E-Paper

সংস্কৃতির ভণ্ডামি ও ন্যাকামি

বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলা, আর বাংলা বললেই অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য এবং তীব্র বিরোধিতার অভাব প্রমাণ করে দিয়েছে, সংস্কৃতির কথা বলা আর বাঙালির মানায় না।

ঈশানী দত্ত রায়

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৫:০০

আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া দেশদ্রোহ কী করে হয়, এই প্রশ্নে টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দায় এক তথাকথিত নেতা মুখ ফুলিয়ে বিকৃত স্বরে এ কথা বলার সাহস পান যে, “রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তা বললে তো হবে না, বাবা!” এবং, বৃহত্তর বাঙালি সমাজ চোখ নামিয়ে বসে থাকে।

এক জন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ আচমকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম টেনে এনে বলেন, “অমর্ত্য সেন তো বটেই রবীন্দ্রনাথও এসআইআর-এর চোখে সমান।”

তখন কী মনে হয়?

মনে-টনে হয় না। এটাই বাস্তব।

মাথায় থাকুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম এবং আর যাঁদের নাম করে আমরা সংস্কৃতির বড়াই এবং ন্যাকামি করে এসেছি এ যাবৎ— ক্ষমতার অশালীন বহিঃপ্রকাশ, মূর্খের দম্ভ, গুন্ডা গোত্রের লোকদের যা ইচ্ছা তা বলার নিয়মিত অভ্যাস, টাকা নাচিয়ে শিল্পীদের ‘যা বলব তাই করবি’ গোছের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, এবং তার সামনে মেরুদণ্ডহীন নীরবতা, সরকারি পুরস্কারপ্রাপকদের বড় অংশের গলে পড়ার নাম বাঙালির সংস্কৃতি।

অসমে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া যখন রাষ্ট্রদ্রোহ বলে গণ্য করা হল, তখন এই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির নীরবতা (গুটিকয়েক মানুষ বাদ দিলে) প্রমাণ করে দিয়েছে— আবার বলছি, প্রমাণ করে দিয়েছে যে— সংস্কৃতির কথা বলা বাঙালির আর মানায় না।

বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলা, আর বাংলা বললেই অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য এবং তীব্র বিরোধিতার অভাব প্রমাণ করে দিয়েছে, সংস্কৃতির কথা বলা আর বাঙালির মানায় না।

গান শোনা, সাহিত্য পড়া-ই শুধু সংস্কৃতির পরিচয় নয়। ভদ্রতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, সহ নাগরিকের অধিকারকে সম্মান জানানো, অন্যের কাছ থেকে ভাল জিনিসটি গ্রহণের শিক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহনাগরিকের প্রতি ব্যবহার— সবই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর আমাদের দৈনন্দিন যাপন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ‘সংস্কৃতি’ শব্দটা থেকে আমরা বহু দূরে এবং স্বেচ্ছায় চলে এসেছি। কারণ একেবারে ব্যক্তিস্বার্থে ঘা না-পড়লে আমাদের কাছে কোনও আঘাতই আঘাত নয়। ধর্ষণ আমাদের কাছে বহু দিনই ছোটখাটো ব্যাপার (আর জি করের ঘটনা নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশকে রাস্তায় নামিয়েছিল ঠিকই, এবং এখনও অনেকেই লড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বৃহত্তর সমাজ দিব্য অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে); গুন্ডার অসভ্যতাকে আমরা ‘দুষ্টুমি’ বলে মেনে নিতে শিখে গিয়েছি; দুর্নীতি আমাদের কাছে বিষয়ই নয়, বরং ‘টাকা খাচ্ছে খাক, রাস্তা তো করে দিচ্ছে’ গোছের ভাবধারায় আমরা নিজেদের ঢুকিয়ে নিতে পেরেছি— ফলে ওই সব ‘রবীন্দ্রনাথ-টবীন্দ্রনাথ’ আমাদের দেখাতে আসবেন না।

কারণ, আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ট্র্যাফিক সিগনালে বাজাব আর ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’-এর কথা বদলে দেওয়ার স্পর্ধা দেখাব।

কারণ, আমরা ‘বঙ্কিমদা’ বলব, এবং বাংলা উচ্চারণের মাথায় বাড়ি দিয়ে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছ’টি স্তবককে জাতীয় গীত করে দেব এবং পরিকল্পিত ভাবে তা জাতীয় সঙ্গীতের আগে গাইতে বলব, কারণ তা আমার সাম্প্রদায়িক মানসিকতায় ব্যবহার করা সহজ হবে।

শাসক এগুলো অনায়াসেই ভাবে, এবং করে। কারণ সে জানে, এক জন বাঙালি অনায়াসে বিকৃত উচ্চারণে ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গাইবেন, যেখানে এক জন অ-বাংলাভাষী তা গাইতে চেষ্টা করবেন বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে রাজনীতির পদচারণ এবং তা কুক্ষিগত করার চেষ্টা নতুন নয়। কিন্তু দু’দশক আগেও যা ধিক্কারযোগ্য বলে গণ্য হত, যা প্রকাশ্যে বলা অসভ্যতা এবং মানবতাবিরোধী বলে গণ্য হত, আজ সেই সব কথাই উচ্চৈঃস্বরে বলা এবং প্রতিষ্ঠা করাই রেওয়াজ। যেমন রেওয়াজ মেনে নেওয়া। সরকার শিল্পী বা বিশিষ্ট জনকে সম্মান জানাবে, কিন্তু তা যেমন আনুগত্য কেনার অস্ত্র হবে না, তেমনই পুরস্কার পেলাম বলে প্রতিবাদের মুখ বন্ধ করে শরীর নুইয়ে ফেলব, তা-ও হবে না। অথচ সেগুলোই এখন রীতি। অভ্যাস। শাসকের এবং নাগরিকের।

আমাদের অধিকাংশের চর্চা বা প্রতিবাদ মূলত দল-রং ভিত্তিক। শাসক যেমন তাতে অভ্যস্ত, তেমন নাগরিকও সহনাগরিকের প্রতিবাদ দেখলেই প্রশ্ন করেন, “আগে চুপ ছিলেন কেন? তখন তো কিছু বলেননি? তবে তো আপনি অমুক দলের।”

সর্বস্তরে রাজনীতি, গুন্ডামি, তোলাবাজি, টাকা ছড়ানোর সংস্কৃতিতে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ ঘটেছে আমাদের। বিবেক, বোধ জলাঞ্জলি দেওয়াই আমাদের সংস্কৃতি। পরস্পরের পৃষ্ঠকণ্ডূয়ন, ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে দুর্নীতি, নাগরিক সমাজে নেই? রাজনীতির কারবারিরা তো বুঝেশুনেই সেই ছিদ্র দিয়ে কাল-অজগর ঢুকিয়েছেন, আর সেই নাগপাশে কিছু অংশের নাগরিকের আত্মসমর্পণ ঘটেছে। সংস্কৃতি? কোথায়?

ধর্মের নামে নানা রকম অত্যাচার আমরা করে থাকি এবং সহ্য করি। দুর্গাপূজা হোক বা বাবা লোকনাথ, ডিজে বক্স বাজিয়ে উদ্দাম নৃত্য আমাদের একমাত্র ধর্মাচরণ। ‘এই হনুমান কলা খাবি’ বলতেও আমরা ইদানীং ভয় পাই, কারণ বজরঙ্গবলীর চেলারা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। শিব থেকে গণেশ সবাই পেশিবহুল মাচো সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে ওঠেন আচমকাই, দুর্গা নিরামিষের ঠেলায় অস্থির। তাতে কী?

বাংলা ভাষাচর্চা যখন নিত্যনতুন অশালীন শব্দের উদ্ভাবনে ব্যবহৃত হয়, এবং তা অনায়াসে বলা ও চলচ্চিত্রে তার ব্যবহার যখন প্রগতিশীলতা; ‘ওরা তো বাঙালি নয়, মুসলমান’, এই অশিক্ষার বিশ্বাস যখন সযত্নে লালনপালন করা হয়; শাসকের তরফে বাংলা ভাষার বিকৃতি যখন স্রেফ মিম হওয়ারই উপযুক্ত বলে আমরা বিবেচনা করে থাকি; মেয়ে নয়, ‘মেয়েছেলে’ বলতে যখন আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি; মহিলাদের নানা অঙ্গ ব্যবহার করে গালি দেওয়া আমাদের ওষ্ঠস্থ; সমপ্রেমী নয়, বলি সমকামী, বলি মগা; মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার উল্লাস প্রকাশ করি বইপত্র কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে— তখন দয়া করে সংস্কৃতির কথা বলতে আসবেন না। হাসি পায়।

বলতেই পারেন, “আপনি কে যে, বাঙালিকে সংস্কৃতি নিয়ে এত জ্ঞান দিতে এলেন? বাঙালি সংস্কৃতির ঠিকা নিয়েছেন নাকি?” সবিনয়ে বলি, কেউ-ই নই, এবং জ্ঞান বিতরণের স্পর্ধাও নেই।

শুধু এইটুকুই বলা— বর্ণপরিচয় পড়া, রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা, উত্তমভক্ত, পুরী যাওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালিদের এক জনের এই লেখা, যে আয়নার সামনে দাঁড়ালে এই সব প্রশ্ন দেখতে পায় এবং আয়নার অবয়বটি ক্রমেই অ্যামিবার রূপ ধারণ করে। এবং নিজের অবনমনে যার এখনও কান্না পায়।

পুনশ্চ: বলা হয়নি সেই অ-দেখা তরুণীর মোক্ষম বাক্য, রাজা বদলানো প্রসঙ্গে ঘরোয়া কথাবার্তায় যিনি বলেছিলেন, “রাজা বদলালেই বা কী হবে? প্রজারাই তো বদলে গিয়েছে।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics Bengali Culture West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy