দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি নিয়ে বেশ কিছু দিন আইনি লড়াই চলল। ফন্দি আঁটলেন ছোট ভাই। তাঁর নাবালিকা মেয়ের সঙ্গে অভব্যতাকরেছেন বড় ভাই— মিথ্যে অভিযোগ করলেন থানায়। সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হলেন বড় ভাই। যুক্ত হল পকসোর ধারা। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হল। তদন্ত শেষে জানা গেল পুরো বিষয়টাই ভুয়ো।
যুগলের প্রেম ভাঙল। যুবতী থানায় গিয়ে যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার যুবক। বহু দিন বাদে জামিন পেলেন। উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে কেসও দাঁড়াল না। তত দিনে যুবকটি সামাজিক ভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন ওঠে, ভারতীয় আইনে কি ভুয়ো মামলাকারীরা আইনের আওতায় পড়েন না? কেন তাঁদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু হয় না, সাজা পান না?
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি থানায় গিয়ে কোনও অপরাধের অভিযোগ করলে, পুলিশ এফআইআর গ্রহণে বাধ্য। তবে, মিথ্যা মামলাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ জেনেশুনে নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনেন, তবে তাঁর সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৯৮এ ধারার মামলার মধ্যে প্রায় ৬-৭% মামলা পুলিশ তদন্তে ভিত্তিহীন, ভুল তথ্য বা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে বন্ধ হয়েছে। এই মামলায় ও পকসোয় সাজার হার যথাক্রমে প্রায় ১০-১৫% ও ৩৫-৪০%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষদের উপর অত্যাচার প্রতিরোধ আইনে দায়ের হওয়া মামলার সাজাপ্রাপ্তির হার ৩২%-এর মতো।
পরিসংখ্যান বলছে, তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা শেষাবধি আদালতে প্রমাণ করা যায় না। এর একাধিক কারণ। মিথ্যা মামলা দায়েরও তার মধ্যে একটি কারণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের মতো গুরুতর ক্ষেত্রেও প্রায় ৮-১৫% মামলা তদন্তে মিথ্যা বলে চিহ্নিত হয়েছে, এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও পাল্টা মামলা হয়েছে, তবে সংখ্যা খুবই কম। মাদক নিয়ন্ত্রণের আইনের অপব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। আইনজীবীবৃন্দ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তের ব্যাগ বা গাড়িতে মাদক উদ্ধার দেখানো, তল্লাশির সময় আইনি প্রক্রিয়ায় সাক্ষীর উপস্থিতি (ধারা ৫০-এর অধিকার) ঠিকমতো না মানা, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা স্থানীয় প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার হিসাবে এই আইন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে পাঁচ কোটিরও বেশি মামলা বিচারাধীন। একটি ফৌজদারি মামলা শেষ হতে প্রায়ই আধ থেকে এক দশকের মতো সময় লাগে। দীর্ঘ সময়ের কারণে ভুয়ো অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা করা হয় না, ফলে আইনের ভয় অনেকটাই কমে যায়। মামলায় দোষ প্রমাণিত না-হলেই অভিযোগকারীকে শাস্তি দেওয়া হয়— এমন তো নয়। প্রমাণ করতে হয় তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা বলেছেন, যা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। তখন অনেক ক্ষেত্রে যাঁর বিরুদ্ধে ভুয়ো মামলা হয়েছিল, তিনিও নতুন মামলা করতে চান না। সময়, অর্থ, মানসিক চাপের কারণে পিছিয়ে আসেন। ফলে সমাজে ধারণা রয়েছে যে ভুয়ো মামলা করলেও বাস্তবে বড় শাস্তি না-ও হতে পারে। আইন স্পষ্ট ভাবে মিথ্যা অভিযোগকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ সীমিত। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা করা হয় না, অথচ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ দিন সামাজিক অপমান, আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
কোনও অভিযোগ আদালতে ইচ্ছাকৃত ভাবে বলা মিথ্যা হিসাবে প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে ফৌজদারি মামলা শুরু এবং নির্দোষ ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক ক্ষতিপূরণ আবশ্যিক হওয়াই উচিত। যাতে সামাজিক অপমান, আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির প্রতিকার হয়। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেফতারের আগে প্রাথমিক প্রমাণ যাচাইয়ের স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকা উচিত, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ দায়ের মানেই গ্রেফতার— এই প্রবণতায় আইনের অপব্যবহারের সুযোগ বাড়ে। তদন্তে ইচ্ছাকৃত গাফিলতি বা মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভুয়ো মামলাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির বিধান এবং দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন প্রয়োজন। কারণ ভুয়ো মামলা এক ব্যক্তির স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক সম্মান, পেশাগত ভবিষ্যৎ এবং ব্যক্তিগত জীবনকেও বিপর্যস্ত করে। এমন চললে প্রকৃত অপরাধের ঘটনাকেও তো অবিশ্বাসের চোখে দেখা হতে পারে। তাই আইনের প্রকৃত ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন আইন অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি নিরপরাধের সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)