E-Paper

‘সে বড়ো সুখের সময় নয়’

আধুনিক প্রযুক্তি, বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তা সংস্কৃতি এই মানসিক দুর্বলতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে।

সৈকত সরকার

শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৪

আসক্তি শব্দটি দীর্ঘ দিন ধরে সমাজে একটি নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে এসেছে। সাধারণ ভাবে এটি মদ, মাদক বা ধূমপানের মতো কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাসের সঙ্গেই যুক্ত। কিন্তু ডেমিয়ন থম্পসন তাঁর দ্য ফিক্স: হাউ অ্যাডিকশন ইজ় টেকিং ওভার ইয়োর ওয়ার্ল্ড গ্রন্থে এই সঙ্কীর্ণ ধারণার বাইরে গিয়ে আসক্তির এক বিস্তৃত সামাজিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আসক্তি আজ আর শুধু মাদকের সমস্যা নয়— এটি আধুনিক জীবনের কাঠামোর মধ্যেই গভীর ভাবে প্রোথিত। থম্পসনের মূল বক্তব্য, মানুষ সব সময় যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং সে তাৎক্ষণিক লাভ, সুখ বা স্বস্তির দিকে বেশি ঝোঁকে। আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন ও ওপিওয়েড সিস্টেম তাৎক্ষণিক সুখ বা স্বস্তির অনুভূতিকে বার বার ফিরে পেতে উৎসাহিত করে। ফলে আমরা ভবিষ্যতের ক্ষতির কথা জেনেও বর্তমানের সামান্য আনন্দকে বেছে নিই। আচরণবাদী অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় প্রেজ়েন্ট বায়াস।

আধুনিক প্রযুক্তি, বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তা সংস্কৃতি এই মানসিক দুর্বলতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘লাইক’, ফাস্ট ফুডের অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি, অনলাইন কেনাকাটার তাৎক্ষণিক তৃপ্তি— সবই এক ধরনের ‘ফিক্স’। এগুলো সামান্য আনন্দ দেয়, কিন্তু সেই সামান্য আনন্দই বার বার ফিরে পাওয়ার লোভ তৈরি করে। এগুলো মূলত ভেরিয়েবল রিওয়ার্ড সিস্টেম— অর্থাৎ এর ব্যবহারে কখন ফল মিলবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে বার বার ফিরে আসতে বাধ্য করে; ঠিক যেমন জুয়ার মেশিন কাজ করে। এই ফিক্স সাময়িক আনন্দ দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা অভ্যাসে পরিণত হয়, এবং ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে মানুষ। এক বার কোনও অভ্যাস গড়ে উঠলে, সেটি আর যুক্তি দিয়ে নয়, প্রায় স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করে। তখন মানুষ আর সচেতন ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না; সে শুধু অভ্যাসের পথে হাঁটে।

এই প্রেক্ষাপটে থম্পসন আসক্তিকে কোনও অনিবার্য রোগ হিসাবে দেখেন না। তিনি মনে করেন, এটি মূলত একটি আচরণগত সমস্যা, যা নির্দিষ্ট পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং সেই পরিবেশ বদলালে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণযোগ্যও হতে পারে। মানুষের আচরণ বহুলাংশে নির্ভর করে চয়েস আর্কিটেকচার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশের উপরে। যদি পরিবেশ এমন হয় যেখানে প্রলোভন সর্বত্র, তবে আত্মসংযম ব্যক্তির একার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে আসক্তিকে দীর্ঘস্থায়ী মস্তিষ্কজনিত রোগ হিসাবে দেখে, সেখানে থম্পসন দেখান যে, আসক্তি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি সামাজিক প্রভাব, ডিজ়াইন, এবং বাজারের প্রণোদনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আসক্তিকে শুধুই রোগ হিসাবে ধরা হয়, তবে সমাধান খোঁজা হবে হাসপাতাল, ওষুধ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রে। অন্য দিকে প্রশ্ন উঠবে— আমাদের সমাজ কি এমন কাঠামো তৈরি করছে, যা মানুষকে ক্রমাগত ভুল সিদ্ধান্ত নিতে ঠেলে দিচ্ছে? এই দায়িত্ব তখন শুধু ব্যক্তির নয়; নীতি নির্ধারক, কর্পোরেট সংস্থা এবং রাষ্ট্রের উপরও বর্তায়। ভারতের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে ‘ফিক্স’-এর বিশ্লেষণ বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। ডিজিটাল ইন্ডিয়া, অনলাইন শিক্ষা, ই-কমার্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার এক দিকে যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্য দিকে তেমনই বাড়িয়ে তুলেছে এগুলির প্রতি অতিনির্ভরতা। শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনলাইন গেমিং আসক্তি, তরুণদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াজনিত মানসিক চাপ, বা অতিভোগবাদ— এ সবই আধুনিক ‘ফিক্স’-এর উদাহরণ।

বর্তমান বাজারব্যবস্থা মূলত মানুষের মনোযোগ ও অভ্যাসকে পণ্যে পরিণত করেছে। স্ক্রিনে যত বেশি সময় কাটে, কেনাকাটা ও ক্লিক যত বাড়ে, মুনাফাও তত বৃদ্ধি পায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় অ্যাটেনশন ইকনমি— যেখানে মানুষের মনোযোগই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

সব সিদ্ধান্ত পুরোপুরি স্বাধীন নয়; অনেক সময় মানুষ সীমিত বিকল্পের মধ্যে আটকে পড়ে। তাই চিকিৎসা ও সহানুভূতি অপরিহার্য। তবু দ্য ফিক্স আমাদের শেখায়, আসক্তি মোকাবিলার জন্য একমুখী সমাধান যথেষ্ট নয়। চিকিৎসার পাশাপাশি দরকার মানুষের সামনে বেছে নেওয়ার জন্য ইতিবাচক বিকল্পের বাস্তুতন্ত্র তৈরি করা— শিশুদের জন্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের সীমা, ক্ষতিকর খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিতে নৈতিকতার শৃঙ্খলা, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ কমানোর উদ্যোগ। আচরণবাদী অর্থনীতির ভাষায় এগুলো নাজ— যা মানুষকে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে না, কিন্তু ভাল সিদ্ধান্তের দিকে আলতো ঠেলে দেয়।

আধুনিকতা কি আমাদের জীবনকে সত্যিই মুক্ত করেছে, না কি নতুন ধরনের অদৃশ্য শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলেছে? স্বাধীনতা মানে শুধু পছন্দের সুযোগ নয়— বরং এমন পরিবেশ, যেখানে ভাল পছন্দ করা সম্ভব। একুশ শতকের ভোগবাদতাড়িত সভ্যতায় এই প্রশ্নগুলো বার বার করে যাওয়া প্রয়োজন। আসক্তিকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা চিকিৎসার বিষয় হিসাবে না দেখে, সমাজ ও বাজার ব্যবস্থার দর্পণে নিজেদের মুখ দেখা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন, চার পাশের দুনিয়া যখন প্রতিনিয়ত আমাদের মনোযোগ দাবি করে, ‘সে বড়ো সুখের সময় নয়’।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Damien Thompson

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy