E-Paper

মাটিলিপ্ত, তবু দূরতর দ্বীপ

যখন ইশকুলের পড়া চলছে, পাশাপাশি অসংখ্য গল্পের বইয়ের সঙ্গে থাকা-বসা, শোয়া-খাওয়া, সে বয়সের পড়া মহাশ্বেতা আমার এমনই।

যশোধরা রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৯
বর্তিকা: নন্দীগ্রাম আন্দোলন চলাকালীন ধর্মতলার ধর্না মঞ্চে মেধা পাটকর (ডান দিকে) ও মহাশ্বেতা দেবী, কলকাতা, ১০ নভেম্বর, ২০০৭।

বর্তিকা: নন্দীগ্রাম আন্দোলন চলাকালীন ধর্মতলার ধর্না মঞ্চে মেধা পাটকর (ডান দিকে) ও মহাশ্বেতা দেবী, কলকাতা, ১০ নভেম্বর, ২০০৭।

সালটা ১৯৭৯-৮০ হবে। হাতে এসেছিল গল্পের গরু ন্যাদোশ নামে একটা বই। গল্পের গরু গাছে চড়ে, জানা ছিল। গরু যে ছাদেও চড়ে, জানা ছিল না। “ন্যাদোশের সম্পূর্ণ জীবনী লেখা সম্ভব নয়। ন্যাদোশ লিখে গেলে তা লেখা হতে পারত, কিন্তু ন্যাদোশ যদিও স্কুলের সব ক্লাসের পড়ার বই’ই খেয়েছিল (যেহেতু আমরা নজন ভাই-বোন আর আমি একা তখন কলেজে পড়ি, সেহেতু সব ক্লাসের পড়ার বইই বাড়িতে থাকত), ও কলম বা কালি খায়নি। কলম বা কালির প্রতি বিদ্বেষ বা সে বিষয়ে ভয় থাকলে লেখা যায় না। ন্যাদোশের লেখাটা হল না কলম খেল না বলে।”

ন্যাদোশ ছোট বয়সে যে পড়েনি, সে অনেকটা ছোটবেলা হারিয়ে বসে আছে। যখন ইশকুলের পড়া চলছে, পাশাপাশি অসংখ্য গল্পের বইয়ের সঙ্গে থাকা-বসা, শোয়া-খাওয়া, সে বয়সের পড়া মহাশ্বেতা আমার এমনই। এই অবিশ্বাস্য কৌতুক, প্রবল হাস্যরসের ধারাটি যাঁর কলম থেকে চুইয়ে পড়ে, আজ তাঁর একশো বছর হল। আমরা বাঙালি ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেললাম বিশুদ্ধ ‘উইট’-এর কলম, আমাদের ছবি-কবিতা-নাটক-সিনেমা ভরে উঠল প্রকৃত ভাঁড়ামোয়, এ দুঃখ কোথায় রাখা যায়?

অথচ মহাশ্বেতা দেবী নামটি আমাদের মনের মধ্যে টেনে আনে এক প্রবল শ্রদ্ধা, গাম্ভীর্যের ছবি। লেখক-সমাজকর্মীর এই মেলবন্ধনটির আদিনারী মহাশ্বেতার চিত্র এত বড় হয়ে আছে আজও। তাঁর কলমে আঁকা ছবিটি জনজাতি জীবনের কল্পতরুর আদিকল্প। দীর্ঘ পথের শেষে পাশে ধুলোমুঠি, ছোট নুড়ির মতো থাকে সাহিত্য অকাদেমি বা জ্ঞানপীঠ বা ম্যাগসেসাই পুরস্কার। তিনি বলেন, রামায়ণ-মহাভারতের রথী-মহারথীদের হাতে নানা চমৎকার নামের অস্ত্র উঠিয়ে দেওয়া হলেও আসলে পদাতিক সৈন্যরা হাতেপায়ে লড়ে জীবন দিয়েই রচেছেন সমস্ত যুদ্ধ, আর মেয়েরা বিধবা হয়ে বা পুত্রহীনা হয়ে (কুরুক্ষেত্রের পরে)। তিনি আমাদের নিত্যকার ছড়ায় ‘আমকাঁঠালের ছায়া দেব’ থেকে পৌঁছে যান কৌম জীবনের পারস্পরিক ভাগ করে নেওয়ার কথায়। এক টেলিভিশন-সাক্ষাৎকারে বলেন, জনজাতি মানুষের কাছে তথাকথিত সভ্যতাকে ‘নিয়ে যাওয়া’ এক হাস্যকর প্রস্তাব, কারণ যাঁদের লিঙ্গসাম্য থেকে বাকি সব রকম উন্নত মূল্যবোধ আছে, তাঁদের কাছে আমাদের এই সভ্যতার দেওয়ার কিছুই নেই।

জনজাতির কথা, পদাতিক মাটির মানুষদের কথা, এমনকি ছোটদের জন্য লেখা তাঁর গল্পেও সহজ কথাচ্ছলে আসে। সেখানেও, জমিদার জোতদারদের অত্যাচার লিখতে তাঁর কলম কাঁপেনি। প্রতিটি অক্ষর থেকে চুইয়ে পড়েছে মানবিক, সুরসিক, মেধাবী, ‘কমন সেন্স’-এর ভরপুর আলো। তবু আমরা তাঁর বিশালত্ব নিয়েই বেশি বিস্ময়াহত। এই কর্মক্ষমতা ধরা-ছোঁয়া যায় না। এই ব্যাপ্তি, বৈচিত্র, কলমের দার্ঢ্য সহজে কল্পনা করা যায় না। নিরাভরণ, ভানহীন, তবু মহাশ্বেতা দূরতর দ্বীপের মতো, আলোকবর্তিকা।

মহাশ্বেতা সেই অবাক প্রজন্মের মানুষ, ঋত্বিক ঘটকের ভাইঝি আর শচীন চৌধুরীর ভাগ্নি। মা ধরিত্রী দেবী জয়শ্রী-র মতো অগ্রগামী পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। আর পিতা কবি, লেখক ‘যুবনাশ্ব’ মণীশ ঘটক, স্বদেশি উকিলের পেশা গ্রহণ করেছেন। দু’জনের থেকেই সমাজের দায়বদ্ধতার পাঠ রক্তে চারিয়ে গিয়েছে। ঢাকার ইডেন মন্টেসরির ইংরেজিয়ানার উপর দেশজ ও আন্তর্জাতিক উপাদানে ঠাসা বিশ্বভারতীর প্রগাঢ় পরত, পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের দান। এমন ঋদ্ধ জীবন ক’জনের ছিল তখন? পালিশ দেওয়া হিরের মতো যাঁর জীবন, তিনি রসবোধে টইটম্বুর একটা ‘অন্যরকম ছোটবেলা’র অধিকারিণী, আবার মানবসভ্যতার সংগ্রামের আগুন তাঁর শিরায়।

হাজার চুরাশির মা কী ভাবে ভুলব? উত্তাল নকশাল রাজনীতির মুখোমুখি মাতৃত্ব আর পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। তবে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে, প্রতিটি নিপীড়িত অত্যাচারিত মেয়েকে শেষ পর্যন্ত জিতিয়ে দেওয়ার কী ভীষণ দুর্দম তাড়না লেখকের। আশাই এখানে প্রবল চালিকাশক্তি। ‘সিনিক’ নৈরাশ্যবাদ, যা আমাদের আর এক ক্ষয়চিহ্ন এই সময়ের— তা যেন ধুলোর মতো ঝুরঝুর করে ঝরে যায়। ‘লছমনের মা’ গল্পের গঙ্গা বা ‘দ্রৌপদী’র দোপদি মেঝেন অবিস্মরণীয় তাই, ইশকুলের সিলেবাস, কলেজের সিলেবাস থেকে মনের সিলেবাসে ঠাঁই পাওয়া। ভুলি না ‘স্তনদায়িনী’-র যশোদা, ‘সাঁঝ সকালের মা’-এর জটি ঠাকুরনি, ‘বাঁয়েন’-এর সাধনের মা, খেটে খাওয়া মেয়ে গিরিবালা, যার দু’টি মেয়ে বিয়ের ছলে পাচার হয়ে বেশ্যা হয়ে গিয়েছিল বলে সে ক্রোধে ত্যাগ করেছে তার স্বামীকে। “ছেড়ে চলে যায় কে? কোন মেয়েছেলে? সবাই নিশ্চিত হল যে আউলাচাঁদ নয়, গিরিবালা মেয়েটি আসলে মন্দ। এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে তবে সবাই কী স্বস্তি যে পেল, তা কী বলি!”

অরণ্যের অধিকার তো সেই মহাকাব্যিক বিস্তারে ইতিহাস। মহাশ্বেতার লেখক সত্তার প্রথম দিন থেকে যে টান মাটিতে লিপ্ত থাকা মানুষের ইতিহাসের দিকে, তা আমাকে কৌতূহলী করে। গোড়া থেকেই হারানো সময়ের ভিতরে স্নাত, যখন হননি আগুনপাখি। সে দিন থেকেই, তলদেশ থেকে দেখা বিপরীত ইতিহাস রচনার ব্রতটি নিচ্ছিলেন। একের পর এক রচনায় খনন চালিয়ে পুনরুদ্ধার করে নিয়ে আসতে চাইছিলেন উপনিবেশিতের বিকল্প ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যের ভূগোলকে নিয়ে যাচ্ছিলেন বহু অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ডে, মিথ ও ফ্যান্টাসির যৌথ প্রয়োগে আখ্যানকৌশলে নিয়ে আসতে চাইছিলেন নানা অভিনবত্ব।

উত্তর-ঔপনিবেশিক আখ্যানকার তাই লুপ্ত করে দেওয়া দমিত, নিষ্পেষিত, অদৃশ্য বয়ান বানান, ক্ষমতার স্বরকে উপরিতল থেকে চেঁছে ফেলে দিয়ে। তৈরি করেন ক্ষমতাহীনদের জন্য নতুন বয়ান। অন্ত্যজের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে লেখায় এনেছেন, যেমন তাঁর সামাজিক ভূমিকাতেও। এ কাজ করতে লেখায় তিনি ফর্মের দিক থেকেও নতুন কিছু খুঁজেছেন। এনেছেন মৌখিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদান, প্রবাদ, উপকথা, নীতিকথা, অতিরঞ্জন, ইতিহাস, কিংবদন্তি, অতিলৌকিককে। কাজটা তিনি শুরু করে ফেলেছেন ঝাঁসীর রাণী-তে (১৯৫৬)। ব্যবহার করেছিলেন অতিকথা: ‘পতথর মিট্টীসে ফৌজ বনাই, কাঠ সে কটোয়ার;/ পাহাড় উঠাকে ঘোড়া বনাই, চলি গোয়ালিয়ার।” কৃষকদের মুখ থেকে তিনি অতিকথা কুড়িয়ে নেন।

পাথর কেটে মূর্তি বানানোর কারিগর জানেন, পাথরের দার্ঢ্য হল বাধা বা সীমিতি। আর তাকে কুঁদে কাটা হল তাঁর সম্ভাবনা। বাধাটা কী? ইতিহাসের যুগ-যুগ বাহিত পক্ষপাত ক্ষমতার দিকে। ঝাঁসীর রাণী বইয়ের গোড়াতেই ইতিহাস নির্মাণের অসুবিধার বিষয়টি উঠে এসেছে। “সিংহাসন সেদিন যাদের ছিল, কলমও ছিল তাঁদের অধিকারে। তাই তাঁরা যা লিখে গিয়েছেন, যা যেমনভাবে শিখিয়ে গিয়েছেন, তাই আমরা পড়েছি, শিখেছি এবং দেখেছি।” কিংবা, “তবু ইতিহাসের সত্য অত সহজে অবলুপ্ত হয় না। ভারতের যে-যে স্থানে এই অভ্যুত্থান ঘটেছিল সেখানকার মানুষ তাকে কি ভাবে গ্রহণ করেছিল তার নজির পেয়েছি লোকগীতি, ছড়া এবং প্রচলিত বিবিধ কাহিনীতে। স্থানীয় লোকদের অনেকেই আজও রাণীর মৃত্যু অস্বীকার করে। আজও ঝাঁসীর রাণী স্থানীয় গাথা আর কিংবদন্তীর মাধ্যমে জীবিত।” দু’টি উদ্ধৃতিই ঝাঁসীর রাণী (১৯৫৬) বই থেকে।

পরেও, ১৯৫৭ সালের নটী আর ১৯৭৭ সালের অরণ্যের অধিকার। চলন সেই ইতিহাস। রচিত ইতিহাস আর বয়ে যাওয়া ইতিহাসের সংঘাত। ইংরেজ সুপারিনটেন্ডেন্ট চাইছেন চাপিয়ে দিয়ে রেকর্ড তৈরি করতে। আর সেই চাপিয়ে দেওয়ার বিপরীতে ফুলেফেঁপে উঠতে চাইছে মানুষের বয়ান।

এর পাশাপাশিই তিনি জীবনযাপনেও লড়াকু। অল্প বয়সেই আন্দোলনের আগুনে নিজেকে ঢেলে দেওয়া এই মেয়ে, নিজের পথ নিজেই কেটে নিচ্ছেন তখন। একের পর এক চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। মাথার উপরের সুনিশ্চিতির ছাদ হারিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্বাসের জেরেই। লিখছেন পেটের দায়ে। তাই প্রথম দিন থেকেই বেখাপ্পা, অতি আলোচিত/সমালোচিত। নতুন নারীবাদীদের পাশেও মহাশ্বেতা অবিশ্বাস্য রকমের উজ্জ্বল। শেষ দিন অবধি তিনি ঠোঁটকাটা, তাঁর সমসময়ের ভাষায়, ‘জাঁদরেল, জাঁহাবাজ’। মনে পড়ে, সাড়ে চুয়াত্তর ছবির পিছনে বিজন ভট্টাচার্যের কলম, সকৌতুকে বলে ‘বাত্তিওয়ালা মেয়ে’দের কথা। সে সময়ের ব্যতিক্রমীদের কথা।

আমাদের চোখে পিতৃতন্ত্রের ঠুলি, মনের ভিতর সন্তানকে ফেলে যাওয়া মা, বা স্বামীকে ছেড়ে আসা স্ত্রীর পুরনো স্টিরিয়োটাইপ। অথচ সৃষ্টিশীল পুরুষের জন্য সংসার, স্ত্রী, সন্তানকে উপেক্ষা আমাদের কাছে মিথোপম, নায়কোচিত— নিন্দনীয় নয়।

তবু এই ‘ডবল স্ট্যান্ডার্ড’ হেরে যায় মহাশ্বেতার সামনে। এক উজ্জ্বল তীব্র আলোতে চোখ-ধাঁধানো, কিন্তু আটপৌরে শাড়ি-পরা মানুষটি বইমেলার প্রাঙ্গণে খেড়িয়া শবরদের পাশে বসে তাদের তৈরি ঝুড়ি বা কুলো বিক্রি করছেন। সেই দেখাটুকু আমার দু’চোখে এখনও লেগে আছে। অমেয় প্রাপ্তি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Birth Centenary

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy