কিছু নাগরিককে ‘অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করে বিতাড়নের জন্য এতই তৎপর হয়ে উঠেছে ভারতের নানা রাজ্য— বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলি— আইনের নির্দেশাবলি লঙ্ঘন, নাগরিকের অধিকার নস্যাৎ করতেও দ্বিধা করছে না প্রশাসন। সম্প্রতি ওড়িশার কেন্দ্রাপাড়ার একই পরিবারের দুই বৃদ্ধ এবং এক বৃদ্ধার বিতাড়নের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ৭৫ ও ৬১ বছর বয়সি দুই ভাই, এবং তাঁদের ৭০ বছর বয়সি বোনকে পুলিশ যখন গ্রেফতার করে, তখন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্যও। তাঁদের পরে পুলিশি হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, ওই তিন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আটক থাকেন। ৩০ জানুয়ারি এই বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারের সদস্যদের প্রশাসন জানায় যে, ওই তিন প্রবীণ বিতাড়িত হয়েছেন। স্বভাবতই তাঁদের পরিবার উদ্বিগ্ন। কোথায় রয়েছেন ওই প্রবীণরা, আদৌ তাঁরা সীমান্ত পার করেছেন কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা গিয়েছে। পুলিশের কাছে বিতাড়ন সংক্রান্ত নথিপত্র, সীমান্ত পেরোনোর ছবি প্রভৃতি চেয়েও হাতে পায়নি পরিবার। বিতাড়িত তিন জনের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হাঁপানি, যকৃতের সমস্যা এবং স্মৃতিবিভ্রমে আক্রান্ত। পরিবারের এই দুশ্চিন্তা কাকে না স্পর্শ করবে? গত বছর বীরভূমের পরিযায়ী শ্রমিক অন্তঃসত্ত্বা সুনালী খাতুন, তাঁর স্বামী ও নাবালক পুত্রকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বলে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করেছিল দিল্লি সরকার। শেষ অবধি আদালতের নির্দেশে পুত্র-সহ সুনালী ফেরেন। কেন্দ্রীয় সরকার যে হাল ছাড়েনি, তার প্রমাণ মিলেই চলেছে।
কিসের এই অধীরতা? অবৈধ অনুপ্রবেশের সমস্যা নতুন নয়। বহু দশক ধরে বাংলাদেশের বহু নারী, পুরুষ, শিশু বেআইনি ভাবে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য আটক হয়েছেন। তাঁদের পুনরায় ফেরত পাঠাতে বছর ঘুরে যেত, যে-হেতু আইন-বিধির শর্ত পূরণ করা সহজ ছিল না। দুই দেশের বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয়, তথ্য সংগ্রহ এবং আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হত। পুনর্বাসনের জন্য অপেক্ষারতদের কাছে এই বিলম্ব যতই যন্ত্রণাময় হোক, বৈধ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা অন্তত রক্ষিত হত। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়টি সহজেই এড়ানো যাচ্ছে। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা যাচ্ছে, নথিপত্র জোগাতে পারছেন না সব ধর্মের নাগরিক। কিন্তু বিতাড়ন করা হচ্ছে বিশেষ ভাবে বাংলাভাষী মুসলিমদের। কেন্দ্রাপাড়ার বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারটির দাবি, আদতে পূর্ববঙ্গের পরিবার হলেও, বিতাড়িত প্রবীণদের জন্ম-কর্ম ভারতেই। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের বক্তব্য, যে নথিপত্রগুলির জোরে ইতিপূর্বে গ্রামবাসীরা নাগরিকত্ব প্রমাণ করে ছাড়া পেয়েছেন পুলিশের হেফাজত থেকে, সেই সব কাগজ এ বার গৃহীত হয়নি। কেন, তা তিনি জানেন না।
মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার কর্মীরা বার বার আপত্তি তুলেছেন যে, বিতাড়নের বর্তমান প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ এবং বৈষম্যমূলক। বিশেষ ভাবে দরিদ্র, বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারগুলিকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে। অন্য দেশের নাগরিককে ফেরত পাঠানোর বৈধ প্রক্রিয়া কি সরকার অনুসরণ করছে? বিতাড়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রায়শই বিধি লঙ্ঘন করছে। কেন্দ্রাপাড়ার তিন প্রবীণের ক্ষেত্রে যেমন। বিতাড়ন সম্পর্কিত কোনও কাগজপত্র তাঁদের পরিবারের সদস্যরা হাতে পাননি। ফলে কিসের ভিত্তিতে বিতাড়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিল প্রশাসন, তা তাঁরা জানেন না। সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য আবেদন করার কোনও সুযোগও তাঁরা পাননি। তাঁরা যথার্থই মনে করিয়েছেন যে, রাষ্ট্র কোনও ব্যক্তিকে বিতাড়নের যোগ্য বলে মনে করলেও তাঁর পরিবারের অধিকার রয়েছে জানার, যে তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। সুনালী খাতুনের সঙ্গে যা ঘটেছিল, সেই মানবিক সঙ্কটের পুনরাভিনয় হচ্ছে বার বার। বাংলাভাষী মুসলিমদের বিতাড়নের রাজনৈতিক চাপে আইনের শাসনকে ভুলতে বসেছে প্রশাসন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)