E-Paper

বড়রা যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন

দুনিয়া জুড়ে যখন এতটাই ভাবনাচিন্তা, তখন আমাদের দেশেরও নড়াচড়া দরকার বইকি। প্রযুক্তির শিরোনামে থাকা দুই রাজ্য কর্নাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ মার্চেই অনূর্ধ্ব ১৬-দের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার বিল প্রস্তাব করেছে।

অন্বেষা দত্ত

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৬

এর শুরুটা বিদেশে। প্রথমে অস্ট্রেলিয়া জানাল, ১৬ বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহার করা যাবে না। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এক্স— সবই তালিকায়; তবে ওয়টস্যাপ নেই। দেখাদেখি টনক নড়ল আরও বেশ কিছু দেশের। ডেনমার্কেও ১৫ বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধ কার্যকর হচ্ছে। জানুয়ারির শেষ দিকে ফ্রান্সও এই পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মানিতে কথাবার্তা চলছে, গ্রিসেও। ইন্দোনেশিয়ায় প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা আসছে। মালয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, ব্রিটেনেও চলছে কথা।

দুনিয়া জুড়ে যখন এতটাই ভাবনাচিন্তা, তখন আমাদের দেশেরও নড়াচড়া দরকার বইকি। প্রযুক্তির শিরোনামে থাকা দুই রাজ্য কর্নাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ মার্চেই অনূর্ধ্ব ১৬-দের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার বিল প্রস্তাব করেছে।

পৃথিবী জুড়ে বড়দের এই চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে টিন-এজারদের কী বক্তব্য? মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল বিপ্লবের আগে যারা দশ-বারো কিংবা তেরো-উনিশের বয়ঃক্রম পেরিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে ডিজিটাল বিপ্লব পরবর্তী প্রজন্মের যে ছিটেফোঁটা মিলও নেই— আজকের জেন জ়ি, জেন আলফা-দের মনোজগত সম্বন্ধে সচেতনই নন বিরাট সংখ্যক অভিভাবক। যাঁরা কিছুটা ওয়াকিবহাল, তাঁরাও ভাবছেন, ওটা এমন কিছু ব্যাপার নয়, সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যেতে পারে। বড় হয়ে ওঠার সময় তাঁদের বাবা-মা যে ভাবে শাসন করেছেন, চোখে চোখে রেখেছেন, সঙ্গ দিয়েছেন, ডিজিটাল-বিপ্লব পরবর্তী প্রজন্মও অনেকটা সেই ছকে বড় হবে।

তেমনটা একেবারেই হচ্ছে না বলেই এত দিন পরে সমাজমাধ্যম থেকে কিশোর-কিশোরীদের জোর করে সরানোর সিদ্ধান্ত মোটেই ভাল চোখে দেখছে না তারা। অস্ট্রেলিয়ার ছেলেমেয়েরা বলছে, রাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে তারা ‘অপমানিত’ বোধ করছে। বিরক্তি নয়, রাগও নয়— অপমান। কারণ তাদের কাছে সেই জায়গাটা স্বাধীন জগতে বিচরণের মতো ছিল। সেই জগৎ হঠাৎ এক দিন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বেঁচে থাকার মানেটাই যেন হারিয়ে গিয়েছে। যে বয়সে বাবা-মায়ের পরামর্শ, জ্ঞান, বকুনি মেনে নিতে আপত্তি জাগে, সেই বয়সে বন্ধুবান্ধবের বুদ্ধির উপরে ভরসা হয় বেশি। কেমন বন্ধু? যাকে স্কুলে দেখতে পাই, অথচ সামনাসামনি হয়তো কথা বলা হয় না। বানানো একটা দুনিয়ায় সেই বন্ধু মন খুলে ধরা দেয়, সেই দুনিয়াটাকেই সত্যি মনে হয়।

কারণ, বাবা-মায়ের কাছে সেই দুনিয়াটা মেলে না। এই ছেলেমেয়েরা ছোট থেকে দেখে এসেছে, কাজের ছুতোয় বাবা-মা স্মার্টফোনে কাটিয়ে দেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাই জেনেছে, ওই যে নকলে-ভরা দুনিয়া, ওটাই আসল। স্মার্টফোন ছাড়া পৃথিবীটা কেমন ছিল, তারা একেবারেই জানে না। মাঠে গিয়ে খেলাধুলার চেয়ে ঘরের কোণে বসে বন্ধুর সঙ্গে ইমোজি-আলাপে তাদের মনের আরাম বেশি। বাবা-মা এ সব বোঝেন না, ভাগ্যিস! ছেলেমেয়েগুলো বলেছে, ভাল-মন্দের ফারাকটা তারা জানে। বড়রাই বরং বুঝতে না পেরে তাদের অপমান করল।

