কাশ্মীর নিয়ে দিনরাত্রি শোরগোলের মধ্যে একটা বড় বিষয় নিয়ে তেমন  আলোচনাই প্রায় হতে পারল না। বিষয়টা, তাৎক্ষণিক তিন তালাকের অপসারণ। সংসদের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিক তিন তালাক ভারত থেকে চিরকালের জন্য দূর হয়ে গেল। এর বিরুদ্ধেও অনেক কথা আছে। কেউ বলবেন, সুপ্রিম কোর্ট আগেই যখন না বলে দিয়েছিল, তখন আর আলাদা করে এর দরকার কী ছিল। কেউ বলবেন, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। কেউ বা বলবেন, আরও আলোচনার দরকার ছিল। কিন্তু এমন এক-একটা সময় আসে, যখন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে দৃঢ় পদক্ষেপে সেই দিকে এগিয়ে চলতে হয়। চার পাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে ভাবলে চলে না। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা সেই পথেই এগিয়েছেন, অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে। 

আজকের যুগে দাঁড়িয়ে তিন তালাক রদ একটি জরুরি পদক্ষেপ। কেন? অনেকেই বলতে পারেন, তাৎক্ষণিক তিন তালাক একটি চয়েস। ছেলে যেমন মেয়েকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, মেয়েও ছেলেকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। তাঁদের কাছে কাতর অনুরোধ, একটু পরিসংখ্যানটা জানাবেন। ভারতবর্ষে যদি দু’লক্ষ, তিন লক্ষ অসহায় মহিলা তাৎক্ষণিক তিন তালাকের শিকার হয়ে রাস্তায় বসে থাকতে পারে, ভিক্ষে করতে পারে, সন্তান কোলে নিয়ে একেবারে ভেসে যেতে পারে, উল্টো দিকে কত জন মহিলার সেই বুকের পাটা রয়েছে যে পুরুষকে তিন তালাক দিয়ে বেরিয়ে আসবে? এবং বেরিয়ে এলেও পরে সেই পুরুষটির ঠিক কী কী ক্ষতি হয়েছে? 

আসলে আমাদের মনটাই এত রাজনীতির দ্বারা পুষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, তার ঊর্ধ্বে উঠে পুরুষ-নারীর ব্যাপারটা ভাবতে পারি না। ‘মেয়েদের ক্ষেত্রে তেত্রিশ শতাংশ সংরক্ষণ জরুরি’ বলার সময় যেমন সমস্ত রাজনৈতিক দলের মহিলারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন, তেমনই তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদটাও মেয়েদের জন্য একটা বহুকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ, এটা বলার জন্যেও সব মেয়েকে একসঙ্গে আসতেই হবে।

একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি। তিন তালাক রদে শুধু মুসলিম মেয়েরা মুক্তি পেয়েছে, এ রকম একটা কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটাকে আর একটু বিস্তারে দেখলে বোঝা যাবে, শুধু মুসলিম নয়, মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু সব মেয়ের জন্যই এই তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদ একটি আলোকবর্তিকা। কেরলের সেই মেয়েটিকে মনে আছে, যে দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল তথাকথিত এক যাজকের হাতে ধর্ষিতা হয়ে? ভারতবর্ষে চার্চ কোনও অন্যায় করলে তার বিচার আরও কঠিন। এই মেয়েটিও তাই বিচার পায়নি। দিনের পর দিন তাকে সেই পাদ্রিসাহেবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু পাদ্রিসাহেব ঈশ্বরের অজুহাত দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। ওই পাদ্রিসাহেবদের মুখেও এই তিন তালাক রদের মতো প্রক্রিয়া একটা বড় থাপ্পড়। ঠিক যেমন বিধবাবিবাহ বিল পাশ বা সতীদাহ রদ, তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যবাদী রক্ষণশীলদের কাছে একটা বড় থাপ্পড় ছিল। 

আমি পুরোহিতের নিন্দে করব, কিন্তু মৌলবি বা যাজকদের অন্যায় কাজের নিন্দে করব না, তা তো হয় না। এতে তো আমার মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হচ্ছে। আমি জুড়তে গিয়ে আগেই ভাগ করে দিচ্ছি। 

যখন বলা হয় কাশ্মীরিরা, তখন ভুলে যাই কাশ্মীরের সেই মেয়েদের কথা, যাঁরা নিজেরাও তিন তালাকের শিকার। আজকে ‘তিনশো সত্তর’ উঠে যাওয়ার ফলে সেই মেয়েরাও কিন্তু সমান বিচার পাবেন যে বিচার বিহার কিংবা উত্তরপ্রদেশ কিংবা কর্নাটকের তিন তালাকের শিকার একটি মেয়ে পেতে পারেন। এটা কি কোথাও একটা জয়লাভের জায়গা নয়? মনে রাখতে হবে সমর্থনটা বিষয়ভিত্তিক— বিরোধিতার মতোই। 

নিজে এক জন চিকিৎসক হিসেবে বলতে পারি, একটি মেয়ে যিনি সারা ক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে বাঁচছেন, তিনি কখনও সন্তানের জন্ম ঠিকমতো দিতে পারেন না। সন্তান প্রতিপালনও তাঁর দ্বারা ঠিক ভাবে হওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি গর্ভবতী মুসলিম মহিলারা কী অসম্ভব আতঙ্কে থাকেন, একটি কন্যার পর আবার যদি একটি কন্যার জন্ম দেন তা হলেই হয়তো স্বামী তালাক দিয়ে দেবেন। যখন তাঁর মন থেকে এই আতঙ্ক সরে যাবে, তখন তাঁর উদ্বেগ কমবে, মানসিক চাপ কমবে, শারীরিক অসুস্থতা কমবে। এই দিকগুলো শুনতে নিশ্চয়ই খুব আমাদের অবাক লাগে। কারণ আমরা তো মেয়েদের শরীর, মন, আশ্রয়, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা নিয়ে ভাবতে ততটা অভ্যস্ত নই! 

পুরুষতান্ত্রিকতা একটি ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়। সেই কারণেই কোথাও মেয়েদের ওপর অত্যাচার করার বিনিময়ে একটি ধর্মের পুরুষ শাস্তি পাচ্ছে দেখলে অন্যান্য ধর্মের পুরুষদের মধ্যেও একটা সতর্কবার্তা ছড়িয়ে যায় যে, এই শাস্তি আমাকেও পেতে হতে পারে। এ বারের স্বাধীনতা তাই মেয়েদের আতঙ্ক থেকে মুক্তির স্বাধীনতা হিসাবে চিহ্নিত থাক। পাহাড়ে ওঠার পথে অন্তত একটা-দুটো ঠিক পা বাড়ানোর স্বাধীনতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাক। তিন তালাকের বিসর্জন মেয়েদের স্বাধীনতার পতাকাকে আকাশের আর একটু উঁচুতে উড়তে সাহায্য করুক।