জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটনার সূত্রপাত থেকে মাত্র দু-চার দিনে যে অশুভ শক্তিগুলি প্রবল হয়ে উঠেছে, অবিলম্বে তা বিনাশ করতে না পারলে আমাদের নাগরিক জীবন বিপন্ন হবে। এক দিকে আমরা দেখছি আইন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম স্থূল ও অমানবিক প্রয়োগ, দেশের শ্রেষ্ঠ আইনবিদদের মতে যা অপপ্রয়োগ; তার পাশাপাশি
নাগরিক নিরাপত্তার জন্য সাধারণ আইন বলবৎ করতে আইনরক্ষকদের চরম অনীহা। আর তারও পাশাপাশি যা সবচেয়ে ভীতিকর— যে দল এবং গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় বল ও
আইনের অস্ত্র আছে, সেটা যথেষ্ট না মনে করে তাঁদেরই সদস্যদের কথায় ও আচরণে
আইনের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা, হিংসা ও বিশৃঙ্খলার সদর্প আস্ফালন।
এই লক্ষণগুলির কোনওটিই নতুন নয়। দেশে এমন কোনও ক্ষমতাবান গোষ্ঠী নেই যাঁরা এই অপরাধে দুষ্ট নন। তার জন্য প্রতিবাদের তাগিদ কমে না, বরং উত্তরোত্তর বেড়ে চলে। এ-ও বলা চলে, এ সবগুলি লক্ষণ একসঙ্গে এত প্রকট ভাবে, এত উচ্চগ্রামে, খোদ রাজধানীর উচ্চ আদালতের এতটা বেপরোয়া অবমাননা করে, বড় দেখা যায়নি। নীতি ও আদর্শের কথা থাক, নিছক নাগরিক অস্তিত্বরক্ষার স্বার্থে এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের প্রয়োজন। শিক্ষক সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে, বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে এই প্রতিবাদের শামিল করা প্রয়োজন, নইলে আজ না হোক কাল প্রত্যেক নাগরিকের সুস্থ নিরাপদ জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সেই সঙ্গে শিক্ষক হিসাবে আমাদের উপর একটা বিশেষ দায় বর্তায়, যাতে পক্ষনির্বিশেষে যে-কোনও অনাচারের হোতাদের ফাঁদে পা দিয়ে আমরা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা না হারাই। দেখা যাচ্ছে, বাক্স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার পক্ষে সওয়াল করতে নেমে আমরা প্রায় সকলে গোড়াতেই বলে নিচ্ছি যে এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যে বিশেষ চরমপন্থী মতগুলি উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলির আমরা নিন্দা করি। অর্থাৎ আমাদের মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রচেষ্টায় কিন্তু সবচেয়ে বেশি করে প্রচার পাচ্ছে এমন কিছু মতবাদ যা আমরা অধিকাংশেই অনুচিত বা অন্যায় মনে করি, আইনগ্রাহ্য অপরাধ হোক চাই না হোক। এতে এই মতবাদগুলি এক ধরনের স্বীকৃতি পাচ্ছে, যার ফলে বাক্স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার বৃহত্তর আন্দোলনের ক্ষতি হতে বাধ্য, কেবল সরকারি দমনপীড়নের বিপদ ডেকে এনে নয়, সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়ে এবং নিজেদেরও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলে।
মানতেই হয়, যে মত আমরা নিজে পোষণ করি না, এমনকী অন্যায় মনে করি, সেটা বলতে দেওয়াই বাক্স্বাধীনতার চূড়ান্ত স্বীকৃতি। যাঁরা এই সব মত পোষণ করেন, তাঁরা নিজেদের মঞ্চ থেকে যত খুশি বলুন। তাঁদের প্রতি অন্যায় উৎপীড়ন হলে অন্যান্য সৎ নাগরিকের মতো আমরাও আমাদের স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে তার নিন্দা-প্রতিবাদ করব। কিন্তু বাক্স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার সাধারণ আন্দোলনের একটা প্রধান স্তম্ভ হিসাবে তাঁদের দেখলে বা দেখালে বৃহত্তর নাগরিক স্বার্থ, বা আজকের বিশেষ প্রসঙ্গে শিক্ষাজগতের স্বার্থ, বিঘ্নিত হবে।
এক বছর আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয় এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল, তখন সেখানকার ছাত্র-শিক্ষকদের পাশাপাশি সব প্রতিষ্ঠান থেকে আপনারা সকলে এবং বৃহত্তর সমাজের একটা বড় অংশ শামিল হয়েছিলেন। আবার দেখছি, আজকের নতুন বিতর্কে দেশের এই প্রান্তে যাদবপুরই আবার শিরোনামে উঠে আসছে। তাই সাধারণ পরিস্থিতির একটা বিশেষ দৃষ্টান্তস্বরূপ যাদবপুরকে নিলে আপনারা আপত্তি করবেন না আশা করি। দুর্দিনের পর আবার যাদবপুর প্রাঙ্গণে উদ্যম ও সুস্থ পরিচালনার একটা পরিবেশ ফিরে এসেছে। এখন যদি কোনও আগ্রাসী শক্তি—তা সে ক্ষমতাসীন দলের ঝটিকাবাহিনী হোক, বা বিপরীত মেরুর কোনও উৎকেন্দ্রিক গোষ্ঠী হোক— সেই পরিবেশের বিঘ্ন ঘটিয়ে আমাদের সাধারণ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করে, ছাত্র-শিক্ষক সমাজের কর্তব্য তার প্রতিরোধ করা। বলা বাহুল্য, সেই প্রতিরোধের ধরন হবে নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল করে নয়, বরং দৃঢ় ভাবে সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ, কাজের পরিবেশ বজায় রেখে।
শুধু যাদবপুর কেন, প্রত্যেক শিক্ষাপ্রাঙ্গণে ছাত্র-শিক্ষক সমাজ কি বলতে পারেন না, এমন পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর, ভিতর বা বাইরের কোনও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে— তাদের দাবি বা আদর্শ যাই হোক, নীতিগত ভাবে আমরা যতই তা সমর্থন করি— সে পরিবেশ আমরা অশান্ত করতে দেব না? যদি আমরা এমন অবস্থান না নিই, মুষ্টিমেয় মানুষের কার্যক্রমের দায়ভাগ আমাদের সকলের উপর বর্তাবে, যে সমাজের কাছে আমরা দায়বদ্ধ তার আস্থা আমরা হারাব। শিক্ষাপ্রাঙ্গণে যত বার অশান্তি হয়, সেই সামাজিক আস্থা আমরা যে কিছু মাত্রায় হারাই, তা অস্বীকার করলে
চলবে না।
দুই বিপরীত মেরুর অনাচার ও প্ররোচনার মধ্যে ছাত্র, শিক্ষক এবং বৃহত্তর সমাজের স্বার্থ যেন আমরা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে না হারিয়ে ফেলি। চতুর্দিকে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছে বলেই আমাদের তরফে শুভবুদ্ধি বজায় না রাখলেই নয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমেরিটাস অধ্যাপক
(অসুস্থতাবশত গতকাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক সংগঠনের সমাবেশে থাকতে পারেননি লেখক। সেই সভায় পাঠ করার জন্য প্রেরিত তাঁর বক্তব্য।)