সোনালি তারের জাদুকর

সাল১৯৮৮। ডোকরার মনসার ঘটে চাঁদ সওদাগরের কাহিনি এঁকে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তারই জেরে বাংলার মফস্সলের ওই অখ্যাত যুবকের ভাঙা ঘরে এসেছিল রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। সেই শুরু। তার পর থেকেই যুদ্ধ কর্মকারের নামের সঙ্গেই বাঁকুড়ার ডোকরা শিল্পের খ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল। বিকনায় ডোকরা শিল্পীদের গ্রাম ‘শিল্পডাঙা’ তাঁরই হাতে গড়া। যুদ্ধবাবুর টানেই সেখানে ছুটে আসতেন দেশবিদেশের বহু গুণিজন। কিন্তু, মাঝখানে নব্বইয়ের দশকে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং মার্কেটিংয়ের অভাবে ডোকরা শিল্প পড়ল লোকসানের মুখে। অনেকেই ডোকরার মূর্তি গড়া ছেড়ে খেত মজুরি, দিন মজুরির কাজ শুরু করলেন। এমনকী, পেটের তাগিদে কাউকে কাউকে রিকশাও টানতে হল। ব্যতিক্রমী ছিলেন কেবল যুদ্ধই। লড়াইয়ের ময়দান ছাড়েননি কখনও। ‘শিল্প ছেড়ে অন্য কিছু করব না’ বলে জেদ ধরে বসেছিলেন তিনি।

ডুবে থাকতেন সোনালি তারের রহস্য উন্মোচনেই। ইতিমধ্যেই বছর খানেক হল কাঁচামালের দাম কমেছে। বাজারে চাহিদাও তুলনামূলক ভাবে বেড়েছে। ফের আলোর দিশা পেয়েছে এই শিল্প। কিন্তু, যুদ্ধবাবুই আর নেই! গত জুনেই তাঁর প্রয়াণ ঘটেছে। বার্ধক্যজনিত কারণে বছর তিনেক ধরে কাজ করতে পারছিলেন না। মনমরা হয়ে থাকতেন। ভরণপোষণের সম্বল ছিল ভাতার সামান্য ক’টা টাকা। প্রায় সবার অলক্ষেই এই সোনালি তারের জাদুকরকে হারায় দেশ। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার এবং ইউনেস্কোর উদ্যোগে যুদ্ধর প্রিয় শিল্পডাঙাতেই সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল তিন দিনের ডোকরা মেলা। আর সেই মেলাতে সাংস্কৃতিক মঞ্চকে তাঁর নামে উৎসর্গ করে যুদ্ধবাবুর স্মরণ করলেন উদ্যোক্তারা। গ্রামের আটচালায় দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী সাবিত্রীদেবীর আক্ষেপ, “জীবদ্দশায় এই দিন দেখে যেতে পারলেন না। খুশিতে কত কী যে গড়তেন!’’   

 

 

আত্মদ্রোহ

বৃহন্নলা, কিন্নর, হিজড়ে থেকে তৃতীয় লিঙ্গ— নানা নামেই পরিচিত এঁরা। সমাজের অংশ হয়েও কিন্তু এঁরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কেউ ভয়ে, কেউ বা ঘৃণায় এঁদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। এঁদের জীবনের সাতকাহন নিয়েই মেদিনীপুর থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আত্মদ্রোহ’ সাময়িকীর শারদ সংখ্যা। আক্ষরিক অর্থেই যাঁরা সমাজের মূল স্রোতে ব্রাত্য, সেই বৃহন্নলাদের জীবন থেকে শুরু করে তাঁদের কথ্য ভাষা, দেবতা বা তাঁদের সমাজকে মরমি চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন পত্রিকার সম্পাদক শিবশঙ্কর মাল। চাঁদ, তারা, মেঘ আর কাশফুলের ছকে বাঁধা শারদ সংখ্যার গণ্ডীর বাইরে বেরনোর এক এক সফল প্রয়াস। অচিন্ত্য মারিক, ঋত্বিক ত্রিপাঠি, পবিত্র বিশ্বাস, পার্থপ্রতিম সরকার-দের প্রবন্ধে রয়েছে বৃহন্নলাদের জীবনের নানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা।

আর তৈমুর খান, অমরেশ বিশ্বাস, শাঁওলি দে বা সৌতিক হাতীর কবিতায় রয়েছে বৃহন্নলাদের সুখ-দুঃখে সমব্যথী ভাবনা। সম্পাদক শ্রী মালের লেখায় ঠাঁই পেয়েছে সমাজের এই বিশেষ অংশের কথ্য ভাষা ও ধর্মাচরণ পদ্ধতি। প্রবন্ধগুলি অনেক কৌতূহল মেটাবে। তিন বৃহন্নলার সাক্ষাৎকারও ঠাঁই পেয়েছে এই সংখ্যায়। তাঁরা সমাজকে কী চোখে দেখেন, সমাজের কাছে তাঁদের চাহিদাই বা কী, তা জানা যাবে সাক্ষাৎকারগুলিতে। সম্পাদকের মতে, সাধারণ মানুষদের মধ্যে এঁদের নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। তা ভাঙতে আর এঁদের সমাজের মূল স্রোতে সামিল করতেই এই প্রয়াস।

 

 

থিয়েটারওয়ালা

রামকৃষ্ণদেব বলতেন থিয়েটারে লোকশিক্ষে হয়। এই কথাটিই যেন বীজমন্ত্র বীরভূমের নাট্য দলগুলির। পুরনো দল থেকে নব্যদলের প্রযোজনাগুলির নাট্যকাহিনি আবর্ত হয়ে চলেছে কথাটি মাথায় রেখেই। সম্প্রতি সাঁইথিয়া অন্যতম নাট্যগোষ্ঠী অ্যাম্পিথিয়েটারওয়ালা তাদের প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান করল সাঁইথিয়া পুরসভার রবীন্দ্রভবনে। বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মালা দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। ছিলেন জেলার নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা। অ্যাম্পিথিয়েটারওয়ালা তাদের দুটি নাটক মঞ্চস্থ করে বর্ষপূর্তিতে। প্রথমটি সৌমিত্র বসুর লেখা অনিন্দ্য আচার্য পরিচালিত ছোটদের জন্য ‘মুড়কির হাঁড়ি’ ও দ্বিতীয়টি মোহিত চট্টোপাধ্যায় লেখা অতনু বর্মন পরিচালিত ‘উড়ো মেঘ’। অতনুর পরিচালনায় এ নাটক বরাবরই বলিষ্ঠ প্রযোজনা। অনুষ্ঠানের শেষ দিনও সাঁইথিয়া পুরসভার রবীন্দ্রভবনে দুটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রথমটি অ্যাম্পিথিয়েটারওয়ালার শিবশংকর চক্রবর্তীর লেখা অনিন্দ্য আচার্য পরিচালিত ‘আমি হারাধন মাখাল’। দ্বিতীয়টি বিজন ভট্টাচার্যর লেখা অভি চক্রবর্তী পরিচালিত ওয়েকআপ নাট্য দলের ‘মরা চাঁদ’। দর্শক মনে রাখবে ওয়েকআপের প্রযোজনা।

 

 

ইদ-যাপন

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কি শুধু পুজোতেই হবে? সংখ্যাগরিষ্ঠের ধারণা পাল্টে দিয়েছে বীরভূমের মাড়গ্রাম। ইদ উপলক্ষে টানা সাত বছর ধরে সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজন করছে গ্রামেরই যুবদের সংগঠন ‘উনিশ-কুড়ি’। শনিবার স্থানীয় মাড়গ্রাম হাইস্কুলের স্থায়ী মঞ্চে গ্রামেরই ছেলেমেয়েদের ‘চিত্রাঙ্গদা’র অভিনয় ছিল স্মরণে রাখার মতো। এবার অনুষ্ঠানের সপ্তম বছরে পা দিল। রবিঠাকুরের চিত্রাঙ্গদা, রবীন্দ্র নৃত্য-সহ বিভিন্ন ধরনের নৃত্যের সঙ্গে এলাকার শিল্পীরা, যন্ত্রসংগীতও পরিবেশন করেন ওই অনুষ্ঠানে। নির্মল পরিবেশ গড়ার লক্ষে একটি তথ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়। কীভাবে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়, তা নির্ভর করে চিত্রনাট্য লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন চাঁদপাড়া প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক মহম্মদ মুকারাম। সহযোগিতা করেছেন মাড়গ্রামের ড. কুদরত-ই-খুদা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা। অভিনয়ে স্কুলের শিশুরাই।

 

 

কবিতালাপ

শব্দে-যতিতে তিনি সহজিয়া জীবনের জলছবি আঁকেন। সুখ-দুঃখের ভুবনে অন্তহীন বয়ে চলা সময়ের দৃশ্য-কোলাজ তাঁর লেখায় ঘুরে ফিরে আসে। বহমান সময় থেকেই শব্দ তুলে তিনি লেখেন, ‘আমি কান্নার ফোঁটা, আর সুখের টুকরো/ সন্তপর্ণে কুড়িয়ে নিয়ে/ ওদের বিবাহ দিলাম...’। তিনি কবি, গদ্যকার রজতশুভ্র মজুমদার। তাঁর বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের কাছে কবিতা মানেই কেবল আর নিবিড় পাঠ নয়। নগর পথে অথবা কাজের ফাঁকে হেডফোনে নিভৃত কাব্য-শ্রুতিও! কাব্য গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাই নিরীক্ষা করে চলেছেন কবিতার-শ্রুতি নিয়েও।

রজতের জন্ম ’৭৬- এর জানুয়ারিতে বর্ধমানে। সেখান থেকে শান্তিনিকেতন। দেশ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় শূন্য দশকের গোড়ার দিকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হলুদ কাগজে তৈরি’। একে একে প্রকাশিত হয় ‘হলুদ বেনারসির গন্ধ’, ‘অনিশেঃষ ফুলজন্ম’, ‘কবরী বাঁধি আর খুলি’, ‘রাধা যাবেই যমুনায়’, ‘জলের আলপনা’ শীর্ষক সাতটি কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ, ‘নতুন গল্প ২৫’ ইতিমধ্যেই বেস্টসেলার-এর শিরোপা অর্জন করেছে। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বিশ্বভারতী ও তার ভবিষৎ’, ‘আলেয়া বেগমের গান’-সহ আরও ছ’টি সম্পাদিত গ্রন্থ এবং দুটি গদ্য সংগ্রহও। তাঁর প্রথম কবিতার সিডি ‘জলের আলপনা’ প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। কবিতা পড়েন পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো বাচিকশিল্পীরা। পরের সিডি ‘তবু মনে রেখো’। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পাঠের সঙ্গে এই সিডিতে রবীন্দ্রনাথের গানে ছিলেন ইন্দ্রাণী সেন। রজতের প্রেমের কবিতা নিয়ে পরে আরও সিডি প্রকাশিত হয়। তাতে রবীন্দ্রনাথের গানে ছিলেন  শ্রাবণী সেন। রজতের কবিতা পড়েন রূপঙ্কর। তাঁর কবিতা নিয়ে রয়েছে আরও দুটি সিডি। একটিতে কবিতাপাঠ করেছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অন্যটিতে দেবশঙ্কর হালদার।

 

 

দুই কিংবদন্তি

ডাইনি, ভূত-প্রেত, কুসংস্কারে মজে থাকা সাঁওতাল সমাজে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন এক জন। দ্বিতীয় জন দিয়েছিলেন সেই সমাজের আদিম ভাষাকে অক্ষর। সেই সাঁওতালি মহাকবি সাধুরামচাঁদ মুর্মু এবং অলচিকি লিপির স্রষ্টা পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মুকে স্মরণ করল পশ্চিমবঙ্গ সাঁওতালি অ্যাকাডেমি। গত শনি ও রবিবার বোলপুরের গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে ওই উপলক্ষেই হল নানা অনুষ্ঠান। ১৮৯৭ সালে অধুনা মেদিনীপুর জেলার শিলদা থানার কামারবান্দি গ্রামে জন্মেছিলেন রামচাঁদ মুর্মু। স্থানীয় ভীমপুর মিশন স্কুলে প্রাথমিক পাঠ চুকিয়ে চাষবাস কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের কারণে লেখালেখি শুরু করেন। আজীবন সাধু-সন্তদের সান্নিধ্যে থাকা রামচাঁদ পান ‘সাধু’ উপাধিও। তাঁর বিশেষ সৃষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সরি ধরম সেরেং পুথি’, ‘লিতা গোড়েত’ কাব্যগ্রন্থ, ‘অলদহ অনড় হে’ কবিতা, ‘মজ দাঁদের হাঁক’, ‘সংসার ফেঁদ’ নাটক, ‘ইস রড়’ প্রবন্ধ।

অন্য দিকে, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের রাইরঙ্গপুর এলাকার দাণ্ডবোস (ডাহারডি) গ্রামে ১৯০৫ সালে জন্মেছিলেন ভাষাবিদ রঘুনাথ মুর্মু। বারিপদা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক উত্তীর্ণের পরে নিজের কথিত ভাষার লিপি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ১৯২৫ সালে অলচিকি লিপি নিয়ে প্রথম পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। ১৯৩৮ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে কাঠের লিপি দিয়ে প্রদর্শনী করে তৎকালীন রাজা প্রতাপচন্দ্র ভঞ্জের সুনজরে আসেন রঘুরাম। তিনি বরাবরই ওই লিপির প্রচার ও প্রসারে নানা উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে নাটকের মাধ্যমে ‘বিবু চন্দন’ দিয়ে এলাকায় এলাকায় সাঁওতালি ভাষার ওই অলচিকি লিপির প্রচার শুরু করেন। সাঁওতাল সমাজের দুই কিংবদন্তিকেই ভুলতে বসেছে বলে আক্ষেপ করলেন অনুষ্ঠানের বক্তারা।

 

 

এই সপ্তাহে

অনুষ্ঠান, যা হয়ে গেল:

খাজুট্টি বিদ্যাসাগর শিক্ষানিকেতন, বাগনান: ২৮ সেপ্টেম্বর। বিদ্যাসাগর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে বসে আঁকো, হাতের লেখা, আবৃত্তি ও ক্যুইজ প্রতিযোগিতা। সঞ্চালনা করলেন অরুণাংশু ঘোষ।

 

জাতীয় ক্রীড়া ও শক্তি সঙ্ঘের সভাগৃহ, স্কুলডাঙা, বাঁকুড়া: ২৫ সেপ্টেম্বর, সকাল সাড়ে ৯টা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আকাশবাণীর সম্প্রচার ছাত্র ও যুবদের কী ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সেই নিয়ে আলোচনা । আয়োজক: বেতার সাহিত্য মঞ্চ।

 

বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয়: ২৬ সেপ্টেম্বর, বিকেল ৩টে। গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন মানুষদের উপস্থিতিতে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিক কনভেনশন। আয়োজক: সেভ ডেমোক্রেসি ফোরাম।

 

ভ্রম সংশোধন:

হরিহরপাড়া বইমেলা: ৩১ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর। আয়োজক: হরিহরপাড়া জনকল্যাণ সমিতি।

 

নিজের এলাকার সংস্কৃতির খবর দিন আমাদের।
ই-মেল করুন district@abp.in-এ। সাবজেক্টে লিখবেন ‘দক্ষিণের কড়চা’।