E-Paper

রাষ্ট্রের পক্ষপাত কার প্রতি

প্রথম প্রশ্নটি প্রায়ই নৈতিক আতঙ্কের ভঙ্গিতে তোলা হয়: সহায়তা পেলে মানুষ কি অলস হয়ে পড়েন? যুক্তিটি জনপ্রিয়, কারণ এটি সহজ; কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণালব্ধ প্রমাণের ধোপে টেকে না।

রোহন ইসলাম

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৫:১৩

জনকল্যাণে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সমাজের অস্বস্তিগুলো স্পষ্ট। এক দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছে; অন্য দিকে, ‘খয়রাতির সংস্কৃতি’ নিয়ে মধ্যবিত্তের উৎকণ্ঠা যেন নৈতিক সঙ্কটের রূপ নিয়েছে। আপাত-সহানুভূতিশীল মহল, এমনকি বাম রাজনীতিও বলতে থাকে যে, রাষ্ট্রের সহায়তা নাগরিককে দুর্বল করে। অর্থাৎ, মর্যাদা কেবল বাজারে অর্জিত আয়েই নিহিত।

এই উপসংহারটি যত আকর্ষণীয়, ততই অসম্পূর্ণ— কারণ এটি অন্তত চারটি পৃথক প্রশ্নকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়: দরিদ্রতার কাঠামোগত বাস্তবতা, সহায়তা-ভিত্তিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক অপব্যবহারের সম্ভাবনা, এবং মর্যাদার দর্শন। এদের এক করে ফেললেই রায় দেওয়া সহজ হয়; জটিলতাকে স্বীকার করলে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়।

প্রথম প্রশ্নটি প্রায়ই নৈতিক আতঙ্কের ভঙ্গিতে তোলা হয়: সহায়তা পেলে মানুষ কি অলস হয়ে পড়েন? যুক্তিটি জনপ্রিয়, কারণ এটি সহজ; কিন্তু বৈশ্বিক গবেষণালব্ধ প্রমাণের ধোপে টেকে না। অনিশ্চিত কাজ ও নিম্ন মজুরির বাজারে ‘অলসতা’র তত্ত্ব কাঠামোগত বৈষম্যকে আড়াল করার সুবিধাজনক ভাষা মাত্র। এই প্রকল্পগুলির টাকা সঠিক মানুষ পাচ্ছেন কি, অপচয় হচ্ছে কি না— এই উদ্বেগগুলো অপরিহার্য। কিন্তু এগুলো জনকল্যাণের ধারণাকে বাতিল করে না; বরং নকশার দুর্বলতা চিহ্নিত করে। এই দুর্বলতার কারণেই রাষ্ট্রের কাছে নিজের প্রাপ্য বুঝে মানুষ হয়রান হন। জনকল্যাণের বড় নৈতিক ব্যর্থতা প্রায়শই ‘দেওয়া’ নয়, ‘দেওয়ার ধরন’— যেখানে অধিকার কৃতজ্ঞতার পরীক্ষায় পরিণত হয়। রাজকোষের উপরে চাপের প্রশ্নটিকেও এড়ানো যায় না। কিন্তু তার উত্তর অগ্রাধিকার নির্ধারণ। পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় যুক্ত সহায়তা মানব সক্ষমতা বাড়ায়, উৎপাদনশীলতার ভিত্তি গড়ে।

সহায়তা প্রকল্প অনেক সময় নির্বাচনী গণিতে জন্ম নেয়। যে রাজনীতিক ভাতা দিয়ে নির্ভরতা টিকিয়ে রাখেন, কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করেন না, তিনি নাগরিককে সক্ষম করছেন না— নির্বাচনী সম্পদে রূপান্তর করছেন। কিন্তু, সব সহায়তাকেই ভোট কেনা বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় কি? শিশুদের মধ্যাহ্নভোজন, মাতৃত্ব সহায়তা, টিকাকরণ— এ সব কি ভোট কেনা? একটি দ্বৈত মানদণ্ডও কাজ করে: ধনী ভোটার করছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেখে ভোট দিলে তা ‘যুক্তিসঙ্গত পছন্দ’; দরিদ্র ভোটার রেশনের প্রতিশ্রুতি দেখে ভোট দিলে তা ‘ভোট বিক্রি’। এই বিভাজন নিরপেক্ষ নয়। আসল রেখাটি এখানে: সহায়তা যদি অধিকারভিত্তিক— নিয়মিত, স্বচ্ছ, মূল্যায়নযোগ্য, সক্ষমতা-নির্মাণকারী— হয়, তবে তা সংবিধানের পথে। আর যদি নির্বাচনের প্রাক্কালে অনিশ্চিত উপহার হয়ে আসে, কৃতজ্ঞতার ইশারা নিয়ে— তবে তা নাগরিককে শুধু ‘ভোটার’-এ নামিয়ে আনে।

আমাদের অন্তত দু’টি শব্দ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে— উন্নয়ন এবং স্বাধীনতা। দারিদ্র কেবল আয়ের স্বল্পতা নয়; তা সক্ষমতার ক্রম-ক্ষয়। অপুষ্ট শিশুর মেধা থাকতে পারে, কিন্তু পুষ্টির অভাব তার সম্ভাবনাকে সঙ্কুচিত করে। চিকিৎসার অপ্রাপ্যতায় ঋণের খাদে পড়া শ্রমিকের কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে যায়— তার শ্রমশক্তি, তার আয়ু, তার সামাজিক গতিশীলতা— সবই ক্ষতিগ্রস্ত। এই ক্ষয়গুলোকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসাবে দেখা নৈতিক ভাবে সুবিধাজনক, কিন্তু বিশ্লেষণের দিক থেকে ভ্রান্ত। এগুলো কাঠামোগত বঞ্চনার ফল— যেখানে সুযোগের অভাব উত্তরাধিকার হয়ে যায়। ক্ষুধা, অপুষ্টি, অসুস্থতা— এগুলোও শৃঙ্খল, ব্যক্তির স্বাধীনতার পরিপন্থী। যে শিশু ক্ষুধার কারণে স্কুলে মনোযোগ দিতে পারে না, যে নারী চিকিৎসার অভাবে কর্মক্ষমতা হারায়, যে শ্রমিক ঋণের চক্রে আটকে নিজের পেশা বদলাতে পারে না— তাদের স্বাধীনতা কাগজে অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে, বাস্তবে নয়। ন্যূনতম খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার নিরাপত্তা তাই স্বাধীনতার বিরোধী নয়; বরং তার পূর্বশর্ত।

“ভাতা চাই না, চাকরি চাই”— মানুষের সক্ষমতার ইচ্ছাজ্ঞাপক এই বাক্যটি প্রায়ই একটি ভ্রান্ত দ্বন্দ্ব নির্মাণ করে— যেন চাকরি ও জনকল্যাণ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাস্তব তার চেয়ে বেশি জটিল। পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যূনতম আয়ের নিরাপত্তা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়; এগুলো শ্রমবাজারে প্রবেশের পূর্বশর্ত। একটি ন্যূনতম স্থিতি মানুষকে ঝুঁকি নিতে দেয়— নতুন দক্ষতা অর্জন করতে, অনিশ্চিত শর্ত অস্বীকার করতে। সঠিক ভাবে নকশা করা জনকল্যাণ-নীতি চাকরির পথ বন্ধ করে না; বরং তা পরিষ্কার করে, কারণ এটি মানুষকে বেঁচে থাকার আতঙ্ক থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়।

বাজার একা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না— এটা বাস্তব। এই বাস্তবতায় “চাকরি না হওয়া পর্যন্ত সহায়তা নয়” বলা মানে দাঁড়ায়— তত দিন টিকে থাকার অধিকারও স্থগিত। গণতন্ত্র এই নিষ্ঠুরতাকে নীতির মর্যাদা দিতে পারে না। অধিকারকে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে শর্তযুক্ত করা মানে বর্তমানের ভঙ্গুরতাকে উপেক্ষা করা।

এখানেই ভাষার একটি সূক্ষ্ম পক্ষপাত কাজ করে। বড় কর্পোরেট ঋণের পুনর্গঠনকে বলা হয় ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা’; দরিদ্রের ভর্তুকিকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘নৈতিক সঙ্কট’। এই বিভাজন নিরপেক্ষ নয়; এটি আমাদের নৈতিক কল্পনাকে পরিচালিত করে। প্রশ্ন হল: রাষ্ট্র কার ভঙ্গুরতাকে বৈধ বলে স্বীকার করে, আর কার ভঙ্গুরতাকে সন্দেহের চোখে দেখে। গণতন্ত্রের নৈতিকতা নির্ধারিত হয় এই স্বীকৃতির পরিসরে— আমরা কাকে নাগরিক হিসাবে দেখি, আর কাকে কেবল ব্যয়-খাতে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৮ রাষ্ট্রকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়ের পরিকাঠামো গড়তে বলে। অনুচ্ছেদ ৩৯ সতর্ক করে— সম্পদ যেন অল্প কয়েক জনের হাতে কেন্দ্রীভূত না-হয়। আর অনুচ্ছেদ ২১-এর বিচারিক ব্যাখ্যা— ওলগা টেলিস থেকে পিইউসিএল মামলা— জীবনের ধারণাকে কেবল বেঁচে থাকার জৈবিক ন্যূনতমে সীমাবদ্ধ রাখেনি; খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যকে মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আম্বেডকর মনে করিয়ে দিয়েছিলেন— সাংবিধানিক নৈতিকতা স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক নৈতিকতার চেয়ে উচ্চতর, কারণ এটি সংখ্যাগরিষ্ঠের মেজাজ থেকে সংখ্যালঘুর অধিকারকে সুরক্ষিত রাখে। সংবিধানসভা জানত, রাজনৈতিক স্বাধীনতা একা যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাকে কার্যত শূন্যে নামিয়ে আনে।

গণতন্ত্রে প্রশ্নটি তাই কেবল অর্থনীতির অঙ্ক নয়; রাষ্ট্রের চরিত্রের পরীক্ষা। রাষ্ট্র কি নাগরিককে এমন ভাবে সহায়তা দেয়, যাতে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে— না কি এমন ভাবে দেয়, যাতে সে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকে? ভারতীয় সংবিধান এই দ্বিধার উত্তর বহু আগেই দিয়েছে— মর্যাদা, সমতা ও সামাজিক ন্যায়কে শাসনের কেন্দ্রে রেখে। এখন প্রশ্ন একটাই: আমাদের রাজনীতি কি সেই নৈতিক স্মৃতি ধরে রাখবে, না কি সুবিধাজনক বিস্মৃতির পথে হাঁটবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy