E-Paper

আশা ও আশঙ্কার দোলাচল

সংস্কৃতিকেন্দ্র ছায়ানট ও উদীচী-তে হামলা, প্রথম সারির দুই সংবাদপত্র অফিসে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের চেষ্টার সময় কট্টরপন্থীরা কিন্তু ধর্মের তোয়াক্কা করেনি।

তূর্য বাইন

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬

আজকের বাংলাদেশ যেন এক আগ্নেয়গিরি, কখন কোন রোষের উদ্গিরণ হবে, অনুমান করা দুরূহ। ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদির মৃত্যুর প্রেক্ষিতে পর পর দু’জন হিন্দু যুবক খুন এবং আর এক ব্যবসায়ীর অগ্নিদগ্ধে মৃত্যু হয়েছে, নিরীহ মানুষের দোকান-বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রায় প্রতি দিনই ঘটছে। লক্ষ্য মূলত হিন্দুরা। কট্টর মৌলবাদীরা যে কত নৃশংস, দীপুচন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে হত্যার সময় তাদের উল্লাস থেকে স্পষ্ট। এই হিংসা দেখার পর সে দেশে বসবাসকারী হিন্দুরা যে ভয় ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তা বলার নয়। তবে আক্রমণের শিকার শুধু হিন্দু বা খ্রিস্টানরাই নন, মুক্তমনা মুসলমানরাও রোষানল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। বিএনপি নেতার বাড়ির দরজা বন্ধ করে অগ্নিসংযোগে সপরিবার হত্যার চেষ্টা, অগ্নিদগ্ধ হয়ে সাত বছরের শিশুর মৃত্যু সে দেশের প্রগতিশীল মুসলমানদেরও রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

সংস্কৃতিকেন্দ্র ছায়ানট ও উদীচী-তে হামলা, প্রথম সারির দুই সংবাদপত্র অফিসে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের চেষ্টার সময় কট্টরপন্থীরা কিন্তু ধর্মের তোয়াক্কা করেনি। সংস্কৃতি কেন্দ্রগুলোর ভারত-যোগ, সংবাদপত্রগুলিও ভারতপন্থী, এমন ধারণাই নাকি কট্টরপন্থীদের ওই দুষ্কর্মে প্ররোচিত করেছে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ভারত-বিদ্বেষ যে সে দেশে মৌলবাদীদের কাছে সমার্থক, তা স্পষ্ট। তাই হিন্দুদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের, উদারপন্থী বা ভারতপন্থী বলে দেগে দেওয়া রাজনৈতিক কর্মী, শিল্পী-সাহিত্যিক চিন্তকেরাও চরম আতঙ্কে।

বাংলাদেশ এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, ঘটনাগুলি একান্ত ভাবেই সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটাও অনস্বীকার্য যে, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের নানা প্রান্তে থাকা বাঙালি হিন্দুর এক বিরাট অংশ দেশভাগের পর ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে ধারাবাহিক ভাবে উদ্বাস্তু হয়ে এ দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তবে এঁদের অনেকেরই নিকটজন আজও বাংলাদেশে রয়ে গিয়েছেন। দেশভাগের সময়ে ভৌগোলিক ভাবে ভারত ভূখণ্ডের অধিবাসী বাঙালিরাও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে, ভাষা ও সংস্কৃতির অভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন। তাই বাংলাদেশের এই অরাজকতার অভিঘাত ভারতেও বোঝা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা জায়গায় প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন বহু মানুষ, কলকাতা ও দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও ভাবান্তর দেখা যায়নি, মৌলবাদী ধর্মান্ধদের কথা ছেড়েই দেওয়া যাক।

অনেকেরই অভিযোগ, উগ্র ভারত-বিরোধিতা ও উপর্যুপরি হিন্দু নিগ্রহের ঘটনায় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও তেমন কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক ভাবে কিছুটা নিঃসঙ্গ ভারত হয়তো এই মুহূর্তে আপাত-বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বিদ্বিষ্ট করে আর নতুন শত্রু সৃষ্টি করতে চাইছে না। যদিও এই একতরফা বন্ধুতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই কমবেশি সন্দিহান।

বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ নতুন নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা ও পাকিস্তানপন্থী রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যে অগণিত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করে, তাঁদের বড় অংশ ছিলেন হিন্দু। যে মেয়েরা ধর্ষিতা হন, যাঁদের সর্বস্ব লুট করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, যে লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তাঁরাও প্রধানত হিন্দু ছিলেন। ভারতের সার্বিক সহযোগে বাংলাদেশ নামে যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, অনেকেই আশা করেছিলেন, সেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুরা হয়তো সুরক্ষিত থাকবেন। অনেক শরণার্থী ভারত সরকারের দেওয়া রেশন, তৈজসপত্রের সঙ্গে বুক ভরা আশা নিয়ে নিজভূমে ফিরেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সে স্বপ্ন পূরণ তো হয়ইনি, স্বাধীন বাংলাদেশে যত বার রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, প্রতি বার হিন্দুদের উপর নেমে এসেছে ভয়াবহ আক্রমণ। ফলে পরবর্তী কালে তাঁদের অনেকেই ফের ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

শতাংশের বিচারে নগণ্য হলেও এখনও যে হিন্দু জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে থেকে গিয়েছেন, সেই সংখ্যা উপেক্ষণীয় নয়। ভারতে সিএএ ২০১৯-এর সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে খ্রিস্টান শিখ বৌদ্ধ পার্সি জৈন-সহ যে হিন্দুরাও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, শুধু তাঁরাই এ দেশে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ তার পরে যাঁরা ভারতে এসেছেন এবং এখনও যাঁরা বাংলাদেশে আছেন, সেই হিন্দুদের জন্যে ভারতের দ্বার পাকাপাকি ভাবে রুদ্ধ। এই আইনে মুসলমান আশ্রয়প্রার্থীর— তা তিনি যত বড়, প্রগতিশীল বা ভারতপন্থীই হোন এবং যখনই ভারতে আসুন না কেন— নাগরিকত্ব পাওয়ার সংস্থান নেই।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিপন্নতা অমূলক নয়। আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে কট্টরপন্থীদের অতীতযোগ কারও অজানা নয়। নতুন সরকার যে ধর্মীয় ও নীতিগত ভাবে সংখ্যালঘুদের রক্ষায় সদর্থক ভূমিকা নেবে, তেমন আশা কম। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হয়তো অতীতের মতোই ভারতের ভূমিকা-নির্ভর; অন্যথায় প্রকৃত দায়িত্বশীল নেতৃপ্রজন্মের অপেক্ষা করতে হবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh general election dhaka

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy