কয়েক দিন কার্ফু জারি রাখার পর জম্মু ও কাশ্মীরের এক কোটি ত্রিশ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিল ভারতীয় গণতন্ত্র। ভারত সরকার যে রাজ্যটির ‘স্পেশাল স্টেটাস’টুকুই কেড়ে নিল, তা নয়— কলমের এক খোঁচায় বদলে দিল রাজ্যটির রাজনৈতিক চরিত্র। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল অস্বাভাবিক দ্রুততায়। একটি পূর্ণরাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে দুটো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি হল, অথচ ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সংখ্যার জোর এমনই যে সংসদে পেশ হওয়ার মাত্র দু’দিনের মধ্যেই পাশ হয়ে গেল বিলটি। রাজ্যপালও অতি তড়িঘড়ি সম্মতি জানিয়ে দিলেন। 

৫ অগস্ট ভোররাতের আগে যখন গোটা রাজ্য কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে গেল, কাশ্মীর উপত্যকার মানুষ আগে থাকতে কোনও খবরই পেলেন না। মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, খবরের কাগজ বন্ধ, টেলিফোন লাইন কাটা, ইন্টারনেট চলছে না। যাঁদের বাড়িতে ডিশ অ্যান্টেনা আছে, তাঁদের টেলিভিশনে কিছু কিছু চ্যানেল আসছিল, অন্যদের সেটুকুও নয়। তার চেয়েও মারাত্মক, আমরা যাঁরা উপত্যকার বাইরে আছি, তাঁরা জানতেই পারছি না যে সেখানকার মানুষ কেমন আছেন। আত্মীয়স্বজনের খবর কী। সামরিক বাহিনীর বুটের তলায় তাঁদের মানবাধিকার কতখানি ধ্বস্ত হচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও রাস্তা নেই, আমরা শুধু এটুকুই জানি। 

রাজ্যে এমনিতেই প্রায় পাঁচ লক্ষ আধাসামরিক জওয়ান ছিলেন। ৫ তারিখের আগের কয়েক দিনে আরও অনেক সৈন্য আনা হল বাইরে থেকে। গোপনীয়তার ধোঁয়াশা তৈরি হল, বাছাই করা কিছু সাংবাদিকেরই শুধু সেখানে কাজ করার অধিকার থাকল। বিল পাশ করার আগে শেষ দু’দিনে কিছু খবর বাইরে এসেছিল— এই যেমন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি আর ওমর আবদুল্লা গ্রেফতার হয়েছেন; প্রবীণ, অসুস্থ ফারুক আবদুল্লাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে।  

বিল পাশ হওয়ার পর শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্রে বন্দুকধারী সামরিক বাহিনী আর পাথর হাতে প্রতিবাদীদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ বাঁধল। প্রাণ গেল এক কিশোরের। শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে পৌঁছলেন ছররায় আহত বেশ কয়েক জন। কার্ফু আংশিক শিথিল হল। শহরের প্রধান মসজিদগুলোর দরজা বন্ধই থাকল, তবে মহল্লার মসজিদে গিয়ে জুম্মার নমাজ পড়ার অনুমতি পেলেন নাগরিকরা। আগে থেকেই যাঁদের অন্যত্র যাওয়ার প্লেনের টিকিট কাটা ছিল, তাঁদের মুখে পাওয়া যাচ্ছিল টুকরোটাকরা খবর। কিন্তু, তাঁদের বাড়ি বা মহল্লাতে যা ঘটছে, খবর সীমাবদ্ধ ছিল সেটুকুতেই। বাকি কাশ্মীরে কী হয়েছিল, সেটা আজ অবধি রহস্যই থেকে গিয়েছে। অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে নিজের বাড়ির চার দেওয়ালের ইঁদুরকলে আটকে পড়া সাধারণ কাশ্মীরিদের কেমন লাগছে, কল্পনা করতে পারছেন কি দেশের বাকি অংশের নাগরিকরা? 

জম্মু ও কাশ্মীরের সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন হয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে তো বটেই, গোটা দেশের পক্ষেই এই পদক্ষেপ এক মারাত্মক বার্তা বহন করে। পদক্ষেপটি যে প্রকারের, এবং যে ভাবে এই পদক্ষেপ করা হল, দুইয়ের মাধ্যমেই ভারত অ-গণতন্ত্রীকরণের পথে হাঁটতে আরম্ভ করেছে। ৩৭০ ধারা ব্যবহার করেই সিদ্ধান্ত হল, কাশ্মীরে কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা সংবিধান সভার পরিবর্তে বিধানসভার হাতে সিদ্ধান্ত অনুমোদনের অধিকার দেওয়া হবে। ফলে, নবনির্বাচিত সংবিধান সভার অধিবেশন ডেকে ৩৭০ ধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আর থাকল না। কিন্তু, আরও বড় ধোঁকা হল পরের ধাপে। রাজ্যে তো বিধানসভাও ছিল না, তা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। বেশ কয়েক মাস যাবৎ জম্মু ও কাশ্মীরে রাষ্ট্রপতি শাসন বলবৎ ছিল। ফলে, সরকার স্থির করল, বিধানসভার অধিকারটিকে দেওয়া হবে সংসদের হাতে। সেই সংসদ, যেখানে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিরঙ্কুশ। 

বিজেপি সরকারের যুক্তি, জম্মু ও কাশ্মীরের স্পেশাল স্টেটাস অবিলম্বে কেড়ে নেওয়া প্রয়োজন ছিল, কারণ এই বিশেষ ব্যবস্থাটির কল্যাণেই রাজ্যে জঙ্গিদের রমরমা। যুক্তিটি অতি গোলমেলে। জম্মু ও কাশ্মীরের গত সাত দশকের ইতিহাস দেখলে একটা কথা স্পষ্ট বোঝা যায়— যখনই রাজ্যের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে, এবং তার ফলে দিল্লিকে মানুষ বিচ্ছিন্ন শক্তি হিসেবে দেখেছেন, তখনই রাজ্যে জঙ্গি কার্যকলাপের পরিমাণও বেড়েছে আনুপাতিক হারে। গত কয়েক বছরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছিল। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরে যে কাণ্ডটা ঘটাল, তা বিপরীতফলদায়ী হতে বাধ্য— আশঙ্কা হচ্ছে, আরও অনেক বেশি সংখ্যক যুবক হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন। তাঁদের মধ্যে ভারতবিদ্বেষী বিষ আরও কতখানি বাড়বে, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তটি ঘোষিত হওয়ার আগে থেকেই খবর আসছিল, আরও অনেক বেশি সংখ্যক তরুণ আইএসআইএস-এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন, মন্ত্রমুগ্ধ হচ্ছেন। গায়ের জোরে কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকার কতখানি রক্ত বওয়াতে রাজি, আর সেই রক্তের দাগ মুছতে কতখানি কর্পোরেট আর বলিউডি পুঁজি কাশ্মীরে নিয়ে আসতে পারবে, উপত্যকাকে এ ভাবে অবরুদ্ধ করে রাখার পরিণতি কী দাঁড়াবে, সেটা তার ওপরই নির্ভর করছে। 

সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা না করে, তাঁদের মতামতের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে রাজ্যটিকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে বানিয়ে দিল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের পক্ষে এই সিদ্ধান্তগুলি অত্যন্ত অপমানজনক। তবে, এই সিদ্ধান্ত যে শুধু কাশ্মীরের পক্ষেই বিপজ্জনক, তা নয়। গোটা দেশের পক্ষেই এর তাৎপর্য বিপুল। সিদ্ধান্তটি এক মারাত্মক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। ভারতীয় গণতন্ত্রকে, বস্তুত তার অস্তিত্বকেই, বিপন্ন করল এই সিদ্ধান্ত। ভারতে আরও কিছু রাজ্যের স্পেশাল স্টেটাস আছে, বিশেষত উত্তর-পূর্ব  ভারতে। অতঃপর আইন বিজেপির হাতে ক্ষমতা তুলে দিল— যে কোনও দিন এই রাজ্যগুলিতে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান সম্ভব। অন্য রাজ্যগুলিতেও সম্ভব। যেখানে বিরোধী দলগুলি ক্ষমতাসীন, বিজেপি চাইলে সেই রাজ্যগুলিতে মুখ্যমন্ত্রীদের জেলে পুরতে পারে, রাজ্য ভেঙে দিতে পারে, পূর্ণরাজ্যের তকমা কেড়ে নিয়ে সেগুলিকে বানিয়ে ফেলতে পারে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। 

আর, এ ভাবেই পাল্টে দিতে পারে ভারতের গঠন। এই দেশ অনেকগুলি অঙ্গরাজ্যের সংগঠন— যুক্তরাষ্ট্র। সেই চরিত্র পাল্টে ভারত হয়ে উঠতে পারে অজস্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সমষ্টি। দেশের প্রতিটি প্রান্ত শাসিত হতে পারে কেন্দ্র থেকে। সরকার চাইলে দুর্বল করে দিতে পারে ভারতীয় সংবিধানকেও। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া দিয়ে শুরু হতে পারে সেই কাজ। ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির কাজটি যে ভাবে হল, সেই ভাবে খিড়কির দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতির নির্দেশেই বদলে দেওয়া যায় সংবিধান। শারীরিক ও রাজনৈতিক ভাবে কাশ্মীরকে রক্তাক্ত করে ভারত এই ঘোর তমসাবৃত বিপজ্জনক পথে হাঁটতে আরম্ভ করল।