E-Paper

বৈষম্যের বিষফল

ইতিহাসের নিরিখে দেখলে, ভারতে নারী অধিকারের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এসআইআর যেন রাষ্ট্রের এক বিপরীতমুখী অবস্থান।

শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

নির্বাচন কমিশন যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চালাচ্ছে তাতে ভোটার তালিকায় লিঙ্গবৈষম্য প্রকট হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ঘনিয়েছিল গোড়াতেই। বিহারে এসআইআর-এর প্রথম পর্বে ধরা পড়েছিল যে, কমিশনের শর্তগুলি পূরণ করা মেয়েদের পক্ষে দুঃসাধ্য। দ্বিতীয় পর্বে আরও নানা রাজ্যের থেকে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তাতে সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নানা সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজস্থান, কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত ও তামিলনাড়ু, কেবল এই ছ’টি রাজ্যেই অন্তত তেইশ লক্ষ মহিলা বাদ পড়েছেন, যাঁরা আগে ভোটার তালিকায় ছিলেন। এর ফলে ভোটার তালিকায় পুরুষের অনুপাতে মহিলা কমেছে। আগে এই ছ’টি রাজ্যের ভোটার তালিকায় প্রতি হাজার পুরুষ-পিছু ৯৭৯ মহিলা ছিলেন, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৬৩ মহিলা। গুজরাত, পশ্চিমবঙ্গ এবং রাজস্থান, এই তিনটি রাজ্যের প্রতিটিতে পাঁচ লক্ষেরও বেশি মহিলাকে বাদ দিয়েছে এসআইআর। এমনকি যে দু’টি রাজ্যে ভোটার তালিকায় মেয়েদের অনুপাত ছিল বেশি, সেই কেরল এবং তামিলনাড়ুতেও লক্ষাধিক মহিলা বাদ পড়েছেন। উত্তরপ্রদেশের তথ্য এলে পুরুষ-মহিলার সংখ্যায় ফারাক আরও বড় হবে, সে সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই কি সংশোধনের পথ? এই মেয়েদের বিপুলতর অংশই যে প্রকৃতপক্ষে ভারতের নাগরিক, তাঁদের ভোটাধিকার খারিজ করলে যে তাঁদের প্রতি অন্যায় করা হয়, তা কি নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ মানছে? এর দ্বারা রাষ্ট্র কি এক বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের অংশীদার ও সমর্থক হয়ে উঠছে না? মেয়েদের স্কুল পাশের নথি, জমির মালিকানার নথি প্রভৃতি না-থাকার শাস্তি মেয়েদেরই দিচ্ছে রাষ্ট্র। দ্বিগুণ অন্যায়ের ক্ষত বইছেন মেয়েরা।

ইতিহাসের নিরিখে দেখলে, ভারতে নারী অধিকারের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এসআইআর যেন রাষ্ট্রের এক বিপরীতমুখী অবস্থান। নবজাগরণের উষালগ্ন থেকে দেখা যায়, মেয়েদের প্রতি সমাজ ও পরিবারের বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রতিকারের জন্য সরকারের দ্বারস্থ হয়েছেন সংস্কারপন্থীরা। বিধবা হিন্দু মেয়েদের জীবনের অধিকার, মেয়েদের শিক্ষার অধিকার, নাবালিকা-বিবাহ প্রতিরোধ, বিবাহিত মেয়েদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার— প্রতিটি বিষয়ে সমাজের মূলধারার মতের বিপরীতে গিয়ে সরকার আইন করেছে। লিঙ্গ-অসাম্যে দূষিত এক সমাজে দাঁড়িয়ে ভারতের সংবিধান সাম্যের অধিকারকে মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণা করেছিল। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে সংসদ অবধি মেয়েদের জন্য আসন সংরক্ষণ রাজনীতিতে সেই সমতা আনার রাষ্ট্রীয় প্রয়াস। এমন নয় যে মেয়েদের প্রতি হিংসা, বঞ্চনার ধারাকে প্রশাসন প্রশ্রয় দেয়নি। তা করা হয়েছে নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে— আইনকে অকেজো রেখে, বিচারে বিলম্ব করে, অপরাধীকে প্রশ্রয় দিয়ে। আইন মেয়েদের জন্য যে দরজা খুলেছে, তা বন্ধ করেছে প্রশাসনিক শিথিলতা, দলীয় রাজনীতির দাদাগিরি, সমাজ-পরিবারের সাবেকিয়ানা।

এসআইআর-এ রাষ্ট্রের স্বনির্মিত এক প্রক্রিয়ার অতি-সক্রিয়তায় বিপন্ন হচ্ছেন মেয়েরা। দুঃস্থ, স্বল্পশিক্ষিত, পরিবার-উপেক্ষিত মেয়েদের সক্ষমতা তৈরির পরিবর্তে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে, তাঁদের ‘অ-নাগরিক’ বানাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। একেই তো কন্যাসন্তানের প্রতি বিরূপতার জন্য ভারতের জনসংখ্যায় মেয়েদের অনুপাত কম। তদুপরি জনসংখ্যায় প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের চাইতেও ভোটার তালিকায় মেয়েদের উপস্থিতি কম। এত বৈষম্য সত্ত্বেও গত কয়েক দশকে মেয়েরা ভোটদাতা হিসেবে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, নির্বাচনী ফলকে প্রভাবিত করেছিলেন। যার ফলে প্রায় প্রতিটি শাসক দল মেয়েদের জন্য বিশেষ প্রকল্প, সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি মহিলা সদস্য বাড়াতে তৎপর হয়েছে। মেয়েদের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিকে খর্ব করে দিল এসআইআর।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Kerala Tamilnadu Uttar Pradesh Bihar Gujarat Election Commission of India

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy