অত্যন্ত নিন্দনীয় কিছু কার্যকলাপের তথা একটা গুরুতর সাইবার অপরাধের বিহিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসক নিজেই যদি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, তাহলে আর বিহিত করবে কে? ক্রোধে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যে ঘটনা ঘটালেন আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক, তা শুধু বেআইনি নয়, তা ভয়ঙ্করও। যে গণপ্রহারের সংস্কৃতি আজ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে গোটা ভারতের, সেই সংস্কৃতিতে বিশ্বাসীদের জোরদার উৎসাহ জোগানোর মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ওই প্রশাসনিক কর্তা।

আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক নিখিল নির্মলের স্ত্রী নন্দিনী কৃষ্ণণকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত আপত্তিকর এবং অশালীন ভাষায় আক্রমণ করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে বিনোদ নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। বিনোদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটা অত্যন্ত গুরুতর, সংশয় নেই। যে জঘন্য অভিযোগটা উঠেছে, তা শ্লীলতাহানির অভিযোগের সামিল, সন্দেহ নেই। কী হওয়া উচিত ছিল বিনোদের সঙ্গে? সুনির্দিষ্ট আইনে তাঁর বিচার হওয়া উচিত ছিল। অপরাধ প্রমাণ হলে কঠোর শাস্তি তাঁর প্রাপ্য ছিল। সেই আইনি প্রক্রিয়া এ বার কোন পথে বা কী ভাবে এগোবে, অনেকেই আর বুঝতে পারছেন না। কিন্তু আইনের শাসনে বিশ্বাসী প্রত্যেক নাগরিক বুঝতে পারছেন, আইনি প্রক্রিয়া ঠিকমতো শুরু হওয়ার আগেই সাংঘাতিক বেআইনি এক কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। সে কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন খোদ তিনি, যিনি সংশ্লিষ্ট জেলায় আইনের শাসন বহাল রাখার প্রধান দায়িত্বে।

প্রথমে ফালাকাটা থানায় নিয়ে যাওয়া হল অভিযুক্ত যুবককে। রাতেই সেই থানায় সস্ত্রীক পৌঁছলেন জেলাশাসক। তার পরে থানায় ঢুকে নিজেরা হাতে তুলে নিলেন আইন। জেলাশাসক এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনে মিলে মারধর করলেন অভিযুক্ত যুবককে। শুধু মারধর নয়, ভাইরাল হওয়া ভিডিয়ো থেকে যে সব শাসানি শোনা গিয়েছে জেলাশাসকের মুখে, সে সবও অত্যন্ত গর্হিত এবং অসাংবিধানিক।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

প্রথমত, পদ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করলেন জেলাশাসক। দ্বিতীয়ত, আইনের গুরুতর লঙ্ঘণ ঘটালেন। তৃতীয়ত, তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তির সুযোগ নিয়ে তাঁর স্ত্রী অপরাধ করলেন, তিনি সেটা ঘটতে দিলেন। করার কথা ছিল একটা অপরাধের বিহিত, কিন্তু ঘটল আরও বেশ কয়েকটা অপরাধ।

আরও পড়ুন: ‘সিঙ্ঘম’ হতে গিয়ে বেকায়দায়, আলিপুরদুয়ারের ডিএম-কে ছুটিতে পাঠিয়ে দিল নবান্ন

নিখিল নির্মল কী ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়ে এ সব ঘটালেন? যদি তাই ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে বেশ কয়েকটা কথা বলতে হয়। প্রথমত, ক্রোধে অন্ধ হওয়া বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন প্রশাসককে মানায় না। দ্বিতীয়ত, অপরাধ যদি কোনও প্রশাসককে ক্রোধান্বিত করে, তাহলে যে কোনও নাগরিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের প্রেক্ষিতেই ওই প্রশাসক ক্রুব্ধ হবেন বলে আমরা আশা করব। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, নিখিল নির্মল প্রতিটি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেই কি এইভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে অভ্যস্ত?

আরও পড়ুন: যুবক পিটিয়ে ছুটিতে ডিএম

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এ দেশে নতুন নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে হাওড়ায় চোর সন্দেহে একজনকে গণপ্রহারের ছবি আমাদের চমকে দিয়েছিল। এই গণপ্রহারের সংস্কৃতি দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। দেশজোড়া বিষ। কোথাও গোরক্ষার নামে, কোথাও ছেলেধরা সন্দেহে, কোথাও অন্য কোনও কারণে। এই বর্বর প্রবণতা থেকে মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনের বা প্রশাসকদের কর্তব্য এই প্রবণতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া। তাঁদের কর্তব্য, এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করা, যাতে দুষ্কৃতীরা আতঙ্কে থাকে। কিন্তু আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করলেন, যাতে দুষ্কৃতীরা উৎসাহিত হবে, আইন হাতে তুলে নেওয়া কারও কারও ধারণায় বৈধতা পাবে।

যে ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, তার সত্যতা আনন্দবাজার ডিজিটালের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসন ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ করেছে। কালবিলম্ব না করে অভিযুক্ত জেলাশাসককে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে নবান্ন। রাজ্য প্রশাসনের এই পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসনীয়।

আবার বলি, যে যুবক জেলাশাসকের স্ত্রীকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অশালীন এবং আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করেছেন বলে অভিযোগ, সেই যুবকের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু হোক এবং কঠোর পদক্ষেপ হোক। কিন্তু অভিযুক্ত প্রশাসকের বিরুদ্ধেও অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ হওয়া খুব জরুরি।