Advertisement
E-Paper

কুস্তির কৌশল ছেলেও ভাল শিখেছেন

ক থায় বলে, ধোবিপাট দাঁও। দঙ্গলের ভাষা। আমির খান অভিনীত ‘দঙ্গল’ ছবির কল্যাণে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসী নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন পঞ্জাব-হরিয়ানা–পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ-প্রধান অঞ্চলে দঙ্গলের অর্থ পালোয়ানি কুস্তির প্রতিযোগিতা।

শিবাজীপ্রতিম বসু

শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০১৭ ০০:০০
পুনরাগমনায় চ? ‘সাইকেল’ পেয়ে অখিলেশের সমর্থকদের উল্লাস। জানুয়ারি, ২০১৭। ছবি: পিটিআই

পুনরাগমনায় চ? ‘সাইকেল’ পেয়ে অখিলেশের সমর্থকদের উল্লাস। জানুয়ারি, ২০১৭। ছবি: পিটিআই

ক থায় বলে, ধোবিপাট দাঁও। দঙ্গলের ভাষা। আমির খান অভিনীত ‘দঙ্গল’ ছবির কল্যাণে আসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসী নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন পঞ্জাব-হরিয়ানা–পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ-প্রধান অঞ্চলে দঙ্গলের অর্থ পালোয়ানি কুস্তির প্রতিযোগিতা, যেখানে এক তুঙ্গ মুহূর্তে প্রতিযোগীকে কাঁধে তুলে মাটিতে ধোপার কাপড়ের মতো আছড়ে ফেলে দেওয়ার নাম ‘ধোবিপাট দাঁও’।

এ বারের উত্তরপ্রদেশ ভোটের প্রস্তুতিপর্বের তুঙ্গ মুহূর্তে সম্ভাব্য জোটসঙ্গী কংগ্রেসকে বিন্দুমাত্র ভাবতে না দিয়ে সমাজবাদী পার্টির (সপা) মুখ্যমন্ত্রী, মুলায়ম-পুত্র অখিলেশ যাদব যে ভাবে এক তরফা ১৯১টি আসনে সপা প্রার্থীদের প্রথম তালিকা প্রকাশ করেছিলেন, তাতে ইউপি মিডিয়ার অনেকেই ‘ধোবিপাট দাঁও’-এর ছায়া দেখতে পান। এখনও সপা-র ‘স্বঘোষিত’ সুপ্রিমো, একদা কুস্তিগির মুলায়ম সিংহ যাদবও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে অনেক বারই প্রতিপক্ষ, এমনকী সহযোগীদেরও বোকা বানিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, অখিলেশ দ্রুত এই বিদ্যা রপ্ত করেছেন। প্রথমে যাদবকুলের কোন্দলে কাকা শিবপাল, সৎমা সাধনা (রামায়ণী তুলনায়, ‘কৈকেয়ী’) ও অমর সিংহের (রামায়ণী তুলনায়, ‘মন্থরা’) ‘দুষ্ট ত্রয়ী’র বলয় ছিন্ন করে সপা-র নির্বাচনী প্রতীক ‘সাইকেল’-এর ‘মালিক’ হয়েছেন। দ্বিতীয় প্যাঁচে, কংগ্রেসের যুবরাজ, রাহুল গাঁধী ও তাঁর পারিষদবর্গকে হতভম্ব করে জোটে শামিল করেছেন। বাপকা বেটা!

জোটসঙ্গীদের মধ্যেই যদি এ হেন ‘দাঁও-প্যাঁচ’ চলে, তবে গোটা রাজ্যে প্রধান তিন প্রতিযোগী পক্ষ— সপা-কংগ্রেস জোট, ভারতীয় জনতা পার্টি ও মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির মধ্যে কোন স্তরের জটিল মারপ্যাঁচ, দড়ি টানাটানি চলতে পারে, তার পুরো হদিশ পাওয়া এই মুহূর্তে শিবের অসাধ্য! যদিও, ১২৭ কোটির দেশের অনেকেই এ বারের উত্তরপ্রদেশ ও পঞ্জাব বিধানসভার ভোটের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতি কোন ধারায় বইবে, এমনকী ২০১৯-এ লোকসভার ভোটে কোনও নতুন মোড় ঘুরবে কি না, তার অনেকটা স্থির করে দিতে পারে এই দুই রাজ্যের, বিশেষত উত্তরপ্রদেশের ফলাফল।

উত্তরপ্রদেশ কিন্তু আদতে বেশ কয়েকটি ‘অঞ্চল’-এর সমাহার— ব্রিটিশ ভারতের সংযুক্ত প্রদেশসমূহ বা ইউনাইটেড প্রভিন্সেস আজ উত্তরপ্রদেশ হয়েও ইউপি নামক সংক্ষিপ্ত পরিচয়টি বজায় রেখেছে। কয়েক বছর আগে রাজ্যের হিমালয়ের পাদদেশবর্তী অঞ্চল ভেঙে ‘উত্তরাখণ্ড’ নামে নতুন রাজ্য হয়েছে এবং অবশিষ্ট উত্তরপ্রদেশ রাজ্যটি এখনও ‘অবধ’ (অযোধ্যা/লখনউ), ব্রজ/হরিত প্রদেশ (আগ্রা/মথুরা-সহ পশ্চিমাঞ্চল), বুন্দেলখণ্ড (মধ্যপ্রদেশ লাগোয়া) ও পূর্বাঞ্চল (মুখ্যত, ভোজপুরিভাষী বালিয়া, জৌনপুর, গোরক্ষপুর প্রভৃতি)— এই সব আঞ্চলিক সংস্কৃতিতে বিভক্ত, রাজনৈতিক অনুভূতিতেও। এই চারটি অঞ্চল নিয়ে চারটি পৃথক রাজ্য গড়ার স্বপ্ন সাম্প্রতিক কালে মায়াবতী মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ফের চাগিয়ে উঠেছিল। ভোটদানের ক্ষেত্রেও এই আঞ্চলিকতার গুরুত্ব অপরিসীম।

এর সঙ্গে রয়েছে জাতপাত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাগাভাগি। খুব সাদামাটা ভাবে, ‘অন্য অনগ্রসর শ্রেণিগুলি’ বা ওবিসিভুক্ত মানুষেরই সংখ্যাধিক্য— ৩৯%, এর পরই বর্ণহিন্দু ২২%, তার ঠিক পরে দলিত/এসসি ২১.১%। এই বড় সংখ্যাগুলোর মধ্যেও আবার অজস্র ভাগাভাগি। যেমন, বর্ণহিন্দুদের ১০ শতাংশই ব্রাহ্মণ, তার পরই ক্ষত্রিয়/ঠাকুর ৮ শতাংশ। ওবিসির মধ্যে ৮ শতাংশ যাদব, আর দলিতদের মধ্যে ১১ শতাংশ অস্পৃশ্য। ধর্মীয় সম্প্রদায়গত ভাবে, সব জাতপাত-সহ হিন্দুরা ৭৯.৭৩ আর মুসলিমরা ১৯.৩। এর মধ্যে জাতপাত-বিভক্ত হিন্দু ভোটের নিম্নবর্গ ভাগ হয়ে যায় সপা (ওবিসিদের একটা বড় অংশ + যাদব জনভিত্তি) ও বসপা-র (অস্পৃশ্য/দলিত) মধ্যে। ব্রাহ্মণ ভোট আগে কংগ্রেস, পরে বিজেপি-র দিকে থাকলেও, কয়েক বছর আগে, মায়াবতী ব্রাহ্মণ-মুসলিম-ব্যাকওয়ার্ড (বিএমডব্লিউ) গাড়ির সওয়ার হওয়ার পর থেকে ব্রাহ্মণদের একটা অংশ ‘বহেনজি’র সঙ্গে আছেন। আর সপা-র সঙ্গে মুসলিমদের বড় অংশ। এর সঙ্গে আছে আঞ্চলিক সেন্টিমেন্টের অঙ্ক।

কিন্তু ২০১৪ সাল এই সব অঙ্ক ওলটপালট করে দেয়। মুজফ্ফরনগর দাঙ্গার পরে ও নরেন্দ্র মোদীর ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্নের উচ্ছ্বাসে উত্তরপ্রদেশের জনতা ৪২.৩% ভোট দিয়ে প্রায় সমস্ত অঞ্চল থেকে ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৭১টি আসন বিজেপির ঝুলিতে দেয়। বাকিদের জোটে ন’টি, তার মধ্যে আবার বিজেপির সহযোগী অনুপ্রিয়া পটেলের ‘আপনা দল’-এর দুটি আসন। এই কাটাকুটির ভোটের অদ্ভুত পরিণাম! ২০০৯-এর তুলনায় বিজেপির ভোট শতাংশে ২৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধিতে আসন বাড়ে আগের চেয়ে ৬১টি, তার চেয়ে ২০% ভোট কম পেয়ে সপা-র ভাগ্যে আসে ৫টি আসন এবং তার চেয়ে মাত্র ২.২% কম ভোট পেয়ে বসপা-র ঝুলি থাকে শূন্য! অন্য দিকে যথাক্রমে ৭.৫০ ও ১ শতাংশ ভোট পেয়ে কংগ্রেসের ও বিজেপি সহযোগী আপনা দলের দুটি আসন জোটে! অস্যার্থ, ‘আপনা দল’-এর ভোট ভিত্তি (নিজের যৎসামান্যের সঙ্গে বিজেপির বিপুল ভোট) খুব কম আসনে সীমাবদ্ধ, আর একটা আসন না পেলেও বসপা-র ভোট ভিত্তি সারা রাজ্যে ছড়ানো। এ কথাও জলের মতো পরিষ্কার যে, ২০১৪-তে মুসলিমদের ভোটের একটা ভাল অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল। এ বার তারা কী করবে? বস্তুত, এই লাখ টাকার প্রশ্নের উত্তরের ওপরে এ বার ইউপি ভোটের ফলাফলের অনেকখানি নির্ভর করছে।

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। যদিও মুসলিমদের একটি ভোট ‘ব্লক’ বা ‘ব্যাংক’ হিসেবে গণ্য করলে অতি বিপজ্জনক সরলীকরণের সমস্যা থেকে যায়, তবুও যথাযথ সংযুক্তি না হলে, সব দেশ ও কালেই ‘সংখ্যালঘু’দের সামাজিক ও রাজনীতির সার্বজনিক ক্ষেত্রে অনেকটা এক ছকে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা যায়। ফলে, গত বারে মোদীর পক্ষে, মুজফ্ফরনগর কাণ্ডের পরেও, মুসলিমদের বেশ খানিকটা অংশ বিজেপিকে ভোট দিলেও, এই আড়াই বছরে নানা ‘অসহিষ্ণুতা’র ঘটনা ঘটেছে। বিশেষত ইউপি-র দাদরি-তে, ঘরে ‘গোমাংস আছে’ সন্দেহে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে পিটিয়ে খুনের পর এবং ‘মোদী ম্যাজিক’ ইতিমধ্যেই অনেকটা ফিকে হয়ে যাওয়ায়, সেই ভোটের কতটা তারা নিজের দিকে রাখতে পারবে, সে ধন্দ থেকেই যায়।

এই ভোটের অধিকাংশ যদি অখিলেশের সপা-র কাছে ফিরে আসে, তবে মুলায়ম-পুত্রকে আমরা দ্বিতীয় বার লখনউয়ের মসনদে বসতে দেখব। যদি সপা-র কোন্দলে অসহায় হয়ে মায়াবতীর কাছে চলে যায় (লক্ষণীয়, দলিতদের পাশাপাশি বসপা এ বার প্রচুর পরিমাণে বর্ণহিন্দু ও মুসলিমদের প্রার্থী করেছে), তবে বহেনজির ‘কামব্যাক’ সম্ভব। আর যদি, মুসলিম ভোট সপা ও বসপা-র মধ্যে আড়াআড়ি ভেঙে যায় এবং বর্ণহিন্দু ও জাঠ-সহ ওবিসি ভোটের সিংহ ভাগ বিজেপির দিকে এককাট্টা থাকে, তবেই দীর্ঘ দিন পরে বিজেপির ফিরে আসার সম্ভাবনা। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ, পারিবারিক কোন্দল শেষে যাদব বংশের নতুন চালকটি, তাঁর বিপক্ষীয় শিবপাল গোষ্ঠীকে ‘টিকিট’ থেকে বঞ্চিত করেননি। ইঙ্গিত মিলছে, কাকাবাবুও ভাইপোর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধ যাদববাহিনীর সঙ্গে জোটসঙ্গী কংগ্রেসের ভোট ঠিকঠাক মিললে সপা-র বিজয় সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু যদি এই জোটে দারুণ ঘোঁট পাকে ও দলিতদের সঙ্গে বর্ণহিন্দুদের বড় অংশ এবং মুসলিমদের কিছুটা মায়াবতীর দিকে থাকে, বসপা জিতবে বা জয়ের কাছে চলে যাবে। তখন ম্যাজিক সংখ্যা থেকে সামান্য কিছু কম পড়লে, সপা + কংগ্রেসকে ঠেকাতে, সম্ভাব্য তৃতীয় স্থানে থাকা বিজেপি মায়াবতীকেই হয়তো সমর্থন করবে।

কিন্তু বিরোধীদের লাফালাফির আগেই, মোদী ও তাঁর অনুগামীদের মোকাবিলা করতে হবে বিজেপিরই মোদী-বিরোধী অংশের সঙ্গে। কেননা, পঞ্জাবে জোটের বড় সঙ্গী অকালিদের দুঃশাসনের কারণে এনডিএ-র পরাজয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। আর এর মধ্যে যদি উত্তরপ্রদেশে নাকাল হতে হয়, তবে ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মানুষটির ‘বুরে দিন’-এর কাউন্টডাউনও বড় তাড়াতাড়ি শুরু হয়ে যাবে।

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy