ঘটনাটা প্রায় ৬ বছর আগের। উত্তরপ্রদেশের হাথরস জেলার বুলগারি গ্রামে ঘটনা। দলিত শ্রেণির এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে সেই গ্রামের ঠাকুর পরিবারের চার জন পুরুষ। সেই ঘটনারই ডকু-সিরিজ় মুক্তি পেয়েছে। আইএমডিবি-তে ৯.২ রেটিং পেয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এই সিরিজ়। যখন এই ঘটনা ঘটে সেই সময় দেশে অতিমারি চলছে। তবু ঘটনার গুরুত্ব এতটাই গভীর ছিল যে, সারা দেশে যেন হইচই ফেলে দেয়। এই ডকু-সিরিজ়ের পরিচালক প্যাট্রিক গ্রাহাম ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ভারতে রয়েছেন। এই ঘটনার সময়ও ভারতেই ছিলেন প্যাট্রিক। প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে এটি তৈরি করতে। এই ছ’বছরে কী কী পরিবর্তন হয়েছে সেই গ্রামে? সেই সব নিয়ে আনন্দবাজার ডট কমের মুখোমুখি ‘হাথরস ১৬ ডে’-এর পরিচালক প্যাট্রিক গ্রাহাম।
প্রশ্ন: হাথরসের মতো একটি বহুল আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সাহস আপনি পেলেন কোথা থেকে?
প্যাট্রিক: আসলে আমি সাহসটা পেয়েছি এই সিরিজ়ে যাঁরা আমাকে সাহায্যে করেছেন, সেই তনুশ্রী পাণ্ডে, নিধি সুরেশ ও অমিত ভাটনগরের মতো সাংবাদিকদের দেখে। ওঁরা আমার সিরিজ়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়াও এই ঘটনার সময় যে স্থানীয় সাংবাদিক প্রথম ওই নির্যাতিতার ভিডিয়োটি তুলেছিলেন। আমার মনে হল, ওঁরা যদি করতে পারেন, তা হলে আমি পারব না কেন? আমার কিসের পিছুটান? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ঘটনাটি বিতর্কিত। আপনার রাজনৈতিক বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন, মানতে তো হবেই যে, জাতপাতের মতো একটা সমস্যা তো দেশে রয়েছে! আর এই ধরনের সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন। শুধু তা-ই নয়, এই সব সমস্যার পাশে দাঁড়ানোও দরকার।
প্রশ্ন: হাথরসের ঘটনার পরেই কি বিষয়টা জানতে পেরেছিলেন?
প্যাট্রিক: হ্যাঁ। অতিমারির সময় আমি ভারতে ছিলাম। তাই আমি সেই সময় থেকে ঘটনাটি জানতাম। খবরে দেখেছিলাম, যেটা খুব স্পষ্ট মনে ছিল। রাতের অন্ধকারে যে ভাবে জোরজবস্তি মেয়েটির মৃতদেহের শেষকৃত্য হয়, তখনই বুঝেছিলাম ঘটনাটি কতটা স্পর্শকাতর। সেটা নাড়া দিয়েছিল আমাকে। তাই যখন এপিক টিভি আমার কাছে প্রস্তাবটি নিয়ে আসে, তখনই রাজি হয়ে যাই।
প্রশ্ন: ঘটনার প্রায় ৬ বছর পর এই তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় আপনি যখন হাথরসে গেলেন, তখন আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
প্যাট্রিক: হুমমম (দীর্ঘ নিঃশ্বাস)। এই প্রথম বার আমি ভারতের গোবলয়ে গেলাম। এই প্রথম বার আমি উত্তরপ্রদেশের কোন ছোট গ্রাম, কিংবা হাথরসে মতো জায়গায় গেলাম। আমার কাছে নতুন ধরনের একটা অভিজ্ঞতা। দেখুন, আমি এমন একটা দেশ থেকে এসেছি যেখানকার সমাজব্যবস্থা মোটের উপর উদারপন্থী ও প্রগতিশীল। তাই এমন কোনও জায়গা দেখলে খানিকটা অবাকই হই, যেখানে মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে দেখা হয়। এখনও এই গ্রামে মহিলাদের বাড়িতে থাকার নিদান দেওয়া হয়। স্বাধীন ভাবে রাস্তায় তাঁরা চলাফেরা করতে পারেন না, মুখে ঢেকে বেরোতে হয়।
প্রশ্ন: ঘটনার পর প্রায় ছয় বছর কেটে গিয়েছে। এত বছর পরে পরিস্থিতি কি কোনও ভাবে বদলেছে সেখানে?
প্যাট্রিক: দেখুন, আমি এই বিষয়ে বিশারদ নই। তবে আমি জানি, নিম্নবর্গের মানুষদের রক্ষা করার জন্য প্রশাসন রয়েছে, আইনকানুন রয়েছে। কিন্তু এ সবের পরেও সমস্যা কিন্তু রয়ে গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের গ্রামে এখনও জাতিভেদ প্রথা রয়েছে পুরোদস্তুর। এ গুলো তো মধ্যযুগীয় ব্যাপার! যদিও অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি নাকি আগের তুলনায় ভাল হয়েছে। কিন্তু, যেটুকু হচ্ছে সেটাও হওয়া উচিত নয়। এই ধরনের ঘটনা তো ‘অন্ধকারআচ্ছন্ন যুগ’কেই ডেকে আনছে। ভারতের মতো উন্নয়শীল দেশে এটা হওয়া উচিত নয়। রাজস্থানেও এই ধরনের নানা খবর শোনা যায়। আসলে সমস্যাটা আরও গভীরে। কারণ, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণ জড়িয়ে। এ ছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভোটব্যাঙ্ক জড়িয়ে। তবে যে কোনও সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি আশাবাদী।
প্রশ্ন: আপনি তো ব্রিটিশ, ভারতের কোন জিনিসটা আপনাকে আকর্ষণ করে?
প্যাট্রিক: ইংল্যান্ড ভীষণ একঘেয়ে, গতেবাঁধা জীবন। যদিও লন্ডন আমার খুব পছন্দের এবং সেখানে আমার খুব সুন্দর একটা জীবন রয়েছে। কিন্তু ভারতের মানুষ প্রাণশক্তিতে ভরপুর। অনেক ধরনের বৈচিত্র রয়েছে। এখানে সবসময় কিছু না কিছু হচ্ছে। ভারতীয় সংস্কৃতি সমৃদ্ধ। এই দেশে ভীষণরকম বৈপরীত্য রয়েছে। এক দিকে, যেমন মেট্রো রয়েছে, ঝাঁ চকচকে শহরে রয়েছে, তেমনই শহরতলি কিংবা গ্রামের দিকে করুণ অবস্থাটাও দেখতে পাওয়া যায়। দেখে মনে হয়, সময় যেন থমকে গিয়েছে সেখানে। তবে আমি সব সময় ভারতীয়দের মধ্যে আতিথেয়তা দেখেছি, দুর্দান্ত সব মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। আমার মতে ভারতীয়রা আরও ভাল নেতা পাওয়ার যোগ্য যাঁরা ভবিষ্যতে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: বুলগারি গ্রামে মহিলাদের কি কিছু বদল চোখে পড়ল?
প্যাট্রিক: আসলে বুলগারি খুবই সাবেকি ধরনের গ্রাম। ওই গ্রামে সবার সঙ্গে কথা বলা যায় না এখনও। মহিলারা মূলত চাষবাসে সাহায্য করেন। যদিও গ্রামটা কিন্তু ছবির মতো সুন্দর। তবে দারিদ্রের ছায়া রয়েছে, এখনও সেখানে ভাল কোনও স্কুল নেই, শৌচকর্মের বন্দোবস্ত নেই।
প্রশ্ন: এই তথ্যচিত্রের শুটিং চলাকালীন কি কোনও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হয়েছিল, যা আপনাকে বিচলিত বা বিস্মিত করেছিল?
প্যাট্রিক: আমি হাথরসে গিয়ে প্রথম বার এমন কিছু মানুষ দেখলাম যাঁদের ধর্ষণের মতো বিষয়ে কোনও ধারণা নেই। এমনকি, এই ঘটনায় অভিযুক্তের পরিবারের সঙ্গে যত বার আমরা কথা বলতে গিয়েছি, অদ্ভুত ব্যবহার পেয়েছি। যদিও আমাদের কাছে অনুমতি ছিল। তাও অভিযুক্তের পরিবার বার বার তেড়ে এসেছেন। কথা বলতে চাননি। অনেক সময় উদ্ধত আচরণও করেছেন। আবার যে হোটেলে আমরা ছিলাম সেখানে দেখেছি, জনাছয়েক লোক বন্দুক পাশে রেখে খাওয়া-দাওয়া করছে। প্রকাশ্যে সেটা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলো দেখে অবাক হয়েছি বৈকি।
প্রশ্ন: এক জন বহিরাগত পর্যবেক্ষক হিসেবে ভারতকে একটি দেশ এবং সমাজ হিসেবে আপনি কী ভাবে দেখেন?
প্যাট্রিক: হ্যাঁ, আমি নিজে প্রগতিশীল মানসিকতার মানুষ, বামমনস্ক। আমি মনে করি, সরকারের কাজ জনগণের পরিষেবা দেওয়া। পুলিশের উচিত বাছবিচার না করে মানুষকে সাহায্য করা। এটা ভেবে খুব দুঃখ হয়, একটা তরুণীকে এ ভাবে প্রাণ দিতে হল! স্থানীয় প্রশাসনের আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিত ছিল। কেউ তো জানতেই পারলেন না মেয়েটার সঙ্গে কী হয়েছিল। ঘটনার পরে উপযুক্ত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এই ভারতকে দেখে অস্বস্তি হয়। তবে আবার যেটা বলতেই হবে, সব দেশের মধ্যে কিছু না কিছু সমস্যা থাকেই।
প্রশ্ন: ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার কী মত?
প্যাট্রিক: আমি জানি এটা বলে সমস্যায় পড়ব কি না! আমি সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টিকে দেখলাম, তারা যে ভাবে যুবসম্প্রদায়কে সঙ্ঘবদ্ধ করছে, সেটা দারুণ। যুবসম্প্রদায়ই তো সমাজ বদলাতে পারে। তাঁরা যে যে কারণে লড়ছে সেগুলি খুব যথাযথ বিষয়। দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে এগিয়ে এসে দায় নেওয়া উচিত ছিল। এই জন্যই বলছি, এ দেশের মানুষের আরও ভাল নেতা পাওয়া উচিত।
প্রশ্ন: এই সিরিজ়টি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দর্শকদের কাছ থেকে এতটা সাড়া পাবে বলে আশা করেছিলেন? এতে কি আপনি অবাক হয়েছেন?
প্যাট্রিক: সত্যি বলতে, প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম। এতটা ইতিবাচক সাড়া পাব ভাবিনি। আসলে এখানে আমরা কোনও সরকারের সমালোচনা করতে চাইনি। আমরা একটা সিস্টেমের সমস্যা তুলে ধরেছি, জাতিভেদ প্রথার সমস্যা তুলে ধরেছি। ঈশ্বরের কৃপায় কোনও ধরনের সেন্সরের মুখে পড়তে হয়নি এখনও, তেমনও বিতর্কও হয়নি, সেটাই রক্ষে। তবে তথ্যচিত্রটা করতে সময় লেগেছে বিস্তর। কারণ, অনেক ধরনের অনুমতির প্রয়োজন ছিল।