সিঙ্গাপুরে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষিকা ফেংকিং চাও সম্প্রতি যে তথ্য উদ্ঘাটিত করিয়াছেন, তাহা শুধু নিন্দনীয় নহে, উদ্বেগজনক। পৃথিবীতে ২০২টি দেশে ১৯৭০ হইতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গর্ভবতী মহিলাদিগের সন্তানপ্রসবের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করিয়া চাও দেখাইয়াছেন, উক্ত সময়কালে ওই দেশসমূহে ২ কোটি ৩০ লক্ষ কন্যা জন্মিয়াও ভূমিষ্ঠ হইতে পারে নাই। ভ্রূণ অবস্থায় তাহাদের হত্যা করা হইয়াছে। যে সব রাষ্ট্রে এই রূপ কুকর্ম সাধিত হইয়াছে তন্মধ্যে পুরোভাগে রহিয়াছে আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজ়ারবাইজান, চিন, জর্জিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টেনেগ্রো, তাইওয়ান, তিউনিশিয়া, ভিয়েতনাম এবং অবশ্যই ভারত। ওই ১২টি রাষ্ট্রে কন্যাভ্রূণ হত্যাসম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করিতে চাও মুশকিলে পড়েন নাই। বাকি ১৯০টি দেশে ওই কুকর্মের পরিসংখ্যান সহজলভ্য নহে। সেই সব ক্ষেত্রে চাও আশ্রয় লইয়াছেন মডেলিং পদ্ধতির। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট স্থানীয় পরিসংখ্যান হইতে সমগ্র রাষ্ট্রে কন্যাভ্রূণ হত্যা কী সংখ্যায় পৌঁছাইতে পারে, তাহার হিসাব করিয়াছেন। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করিতে শুরুর সময়কাল লক্ষণীয়। ১৯৭০-এর দশকের গোড়া হইতে ভ্রূণহত্যার প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়। এবং আকস্মিক দুর্ঘটনাজনিত কারণে গর্ভপাত নহে, স্বেচ্ছায় ভ্রূণহত্যা লোভনীয় হইয়া উঠে। সচ্ছল ভাবে প্রতিপালনযোগ্য সন্তানের সংখ্যা যাহাতে না বাড়ে, তজ্জন্য ভ্রূণ নষ্ট করা এক জিনিস, আর বাছিয়া বাছিয়া কন্যাভ্রূণ হত্যা আর এক। রোজগারের চিন্তায় পরিবারের কলেবর বৃদ্ধি পৃথিবীর বহু দেশে ইদানীং দম্পতিগণের না-পসন্দ। মুশকিল এই যে, দম্পতিগণ পুত্রভ্রূণের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় হত্যা করেন কন্যাভ্রূণ। কারণ, মনে করা হয় পুত্র স্বীয় সম্পত্তি, কন্যা পরস্মৈপদী। এই মনোভাব বহু দেশেই আজও বদ্ধমূল।

গর্ভস্থ ভ্রূণ পুত্র বা কন্যা, কোন সম্ভাবনার পথে যাইবে, সেই প্রক্রিয়াটি বিচার্য। পিতার শুক্রাণু এবং মাতার ডিম্বাণুর মিলনে ভ্রূণ জন্মায়। মাতার ডিম্বাণুতে সর্বদাই এক্স ক্রোমোজ়োম থাকে। পিতার শুক্রাণুতে এক্স বা ওয়াই ক্রোমোজ়োম থাকিতে পারে। ভ্রূণ গঠনের সময় যদি মাতার এক্স-এর সহিত পিতার এক্স ক্রোমোজ়োম মিশে, তাহা হইলে সন্তানটি হয় কন্যা। অন্য দিকে মাতার এক্স ক্রোমোজ়োমের সহিত পিতার ওয়াই ক্রোমোজ়োম মিশিলে সন্তান পুত্ররূপে ভূমিষ্ঠ হয়। সম্ভাবনা এইরূপ হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যায় যে, পৃথিবীতে কন্যা এবং পুত্রসন্তান জন্মিবার হার সমান হইবে। অথচ, বাস্তবে তাহা ঘটে না। পুত্রভ্রূণ উৎপন্ন হইবার হার অধিক। ১০০টি কন্যাভ্রূণ উৎপন্ন হইলে পুত্রভ্রূণ উৎপন্ন হয় ১০৩ হইতে ১০৭টি। পিতার এক্স ক্রোমোজ়োমের সহিত মাতার এক্স ক্রোমোজ়োম মিলিত হয় কম সংখ্যায়। সামান্য বেশি ক্ষেত্রে মিশে পিতার ওয়াই ক্রোমোজ়োমের সহিত মাতার এক্স ক্রোমোজ়োম। পুত্রসন্তানের তুলনায় আরও কম কন্যাসন্তান জন্মিলে বিশেষজ্ঞগণ বুঝেন কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫ সালে চিন দেশে ১০০ জন কন্যা জন্মিলে পুত্র জন্মিয়াছে ১১৮ জন। ২০১৭ সালে অবশ্য ওই হার কিঞ্চিৎ কমিয়াছে— প্রতি ১০০ কন্যার ক্ষেত্রে ১১৪ জন পুত্র। উক্ত হার আরও কমে কি না, তাহা দেখিবার বিষয়। চাও দেখিয়াছেন কন্যাভ্রূণ হত্যা যে দুই দেশে সর্বাপেক্ষা বেশি ঘটে, তাহারা হইল চিন এবং ভারত। যে ২ কোটি ৩০ লক্ষ কন্যা ভূমিষ্ঠ হইবার আগে মরিয়াছে, তন্মধ্যে ৫১ শতাংশ চিনে, ৪৬ শতাংশ ভারতে।

বিশ্বের দরবারে আজ চিন এবং ভারতের কদর বাড়িলেও উন্নতির সূচকে দেশবাসীর মানসিকতা অন্তর্ভুক্ত হইলে দেখা যায়, ইহাদের উন্নতি ফাঁকা আওয়াজ মাত্র। দেশবাসীগণের মানসিকতা বিচারে চিন ও ভারত মোটেই উন্নতি করে নাই। এখনও দুই দেশে কন্যা অপেক্ষা পুত্র অধিক আদরণীয়। অমন ভাবনা, আর যাহাই হউক, আধুনিকতা নহে। সুতরাং, নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, চিন এবং ভারত এখনও মান্ধাতার যুগে পড়িয়া আছে। এই মানসিকতা ত্যাগ না করিলে, ভার্যাকে পুত্রসন্তান প্রসবের যন্ত্র ব্যতিরেকে অন্য কিছু না ভাবিলে, প্রকৃত আধুনিক এবং উন্নত হওয়া যাইবে না। শাসকবর্গ যে ধোয়া তুলসীপত্র, তাহা কেহ বলিবে না। তৎসত্ত্বেও এই ব্যাপারে কিন্তু শাসকের দোষ নাই। ভারতে অনেক কাল পূর্ব হইতেই কন্যাভ্রূণ হত্যা অপরাধ গণ্য হইয়াছে। তথাপি ওই নিন্দনীয় কার্য নির্মূল হয় নাই। সরকারের ভূমিকায় ত্রুটি না থাকিলে নাগরিকের আচরণে ত্রুটিটিই বড়। নাগরিক ছাড়া নাগরিককে তাহার ত্রুটি বুঝাইবে কে।