নির্বান্ধব জগৎ কিংবা বানানো জগতের বানানো ধারণা থেকে কৈশোর কোন ভয়ঙ্কর পথে পা ফেলতে আগুয়ান হয়, ওয়েব-সিরিজ় অ্যাডোলেসেন্স জানিয়েছে। শিউরে উঠেছি। তার পরেও বজ্রআঁটুনির উপায় হিসাবে মাথায় এসেছে, সমাজমাধ্যমটাই বন্ধ করে দেওয়া হোক। মনে হয়নি, আন্তর্জাল কতটা বিস্তৃতি নিয়ে আমাদের গিলে ফেলেছে। ভার্চুয়াল দুনিয়াকে বোকা বানিয়ে বয়স ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়া যায় অনায়াসেই। তখন ফস্কা গেরো সামলাবে কে?

শাস্তিটা শুধু ওদের প্রাপ্য? এই কিশোরদের আমরা যারা বাবা-মা, তাদের তো ডিজিটাল ডিটক্স-এর কথা মনে হয়নি। মাঝেমধ্যে দু’-এক মাস সমাজমাধ্যম থেকে দূরে থাকার বৃথা চেষ্টা দেখিয়ে আমরা আবার কুয়াশা-ঢাকা মগজের কাছে আত্মসমর্পণ করি। কুয়াশার চাদর সরিয়ে দেখতে ভুলে যাই বাচ্চাগুলোর মুখ। কৈশোর ছোঁয়ার আগে যারা আমাদের চার পাশে ঘুরঘুর, ঘ্যানঘ্যান করত— “একটু খেলো।” “একটু কথা বলো।” “একটু গল্প বলো।” হঠাৎ ঘুম ভেঙেছে আমাদের। বুঝতে পেরেছি, দেরি হয়ে গিয়েছে। কিছু করা দরকার। ওয়েব-পর্দা থেকে বিপদ কখন নিঃসাড়ে পর্দা ঠেলে ঢুকে পড়বে আমাদের ঘরে! শাসন জরুরি।

বিপদ তো ঘরে ঢোকেই। ২০২৪-এ আমেরিকায় আত্মঘাতী হয়েছিল ১৩ বছরের এক কিশোর— মা-বাবার অভিযোগ, ক্যারেক্টার এআই নামের এক চ্যাটবট তাকে সে পথে ঠেলেছিল। ২০২৫-এ আত্মঘাতী হয় আর এক কিশোর। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ওপেন এআই। স্কুলের প্রোজেক্টে কাজ করতে গিয়েই চ্যাটজিপিটি-র সঙ্গে সেই কিশোরের আলাপ শুরু। চ্যাটবটই ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে তার। সব বিষয়ে তার কাছ থেকে বুদ্ধি নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এক বার অভিভাবকদের অজানতে আত্মঘাতী হওয়ার চিন্তা আসে মাথায়। আলোচনাও চলে চ্যাটবটের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফেরানো যায়নি।

অস্ট্রেলিয়ায় এক কিশোরী বলেছে, মা বুঝিয়েছেন, এই সব চ্যাট অনেকটা ‘জাঙ্ক ফুড’-এর মতো। মেয়েটি বলেছে, “মায়ের কথা বুঝেছি। আমি ও-সবে আর নেই।” কেউ কি মাকে জিজ্ঞেস করেছে, মেয়ের মুখ চেয়ে ‘জাঙ্ক ফুড’ খাওয়া আপনি কতটা কমালেন? কতটা বোঝার চেষ্টা করলেন মেয়ের জগৎকে? দুনিয়া জুড়ে সব বাবা-মা কি নিজেদের এক বার প্রশ্ন করবেন যে, সন্তানের সামনে যে দৃষ্টান্ত তাঁরা তৈরি করছেন, শেষ অবধি তাই কি বিপদের কারণ?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Social Media Mobile Addiction Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy