E-Paper

আস্থা হারানোর দিনে

পরিবারের অসহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, আর্থিক ও সামাজিক পুঁজির অভাব, ইত্যাদির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ করে রাজনৈতিক দলের মহিলাকর্মীরা তবু দলের কাজ করে যান রাজনীতিকে ভালবেসে।

প্রমা রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ০৮:০৩
হতাশ: নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলাকর্মীরা, রানাঘাট, ৪ মে।

হতাশ: নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলাকর্মীরা, রানাঘাট, ৪ মে। প্রণব দেবনাথ।

গত কিছু বছর ধরে গবেষণার সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মহিলাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। তাঁদের কেউ দল বা প্রশাসনে উচ্চপদে আসীন, কেউ মূলস্তরের কর্মী, কেউ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ক্ষমতাসীন দলের পাশে থাকেন, কেউ রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। এই কয়েক বছরে তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের কিছু বিবর্তন প্রত্যক্ষ করারও সুযোগ হয়েছে।

সংখ্যার অনুপাতে ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে মহিলাপ্রার্থী ও জনপ্রতিনিধিরা এখনও নগণ্য। পরিবারের অসহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, আর্থিক ও সামাজিক পুঁজির অভাব, ইত্যাদির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ করে রাজনৈতিক দলের মহিলাকর্মীরা তবু দলের কাজ করে যান রাজনীতিকে ভালবেসে। কখনও দিনবদলের, শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে, কখনও ‘দিদি’র রাজনৈতিক লড়াইকে সম্মান জানিয়ে, আবার কখনও বা হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা রাজনীতির ময়দানে লড়ে যান। তাঁদের একটা সমান্তরাল বোঝাপড়াও চালিয়ে যেতে হয় দলের ভিতরে, দলে দীর্ঘপ্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে। এঁদের মধ্যে কেউ দলে কাঙ্ক্ষিত পদ পান, কেউ পেয়েও হারান, আবার কেউ বৈষম্যের অভিঘাতে বসে যান। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী পরাজয়ের পর অশ্রুতপূর্ব অস্তিত্বসঙ্কটের কালে তাঁরা কেমন থাকেন? পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর পূর্বতন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মূলস্তর ও মধ্যবর্তী স্তরের কয়েক জন কর্মী ও নেত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল সম্প্রতি। সকলেরই নাম পরিবর্তিত হয়েছে এখানে।

দলসম্পর্কিত যাবতীয় ক্ষোভ সরিয়ে রেখে নির্বাচনী প্রচারে অক্লান্ত পরিশ্রম করা থেকে শুরু করে ভোটের দিন ও গণনার দিন দায়িত্ব পালন করার পর যখন দেখেন যে দলের গঠনতন্ত্র দ্রুত ভেঙে পড়ছে, কেমন লাগে? দলের মূলস্তরের কর্মী শ্রাবন্তী সেন তাঁর অসন্তোষ ও হতাশার কথা ব্যক্ত করলেন। তাঁর অভিমত, এসআইআর-এ তৃণমূল সমর্থকদের নাম বাদ যাওয়া, কম মার্জিনের বুথগুলিতে ভোটগণনায় কারচুপি, ও পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতি, ইত্যাদি কারণেই তাঁর দলের পরাজয় হয়েছে ও সংগঠনে চিড় ধরেছে। তাঁর এলাকায় দলের মনোনীত প্রার্থীকে স্থানীয়েরা মানতে পারেননি, জানালেন শ্রাবন্তী।

প্রায় একই মত পোষণ করেন শ্রাবন্তীর মতোই দীর্ঘদিনের মূলস্তরের কর্মী ও পঞ্চায়েত জনপ্রতিনিধি হাসি মুর্মু। দলের পত্তনের সময় থেকেই দলে থাকা হাসি জানালেন, ভোটাররা তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবে সম্মান করলেও তাঁদের কেন্দ্রে মনোনীত ‘বহিরাগত’ প্রার্থীর বিরোধিতা করেছিলেন: ‘নেতারা কি আমাদের এলাকার কাউকে পেলেন না?’ অনুমান করা যায় যে প্রার্থী-বাছাই প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আইপ্যাক-নির্ভরতা দলের নির্বাচনী ভরাডুবির একটি কারণ। এ ছাড়াও নারী-সুরক্ষার অভাব, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, ইত্যাদিও আছে।

নির্বাচনী পরাজয়ের পর চারিদিকে দলের জনপ্রতিনিধিরা যখন পালিয়ে যাচ্ছেন, রাস্তায় মার খাচ্ছেন বা গ্রেফতার হচ্ছেন, তার মধ্যে দলের মহিলা-সদস্যরা কি অসুরক্ষিত বোধ করেন? উত্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। পুরপ্রতিনিধি সুনেত্রা ঘোষাল কোনও কথাই বলতে চাইলেন না, শুধু জানালেন যে তিনি অন্যত্র রয়েছেন ও রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছেন। প্রবীণ পুরপ্রতিনিধি মালতী ঘটক বললেন, “যারা বেরোচ্ছে না ভয়ে বেরোচ্ছে না, অনেক কীর্তিকলাপ করেছে তো!” তিনি নিজে অবশ্য নিয়মমতো তাঁর ওয়র্ডে বেরোচ্ছেন ও পরিষেবা দিচ্ছেন বলে জানান। আর এক জন পুরপ্রতিনিধি সঞ্চয়িতা সরকার জানালেন, ভোটের ফল বেরোনোর পর তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছিল, এবং আপাতত ওয়র্ডে পরিষেবা দিলেও তিনি ও তাঁর অনুগামীরা ‘ঝড় আসলে মাথা নিচু করে’ থাকার চেষ্টা করছেন। এই কর্মীরা দলের বিপর্যয়কে নিজের নিজের মতো করে বুঝতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত হতাশার সঙ্গে মিশেছে ভোট প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাস, ‘অনুগত ভোটব্যাঙ্ক’ মহিলাদের পার্টি থেকে সরে আসা নিয়ে আত্মসমীক্ষা ও সর্বোপরি উচ্চ নেতৃত্বের প্রতি অভিমান-মিশ্রিত আবেগ।

“এত দিন বড় দায়িত্ব না দিয়ে এখন ওঁরা ডাকছেন মহিলা সংগঠন দেখতে, কিন্তু আমরা বলে দিয়েছি, পার্টির কোনও পোস্ট নেব না”, বললেন শ্রাবন্তী। তাঁর মতো পুরনো কর্মীরা পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন অপেক্ষাকৃত নতুন ও অনভিজ্ঞদের দিনের পর দিন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে দেখে তাঁর উপলব্ধি। বাড়িতে হামলা হওয়ার পরেও মহিলা সংগঠনের এক নেত্রী ছাড়া উচ্চ নেতৃত্বের কেউ সঞ্চয়িতার কোনও খোঁজ নেননি। মালতী জানালেন, ভোটের পর তাঁর মতো পুরপ্রতিনিধিদের সঙ্গে দলের কোনও মিটিং ডাকা হয়নি (তখনও পর্যন্ত)। গভীর খেদের সঙ্গে জয়নাব বলেন, “আমি কিন্তু দলের সুসময়ে সম্মানটা পাইনি। মাইনরিটিকে উঠতেই দেওয়া হত না, মাইনরিটি ছিল দলের ভোটব্যাঙ্ক। ঝামেলা হলে ওরাই লড়াই-ঝগড়া করবে এ রকম ভাবা হত।” হাসি তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরলেন, দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা স্থানীয় স্তরের দুর্নীতির কথা, গ্রামের রাস্তা তৈরির উপকরণ নিয়ে এসে এলাকার জনপ্রতিনিধির নিজের বাড়ির কাজে ব্যবহার করার কথা। এলাকার দুর্নীতির কথা দলের উচ্চস্তরে জানানো সত্ত্বেও কোনও লাভ না হওয়ার হতাশার কথা। পার্টিতে জনজাতিভুক্তদের দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্ব, তবু হাসি বলেন, “আমি এসটি মানুষ, অনেস্ট মানুষ, টাকাপয়সা দিতে পারি না দলকে, তাই আমাকে বঞ্চিত হতে হয়।”

কিন্তু, যাকে দেখেই মূলত দল করতে আসা, সেই দিদির নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কি এখনও অটুট? সাংবাদিক রুহি তেওয়ারি তাঁর সাম্প্রতিক বই হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য ফিমেল ভোটার ইন মডার্ন ইন্ডিয়া (২০২৫)-এ দেখিয়েছেন, ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে মহিলা ভোটার ও সমর্থকদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারা নেতৃবৃন্দের মধ্যে কয়েকটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন, বাস্তববাদী কর্মসূচি গ্রহণ করার ও মহিলাদের কাছে সহজবোধ্য রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করার ক্ষমতা। নেত্রী মমতার দীর্ঘ লড়াই, সাদামাঠা জীবনযাপনের ভাবমূর্তি ও জনমুখী প্রকল্প দেখে তাঁকে ‘নিজের মতো’ মনে করে দল করতে আসা কর্মী সুমিতা মনে করেন, নিচুস্তরের চুরি-দুর্নীতি আটকাতে তাঁর অধীন নেতাদের ‘মায়ের মতন’ শাসন করতে না পারার কারণেই দিদিকে চলে যেতে হয়েছে।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো বহুলচর্চিত ও অনেকাংশে সমাদৃত প্রকল্প সত্ত্বেও এ বারে মহিলারা দলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন কেন? “মহিলাদের সমর্থন আমরা ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু দেখা গেল, মহিলাদের উপর অত্যাচার, বিশেষত অভয়ার ঘটনা মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি নিজেও মেনে নিতে পারিনি। এলাকার লোকজন জিজ্ঞাসাও করেছিল, ‘দিদি, এটা কেন হল?’” জানালেন হাসি। দলের প্রাক্তন সমর্থক আশালতা ঘরামি বলেন, সন্তানের কাজের অভাব, শাসক দলের স্থানীয় (মহিলা) পুরপ্রতিনিধির ঔদ্ধত্য ও দুর্নীতি, শিশুধর্ষক জাতীয় অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তিবিধান না-হওয়া দেখে দলের উপর আস্থা হারানোর কথা।

ভারতের রাজনৈতিক দলীয় সংস্কৃতিতে গণতান্ত্রিকতার অভাব বহু-আলোচিত। ফলে ধরে নেওয়া যায়, নির্বাচনী পরাজয়ের পর দলের মহিলা-সদস্য ও সমর্থকদের ক্ষোভ জানানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে নেতৃবৃন্দের তুলনায় এই কর্মীদের ভূমিকা অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত হয়। অথচ, দলের আদর্শ ও নেতার রাজনৈতিক রূপকল্পনাকে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এঁদের ভূমিকা অপরিহার্য। প্রদীপ ছিব্বর ও রাহুল বর্মা তাঁদের গবেষণায় বলেছেন ‘ভোট মোবিলাইজ়ার’ রূপে রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকা। দলের সুসময়ে ও দুঃসময়ে পাশে থাকা কর্মীদের কাছে দল হল পরিবারস্বরূপ। মহিলাকর্মীদের কাছে সেই পরিবারে অন্তর্ভুক্তি আবার নিজের পরিবারের সঙ্গে লড়াই করে অর্জন করা।

তাই ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও সহজে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন না অনেকেই। সুমিতা যেমন বললেন, “যাঁদের জন্য খেটেছি, তাঁরা কিন্তু রাজা হয়ে গেলেন, আমি পড়ে রয়েছি সেখানেই। দল ছাড়তে চাই না, তবে আমাদের দাদা (স্থানীয় নেতা) যদি বিজেপিতে যান, একমাত্র তা হলেই হয়তো যাব।” পরবর্তী রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাকাঠামো কি মহিলাকর্মীদের প্রতি সংবেদনশীল হবে? উত্তর সময়ের গর্ভে।

রাজনীতি বিভাগ, ক্রিয়া ইউনিভার্সিটি

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy