E-Paper

‘ওরা পায়, আমরা পাই না’

লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পটি অনেকের কাছেই স্রেফ ধোঁয়াটে ভাবনাচিন্তার কারণে অস্বস্তিকর। গরিব মানুষের হাতে টাকা তুলে দেওয়া মানে যেন ঘুষ দিয়ে তাঁদের ভোট কিনতে চাওয়া।

সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৮

গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন টিভি চ্যানেলে উপস্থিত ছিলেন শাসক দলের সমর্থক এক পুরুষ অধ্যাপক। খবরের চ্যানেলে অতি পরিচিত মুখ। রাজ্যের শাসক দলের আসনসংখ্যা যত বাড়তে থাকে, ততই তাঁকে চেপে ধরতে শুরু করেন স্টুডিয়োতে উপস্থিত বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিরা। বাম এবং ডান, দু’পক্ষেরই মতে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের বিনিময়ে মেয়েদের ভোট কিনে নেওয়াতেই এই জয়। অধ্যাপক মশাই নাস্তানাবুদ হয়ে বলেন, “আপনাদের খালি ওই এক কথা, লক্ষ্মীর ভান্ডার! উন্নয়নটা দেখতে পান না!”

উন্নয়নচর্চা নিয়ে যাঁদের কারবার, এমন কথায় তাঁরা বিষম খাবেন। তবে, তাঁরা নিতান্তই মুষ্টিমেয়। স্কুলপাঠ্য অর্থনীতির বাজারচলতি বইয়ের মলাটে যেমন টাকার ছবি থাকে, ঠিক তেমনই সরকারি ভাষ্যে ‘উন্নয়ন’ বোঝাতে আজও বড় বড় সেতু আর মালবাহী ট্রাকের ছবি ব্যবহার করা হয়— লক্ষ্মীর ভান্ডারকে উন্নয়ন বলে চিনতে আজও দ্বিধা প্রবল।

বস্তুত, লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পটি অনেকের কাছেই স্রেফ ধোঁয়াটে ভাবনাচিন্তার কারণে অস্বস্তিকর। গরিব মানুষের হাতে টাকা তুলে দেওয়া মানে যেন ঘুষ দিয়ে তাঁদের ভোট কিনতে চাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এক বামপন্থী বন্ধু যেমন বলছিলেন, “যে টাকা দেবে সে ভোট পাবে, বিষয়টা এ রকম দাঁড়িয়ে গেলে কোনও গঠনমূলক কাজেরই আর মূল্য পাওয়া যাবে না।” শিয়ালদহ সাউথ লাইনে আমার লোকাল ট্রেনের সহযাত্রী মধ্য-চল্লিশের শম্পাদির কাছে জানতে চাইলাম, সত্যিই কি মহিলাদের হাতে টাকা তুলে দিয়ে ভোট কেনা যায়?শম্পাদি শহরতলি-টু-কলকাতা নিত্যযাত্রী— গৃহশ্রমিকের কাজ করেন। এক কথায় উত্তর না দিয়ে তিনি ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেন, “তুমিই বলো, কোনটা ভাল— মেয়েদের ভয় দেখিয়ে, বাড়িতে থান পাঠিয়ে ভোট না দিতে দেওয়া; না কি, হাতে টাকা দিয়ে ভোট কিনতে চাওয়া?” শম্পাদির পড়শি সোনালি বলেন, “হাওয়া ঘুরে গেছে। এখন আর মেয়েদের ভয় দেখিয়ে ভোট চাওয়া যাবে না। যে-ই ভোট চাইতে আসে, বলে এই দেব, তাই দেব…।” অধ্যাপক বন্ধুর প্রশ্নের জবাব মিলে যায়। ভোটে লড়া সব দলই যদি বাধ্য হয় গরিব মেয়েদের হাতে টাকা তুলে দিতে, তবে এ বাবদে কেউই বেশি নম্বর পাবে না। তখন বিচারটা হওয়ার কথা অন্য সব ‘গঠনমূলক’ কাজের ভিত্তিতেই।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পের বিরুদ্ধে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি প্রধান আপত্তির কারণ, বসে বসে টাকা পেলে মানুষ অলস হয়ে যায়। ‘ওদের’ স্বভাব নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ‘আমাদের’ ঘুম নষ্ট। হবে না-ই বা কেন— নিজেদের ‘মেধা’র জোরে, পরিশ্রমের জোরে ‘আমরা’ যে টাকা রোজগার করছি, তাতে ভাগ বসাচ্ছে সরকার। মোটা অঙ্কের কর চাপিয়ে সেই টাকা নয়ছয় করছে ‘ওদের’ হাতে তুলে দিচ্ছে ভোট কিনবে বলে। ‘ওরা’ যে-হেতু সংখ্যায় বেশি, ‘আমাদের’ মতামতের কোনও গুরুত্বই নেই সরকারের কাছে। রাস্তাঘাটে, বাচ্চার স্কুলের সামনের জটলায়, পার্কে, দোকানে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এই মর্মে মধ্যবিত্তের আক্ষেপ।

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সহকর্মীরা গবেষণায় দেখিয়েছেন, হাতে টাকা পেলেই গরিব মানুষ অলস হয়ে যান, এ অভিযোগ ধোপে টেকে না। বরং বাড়তি একটু রোজগার অনেক ক্ষেত্রেই তাঁকে সাহায্য করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। আর, অসাম্যদীর্ণ দেশে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের যে মডেল, তার অন্যতম কাজ সম্পদের পুনর্বণ্টন। কারণ, ‘প্রিভিলেজ’ বা জন্মগত সুবিধা কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশের মানুষের দখলে থাকে। যাকে সাদা চোখে ‘মেধা’ মনে হয়, তার অনেকখানি, হয়তো বা পুরোটাই আসলে প্রিভিলেজ, ব্যক্তির অর্জন নয়। উচ্চ বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষিত মানুষের চেয়ে গরিব মানুষ অনেক বেশি খাটেন প্রতি দিন। কিন্তু রোজগার করেন অনেক কম।

দার্শনিক জন রলস বলেছেন আদি অবস্থান বা অরিজিনাল পজ়িশনের কথা। ধরে নিন, আজ যে সমাজব্যবস্থা রয়েছে, কাল তা থাকবে না। একটা লটারির ফলে বদলে যেতে পারে সব কিছু। আজ যিনি এক জন শহুরে শিক্ষিত হিন্দু উচ্চ-মধ্যবিত্ত উচ্চবর্ণের পুরুষ, কাল তিনি হয়ে যেতে পারেন গ্রামের এক জন গরিব মুসলমান মেয়ে, যিনি প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ পাননি, সামান্য মজুরির বিনিময়ে সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বিড়ি বাঁধেন, পাশাপাশি সংসারের সব কাজও করেন। এই ব্যবস্থায় আমরা কেউই জানি না যে, কাল আমি কোন অবস্থায় থাকব। এই পরিস্থিতিতে যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, কেমন পরিবর্তন চাই আমি— তার উত্তরটা স্পষ্ট, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় যে আছে, তার যেন আর খারাপ না হয়। যিনি আজ মনে করছেন যে, ধনীদের উপরে চাপানো আয়কর কমানোই এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি বিষয়, আদি অবস্থানে দাঁড়ালে তিনি আর তা বলবেন না। তিনি হয়তো চাইবেন যে, সকলের জন্য ন্যূনতম আয় বা লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প চালু হোক। রলসের এই সহজ নীতি মেনে অনেক দার্শনিকই মনে করেন, সামাজিক চয়ন হওয়া উচিত আদি অবস্থানে দাঁড়িয়ে।

মেয়েদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার প্রকল্পের পক্ষে আর একটি যুক্তি হল, ভারতের মতো দেশে বেতনহীন শ্রমে যুক্ত তাঁদের একটা বড় অংশ। গেরস্তালির চৌহদ্দির ভিতরে তাঁদের উদয়াস্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম জাতীয় আয়েও ঠাঁই পায় না। এই অসম বণ্টন পরিবারের চোখে পড়ে না। কিন্তু, তা বলে রাষ্ট্রও চোখ বুজে বসে থাকতে পারে না। মেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া টাকা তাঁদের না-পাওয়া মজুরির একটা ছোট অংশ, বিষয়টাকে এ ভাবেও দেখা যেতে পারে।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি হিসাব অনুযায়ী ১২০টিরও বেশি দেশে রয়েছে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার প্রকল্প। এই নগদ হস্তান্তর হতে পারে শর্তসাপেক্ষ (বিশেষ একটি কাজ করলে তবেই টাকা পাওয়া যায়— যেমন, স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করা, আইনি বয়স না হওয়া পর্যন্ত অবিবাহিত থাকা), বা নিঃশর্ত। আবার টাকা না-দিয়ে বিশেষ কোনও সামগ্রীও দিতে পারে সরকার। এর পোশাকি নাম ‘ইন কাইন্ড ট্রান্সফার’। যেমন চাল, ডাল, রান্না করা খাবার বা পরিবারের রোজগার বাড়ানোর জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল। আবার কোনও কোনও পণ্যের ক্ষেত্রে বাজারের দামের একটা অংশ মিটিয়ে দেয় সরকার। “সরকার আমাদের জন্য কী করে” বলে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি আক্ষেপ করেন, তাঁরা একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন যে, পানীয় জল থেকে বিদ্যুতের বিল, সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ, কোনওটা আসে নিখরচায়, কোনওটা বা বাজারের দামের চেয়ে অনেক কমে।

সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া সরকারি প্রকল্পের অনেক রকমফের হতে পারে। সমাজের কোনও বিশেষ অংশের মানুষ এর আওতায় আসবেন, না কি সবাই, তাও বিবেচনার বিষয়। সকলের জন্য প্রকল্প রাজস্বের উপরে চাপ বাড়ায়। অন্য দিকে, কোনও বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গেলে অনেকের বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যাঁর পাওয়ার কথা নয়, তিনিও পেয়ে যেতে পারেন। কে পাবে আর কে পাবে না, সেই তালিকা তৈরিতেও প্রচুর শ্রম আর অর্থ যায়। শুধু তা-ই নয়, অর্থনীতিবিদেরা দেখিয়েছেন যে, সমাজের অসহায়তম অংশের জন্য যে প্রকল্প, তা ঠিক মতো কাজ না করলে প্রতিবাদ করার মতো কেউ থাকে না। লক্ষ্মীর ভান্ডার সম্পর্কে অনেকের আপত্তি, সম্পন্ন ঘরের মহিলারাও এই টাকা নিচ্ছেন। পরিবারের অন্দরে বণ্টনের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিলে খেয়াল হবে, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পন্ন পরিবারেও মহিলাদের খরচের জন্য নিজস্ব টাকা থাকে না।

সামাজিক সুরক্ষার কোন প্রকল্পটি বেছে নেওয়া উচিত, কোনটি নয়, তা নিয়ে গণপরিসরে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া দরকার। সরকারের হাতে যে-হেতু অফুরন্ত সম্পদ নেই, স্কুলপড়ুয়াদের ট্যাব দিলে প্রসূতি মহিলাদের আয়রন ট্যাবলেটে টান পড়বে কি না, ক্লাবগুলোকে পুজোর টাকা দিলে মিড-ডে মিল’এ ডিম বন্ধ হয়ে যাবে কি না, এ সব প্রশ্ন জরুরি। এ ধরনের বিতর্কে যোগ দেওয়ার রুচি শ্রেণিবিদ্বেষী মধ্যবিত্তের নেই। তার একটাই মাত্র আক্ষেপ— “ওরা পাচ্ছে, আমরা পাচ্ছি না।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Laxmi Bhandar Scheme Mamata Banerjee TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy