বিদ্যুত্‌ থাকল শহরে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত তেমন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি বলে দাবি প্রশাসনের।

ফি বছর রাসের ‘আড়ং’-এর দিন সন্ধ্যার পরে অন্ধকারে ডুবে যেত গোটা শহর। এ দিনও সকাল দশটা থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুত্‌ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আঁতকে উঠেছিল নবদ্বীপ। কোনও ঝঁুকি না নিয়ে তড়িঘড়ি স্নান সারা, পাম্পে জল তুলে রাখা, মোমবাতি, হ্যারিকেন, দেশলাই জোগাড়ের পাশাপাশি চলছিল মোবাইল এবং ইমারজেন্সি চার্জ দিয়ে রাখার কাজ। তবে বিকেল পাঁচটা নাগাদ বিদু্যুত্‌ পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আশঙ্কাটা মিথ্যে হল!

অনান্যবার সকাল দশটা থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুত্‌ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। সেই পরিষেবা স্বাভাবিক হতে হতে কেটে যেত চল্লিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা। চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হত সারা শহরকে। তবে তাতে উদ্যোক্তাদের কোনও হেলদোল ছিল না। ‘উচ্চতার ঐতিহ্যের’ সঙ্গে তাঁরা কোনওরকম আপোস করতেন না। নবদ্বীপের মানুষও নিরুপায় হয়ে মেনে নিয়েছিলেন এই ব্যবস্থা!

২০১২ সালে পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা মন্ত্রী হওয়ার পরে বিধায়ক তহবিল থেকে বেশ কয়েক লক্ষ টাকা স্থানীয় বিদ্যুত্‌ দফতরকে দিয়ে শোভাযাত্রা পথের বিদ্যুত্‌বাহী হাই টেনশন লাইন উঁচু করা হয়। তারপর ২০১৩ সালেও বিদ্যুত্‌ নিয়ে বেশ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। এ বছর তার থেকেও ভাল পরিষেবা পাওয়া গিয়েছে বলেই জানাচ্ছেন শহরবাসী। পুণ্ডরীকাক্ষবাবু বলেন, “নবদ্বীপ শহরে মাটির তলা দিয়েই বিদ্যুত্‌ সরবরাহ হবে। তার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে আগামী দিনে শুধু রাস নয়, কোনও রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এ শহরের বিদ্যুত্‌ পরিষেবা বিঘ্নিত হবে না। তবে একশো শতাংশ ফল পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।”

নবদ্বীপ বিদ্যুত্‌ বণ্টন পর্ষদের সহকারি বাস্তুকার সৌম্যদীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, “গত বারের মতো এবারেও যাতে গোটা নবদ্বীপে বিদ্যুত্‌ থাকে, শোভাযাত্রার দিন লাইন উঁচু করার পাশাপাশি আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বড় প্রতিমাগুলির সঙ্গে দফতরের কর্মীরা ছিলেন। বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রতিমা মূল শোভাযাত্রার পথে আসার সময় কেবল সেই এলাকার সংযোগ বিছিন্ন করা হয়েছিল। প্রতিমা চলে যাওয়ার পরে আবার সংযোগ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

অন্য দিকে রাস উত্‌সব যাতে নির্বিঘ্নে হয় সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনও এ বার বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ করেছে। সারা বিশ্বের মানুষ আসেন চৈতন্যভূমির এই আশ্চর্য উত্‌সবের শরিক হতে। কিন্তু রাস উত্‌সবে বেশ কিছু ক্ষেত্রেই মদ্যপদের দাপটে অতিষ্ঠ হয়েছে এই শহর ও রাস দেখতে আসা বহু মানুষ। শোভাযাত্রায় প্রকাশ্যে মদ্যপান নবদ্বীপে একটা রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। সংস্কৃত চর্চার পীঠস্থান, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নবদ্বীপের সেই দুর্নাম ঘোচাতে প্রথম থেকেই বদ্ধপরিকর ছিলেন প্রশাসনের কর্তারা।

প্রশাসনের এই তত্‌পরতায় খুশি নবদ্বীপের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা তথা নবদ্বীপ আদালতের আইনজীবী মানস বণিক বলেন, “যদি কয়েক বছর টানা এই ব্যবস্থা চলে তাহলে নবদ্বীপের রাস সংযত হবে।” নবদ্বীপ আদালতের বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অতুলকুমার রায় বলেন, “এই কড়া পদক্ষেপে কিছু মানুষ হয়তো অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবে শহরের সিংহভাগ মানুষই প্রশাসনের এই পদক্ষেপে  খুব খুশি হয়েছেন।”

সুদীপ ভট্টাচার্যের তোলা রাসের আরও ছবি