২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর অনেকেই মনে করছেন যে, ২০২১-এর বিধানসভা ভোটেই এমনটা হওয়ার কথা ছিল। কারণ, তৃণমূল জমানার প্রথম পর্যায়ের শেষ এবং ২০১৬-এর বিধানসভা জয়ের পর থেকেই দলটির নানান দুর্নীতি, অত্যাচার ও বঞ্চনায় রাজ্যের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করে। প্রশ্ন, গত দশ বছর ধরে বাংলার মানুষ একটানা এই বঞ্চনা সইল কেন? কারণ মূলত তিনটি। প্রথমত, বাংলার মানুষের সহনশীলতা যতটা, প্রতিক্রিয়া তার চেয়ে ঢের কম। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার যে বাজার আজকের সমাজমাধ্যমের যুগে তৈরি হয়েছে, তা সাত-দশ বছরের বেশি পুরনো নয়। নইলে চৌত্রিশ বছরের বাম জমানা এবং তার আগের ঊনত্রিশ বছরের কংগ্রেস আমল সহ্য করা তো মুখের কথা নয়। দ্বিতীয়ত, জননেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা, যা তৃণমূল দলটির উপর বীতশ্রদ্ধ করে তুললেও দলনেত্রীর প্রতি জনসাধারণকে দীর্ঘ দিন ধরে সহানুভূতিশীল করে রেখেছিল। এবং তৃতীয়ত, বাংলার মানুষ বিকল্প সরকার হিসেবে বিজেপির উপর তখনও যথেষ্ট ভরসা করতে পারেনি।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের সময় এক জনপ্রিয় স্লোগান ছিল— ‘হ্যাশট্যাগ, নো ভোট টু বিজেপি’। এর অন্তস্তলের বক্তব্যটি ছিল— হে সহনাগরিক, এ-কথা জানাই আছে যে আপনি তৃণমূল শাসনে বিপর্যস্ত, কিন্তু তা বলেই কি বাংলার বুকে বিজেপিকে স্থান দেওয়া যায়? বিশেষ করে সেই দলের যখন একটি হিন্দুত্ববাদী ও আপাত পুরুষতান্ত্রিক অবস্থান রয়েছে? বাংলায় বিজেপিকে স্থান না-দেওয়ার এই যে ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছিল, সেই আলোচনায় পরে আসছি। তার আগে বলতেই হয় যে তৃণমূল সরকার, যা বরাবর মা-মাটি-মানুষের সরকার বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে, তা গত পাঁচ বছরে না মাটির কাছে পৌঁছতে পেরেছে, না মানুষের নাড়ি বুঝতে পেরেছে। তারা ‘নো ভোট টু বিজেপি’র অর্থ করেছে ‘অল ভোট টু টিএমসি’। ফলে এক দিকে যেমন তারা ২০২১-এর বিধানসভা জয়ের পর জনগণের দোদুল্যমান আস্থা পুনরুজ্জীবিত করার বা আত্মসমীক্ষার কোনও চেষ্টা করেনি, অন্য দিকে তেমনই ক্রমবর্ধমান দুর্নীতিতে লাগাম টানার পথেও হাঁটেনি। তৃণমূল শাসনের শেষ পাঁচ বছরে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন প্রায় শূন্য, সরকারি উন্নাসিকতা চরম এবং আর জি কর ঘটনা, নেতা-মন্ত্রীদের পরিচিতের বাড়ি থেকে কালো টাকা উদ্ধারের ঘটনা বা চাকরি চুরির মতো দুর্নীতি ঘটতেই থেকেছে।
আসলে যে কোনও শাসনকালই দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে ক্ষমতার অপরিসীম আলো শাসককে অন্ধ করে দেয়। ক্ষমতার আশেপাশে জন্ম নেওয়া তাঁবেদারের দল তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় জনসাধারণ তথা গণসমস্যা থেকে। যত সময় যায়, ততই বাড়তে থাকে শাসককে ঘেরা তাঁবেদার ও তাদের ঘিরে গজিয়ে ওঠা তাঁবেদারের দল। তারা ক্ষমতাবানের থেকে চুইয়ে পড়া ক্ষমতার লোভে নিরন্তর আনুগত্য প্রদর্শন করে এবং শাসকের চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখে। ফলে শাসক ভুলে যেতে থাকেন যে, এই তাঁবেদারি বাস্তব নয়। জনগণের থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রশাসনের দুর্নীতি আর শাসকের ক্ষমতার অপব্যবহার পাঁচশো বছরের রোমান সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটিয়েছিল। এই রাজ্যেই ক্যাডার-সংস্কৃতি, জনবিচ্ছিন্নতা, আর বাস্তবতাকে ধামাচাপা দিয়ে গায়ের জোর আর ঔদ্ধত্যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গের চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনকেও উপড়ে দিয়েছে।
অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে কেন কোনও শাসক দলই অপরাজেয় থাকতে পারে না? উত্তর সম্ভবত একটাই— সর্বগ্রাসী ক্ষমতা। উনিশ শতকের ব্রিটিশ সাংসদ লর্ড অ্যাক্টন যেমন বলেছিলেন— ক্ষমতাই দুর্নীতির জন্ম দেয়, ক্ষমতা যত ব্যাপক, দুর্নীতিও ততই সর্বগ্রাসী। একে ক্ষমতার নিয়তিও ভাবা যেতে পারে। ক্ষমতার অন্ধত্বই হোক, তোষামোদকারী পরিবেষ্টনই হোক, জনবিচ্ছিন্নতার কারণেই হোক, কিংবা দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব— তৃণমূল সরকার শেষের পাঁচ বছরে নিজের কবরের পেরেক নিজেরাই পুঁতেছে। না হলে আর জি কর ঘটনার পর প্রকাশিত দশ দফা নারীসুরক্ষা কবচের সরকারি নথি মহিলাদেরই বস্তাবন্দি করে সুরক্ষিত রাখার তালিবানি শাসন জারি করে কী করে? কী করে বলা হয়, সরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ এবং হস্টেলের নাইট ডিউটি থেকে মহিলাদের যথাসম্ভব বিরত রাখতে হবে? কর্মস্থলে মহিলাদের দিয়ে কোনও ভাবেই একটানা বারো ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না, এমনকি চিকিৎসাক্ষেত্রেও না?
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছেন। বাংলার বুকে বিজেপি-আগ্রাসন আটকানোর যে প্রচেষ্টা ও প্রচারের কথা আগে বলছিলাম, তার অন্যতম ন্যারেটিভ ছিল, বিজেপির পুরুষতান্ত্রিক অবস্থান। এর মধ্যে আর জি কর ঘটনা, ও অতঃপর প্রকাশিত নারীসুরক্ষা কবচটি এই রাজ্যে নারী-অবদমনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ফলে বিজেপি সরকার এসে মেয়েদের চলার পথে নতুন কোনও কাঁটার মালা বিছাবে, এমনটা মনে করার আর যথেষ্ট অবকাশ ছিল না। অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী যে ঘোষণাটি করেছেন, তা আপাতত বাংলার প্রত্যেক মহিলার মন জয় করার জন্য যথেষ্ট। পাশাপাশি নারীসুরক্ষার জন্য একটি সব সময়ের হেল্পলাইন নম্বর শুরুর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
জাতধর্ম নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মেয়েরা এটাই তো চেয়েছিল। বাকিটা সময় বলবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)