• ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অযোধ্যার রামমন্দির: প্রত্নতত্ত্বের যুক্তি নয়, পেশিবল নির্ভর বিশ্বাস

মেষশাবকের মৃত্যু

Ayiodhya

অযোধ্যা মামলার রায় গেল তাঁদের পক্ষেই, যাঁরা ১৯৯২-এ নির্মম ভাবে বাবরি মসজিদকে ধুলোয় মিশিয়েছিলেন— যদিও বিচারপতিদের মতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস অতি গর্হিত আইনবিরোধী কাজ। এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত কেন? কারণ নাকি— বাবরি মসজিদ সাড়ে চারশো বছর ধরে অযোধ্যায় যে জমি দখল করে দাঁড়িয়েছিল, তার প্রত্নতত্ত্ব। 

কী সেই প্রত্নতত্ত্ব? কী সেই অকাট্য পাথুরে প্রমাণ যার জোরে দৃশ্যমান, স্থাবর প্রায় পাঁচশো বছর পুরনো ইতিহাসকে ধূলিসাৎ করে ফেলাকে বৈচারিক সমর্থন জানানো যায়, ন্যায়বিচারের নামে জাতির এক বৃহৎ অংশের আত্মমর্যাদাবোধ উড়িয়ে দেওয়া যায়?

রামজন্মভূমি নিয়ে বিবাদ অনেক দিনের, রামায়ণ-মহাভারতের ‘প্রত্নতত্ত্ব’ নিয়ে চর্চাও অনেক দিনের। উনিশশো পঞ্চাশের দশকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের কর্মচারী (পরে অধ্যক্ষ) বি বি লাল গঙ্গাতীরবর্তী হস্তিনাপুরে উৎখনন করেন। মহাভারতে উল্লিখিত অন্যান্য প্রত্নস্থলেও তাঁর অনুসন্ধান চলে। সত্তরের দশক থেকে অনুসন্ধান চলে অযোধ্যা, ভরদ্বাজ আশ্রম, শৃঙ্গবেরপুর ইত্যাদি রামায়ণ উল্লিখিত স্থলে। দিল্লির পুরানা কিলায় পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠিত ইন্দ্রপ্রস্থ নগরীরও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন হয়েছে। উৎখননের ফলাফল কি রামায়ণ-মহাভারতের বর্ণনার সঙ্গে মিলেছে? মেলেনি, মেলার কথা নয়। সাহিত্যে বর্ণনা এক প্রেক্ষিত থেকে হয়, প্রত্নতত্ত্বের তথ্য আর এক। বৃহৎ গাঙ্গেয় উপত্যকায় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রত্নতত্ত্ব যা প্রতিষ্ঠা করেছে, তা হল— মোটামুটি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বুদ্ধের সময় (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শতাব্দী), এবং তার পরেও যে সাংস্কৃতিক রূপান্তর চলছিল, তাকে গাঙ্গেয় উপত্যকায় জনপদ গঠনের পর্ব বলা যায়। এই সব জনপদের অন্যতম ছিল কোশল। রাম যদি আদৌ মনুষ্যজন্ম নিয়ে থাকেন তা হলে এই কোশলই সূর্যবংশীয় ইক্ষ্বাকু রামের জন্ম-জনপদ ও রাজধানী। 

এই প্রত্নতত্ত্ব যে রামজন্মভূমি-সম্পর্কিত জনপ্রিয় বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি হতে পারে না, তা উৎখননকারীরাও নীরব থেকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কারণ সাধারণের বিশ্বাসে সায় মেলাতে গেলে, তাঁদের অর্জিত বিশেষ বিদ্যার খাতিরে কতকগুলি প্রশ্নের জবাব দিতে হত: ১) রাম যদি সত্যিই ঐতিহাসিক পুরুষ হয়ে থাকেন, তা হলে তাঁর সময়কাল কী? প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে অনাহত এমন কোনও যুগ আছে যাকে রামের যুগ বলা যাবে? কী তথ্যের জোরে? ২) রামের জন্মস্থান কোথায় তা নির্ধারণ করার কি কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতি বা প্রমাণ আছে? রাম অযোধ্যায় জন্মেছিলেন, এর অর্থ তো হতে পারে না যে তিনি সারা অযোধ্যা নগরী জুড়ে জন্মেছিলেন! আবার বাবরি মসজিদ অধিকৃত জমিটিই যে তাঁর একান্ত জন্মস্থান, এটিও নিতান্ত পেশিবল নির্ভর বিশ্বাস; প্রত্নতাত্ত্বিক যুক্তি নির্ভর নয়।

এই ধরনের তথ্য মেলা কতটা কষ্টসাধ্য তার উদাহরণ দিই। মগধের মহারাজ অশোক তাঁর রাজত্বের বিশতম বছরে লুম্বিনী গ্রামে গিয়েছিলেন শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্মস্থানে তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণে। অশোক যে প্রস্তরস্তম্ভটি সেখানে নির্মাণ করেন, সেটি তাঁর মতে বুদ্ধের জন্মস্থানটি চিহ্নিত করছে। বুদ্ধের সময়কাল ও অশোকের সময়কালের মধ্যে দু’শো বছরেরও বেশি ফারাক। আমরা নিঃসংশয় হয়ে অশোকের বিশ্বাসকে আজ গ্রহণ করতে পারি কি যে অশোকস্তম্ভ চিহ্নিত স্থানই বুদ্ধের জন্মস্থান? 

৩) জন্মস্থানের প্রমাণই যখন নেই, তখন জন্মস্থান চিহ্নিত করা রামমন্দির আসে কোথা থেকে? ১৯৯২’এ বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার আগে রামমন্দির সম্পর্কিত যুক্তি সবটাই বিশ্বাস নির্ভর, যদিও ওই তারিখের আগে অযোধ্যায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য কিছু কম হয়নি। ১৯৯২-এর পরে যুক্তির চরিত্রটি পাল্টে গেল। ধ্বংসের পর থেকেই শোনা যেতে লাগল যে মসজিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে নাকি এক প্রাচীন শিলালেখ পাওয়া গিয়েছে, যাতে একই স্থানে রামমন্দিরের অস্তিত্বের পক্ষে অবিচ্ছেদ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে। পরে সেই শিলালেখ (যার প্রাপ্তিস্থান আসলে অজানা) প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর শিলালেখ। উত্তরপ্রদেশের গঢ়বাল রাজবংশের এক সামন্তরাজা, খুব সম্ভবত প্রভুবংশ স্থাপিত বিষ্ণু হরিদেবের মন্দিরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাকেত-মণ্ডলে (অর্থাৎ অযোধ্যা অঞ্চলে) একটি বিষ্ণুহরির মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তা হলে এই মন্দিরই কি রামের জন্মস্থানের মন্দির? 

এক, রাম বিষ্ণুর অবতার হলেও বিষ্ণু হরি ও রাম অভিন্ন, এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয় না। শিলালেখ প্রকাশিত হওয়ার পরে এ কথা জোর দিয়ে কেউ দাবি করতে পারেননি। দুই, শিলালেখটির প্রাপ্তিস্থান অজ্ঞাত, বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবিষ্কৃত হওয়ার সংবাদটি নিতান্তই চক্রান্ত-প্রসূত। তিন, মন্দির দ্বাদশ শতাব্দীর। রাম জন্মমন্দির স্থাপিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পৌরাণিক ইতিহাস অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে, রামতনয় মহারাজ কুশের আমলে। রামই রামসেতুর নির্মাতা হয়ে থাকলে তাঁর যুগের জন্মমন্দির, যার প্রত্নতাত্ত্বিক ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না— জন্ম নিয়েছিল সেই একই তুষার যুগে, যখন কোনও মন্দির পৃথিবীর কোনও প্রান্তেই স্থাপিত হওয়া সম্ভব ছিল না।

রামমন্দিরের অস্তিত্ব নিয়ে জোরালো তথাকথিত ‘তথ্য’ আবিষ্কৃত হল এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ বাবরি মসজিদের ধ্বসস্তূপের পাতালমহল উৎখনিত হওয়ার পর। তড়িঘড়ি প্রস্তুত, অদ্যাবধি অপ্রকাশিত, রিপোর্টে জানানো হয়েছে উৎখনিত প্রত্নস্থল থেকে অনেক অ-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন মিলেছে, এই তথ্যের ভিত্তিতে একই স্থলে এক হিন্দু মন্দিরের প্রাক্-মসজিদ যুগের অস্তিত্ব অনুমান করা যায়। সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা এই প্রাক্-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শনগুলোকে মন্দির-অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে নিশ্চয় মেনেছেন, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবে মন্দিরের অস্তিত্ব অনুমিত হলেও কোনও ভাবেই প্রমাণিত হয় না।

মুসলমান আক্রমণকারীরা যে অনেক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন তা জানার জন্য বাবরি মসজিদের পাতালঘরে খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন ছিল না। দিল্লির কুতুব মিনারের পাশে ও অজমেঢ়ের ঢাই দিন কা ঝোপড়া-য় কিছু ক্ষণ ঘোরাঘুরি করলেই সে সত্য প্রত্যক্ষ হয়। রাজারাজড়া, নবাব-বাদশা, এমনকি বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে মন্দির-মসজিদ ভাঙাভাঙি, সম্পত্তিহরণ ও মূর্তি হরণ ইত্যাদি তো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য। শুধু মুসলমান আক্রমণকারী নন, অন্য রাজ্য আক্রমণকারী হিন্দু রাজারাও অন্য রাজ্যের স্থাপত্যকর্ম ধ্বংস করতে কিছু কসুর করেননি। এমন হিন্দু রাজাও ছিলেন যিনি মন্দির ও দেবতার সম্পত্তি লুণ্ঠন করার জন্য ‘দেবোৎপাটন-নায়ক’ নামক এক রাজকর্মচারী নিয়োগও করেছিলেন। অন্য দিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থানীয় মানুষজন আর ব্যবসায়ীর উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণের জন্য ভূমিদান করেছেন ও তার ব্যয়নির্বাহের জন্য সম্পত্তি দান করেছেন; কোথাও বা ব্রাহ্মণ ও অগ্নি উপাসক পারসিকদের ষড়যন্ত্রে মসজিদ পোড়ানো হলে স্থানীয় হিন্দু শাসক সরেজমিন তদন্ত করে মসজিদের পুনঃসংস্কার করেছেন। এ সবই, অতীতের ঘটনা। কোনওটা হাজার বছর আগের, কোনওটার বয়স সাড়ে চারশো বছর। 

একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় নাগরিক হিসেবে এই ঘটনাগুলিকে কী ভাবে দেখব? বদলা নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে? সংবিধানের কোন ধারায় বদলা নেওয়া সমর্থন করা আছে? আরও জরুরি প্রশ্ন: অযোধ্যায় বিচার কি নিছকই ভূমিস্বত্ব সংক্রান্ত মামলার বিচার? সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা কি সকলে সম্পূর্ণ ভাবে অনবহিত ছিলেন যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার আগে এবং পরেও, শুধু এক খণ্ড জমি বা স্থাপত্যের নিদর্শন নয়। সে ক্রমে ক্রমে ইতিহাসের আবর্তচক্রের চক্রান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের এক বৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক মর্যাদার চরিত্র যার সঙ্গে যুক্ত। 

দু’টি প্রধান কারণে অযোধ্যার ‘ঐতিহাসিক’ রায় আশ্চর্য ঠেকে। এক, সাড়ে চারশো বছরের পুরনো ঐতিহাসিক কুকর্ম একবিংশ শতাব্দীর বিচারে সংশোধনের চেষ্টা। দুই, বাবরি মসজিদ বিতর্কটিকে খেলো ভূমিস্বত্ব বিবাদে পর্যবসিত করা।

ছোটবেলায় পড়া ইশপের একটি গল্প মনের মধ্যে ঘুরছে। ঝর্নার নীচের দিকে এক মেষশাবক জল পান করছে, ঝর্নার উপর দিকে নেকড়ে জল খেতে এল; এবং মেষশাবকটিকে দেখে তার ক্ষুধার উদ্রেক হল। কিন্তু কী ছুতোয় মেষশাবকটিকে খাওয়া যায়? নেকড়ে রক্তচক্ষু নিয়ে মেষশাবককে শাসালো, ‘দেখছিস না আমি জল খাচ্ছি, জল ঘোলা করছিস কেন?’ মেষশাবক সভয়ে উত্তর দিল, ‘প্রভু আমি তো নীচে জল খাচ্ছি, উপরের জল ঘোলা করব কী করে?’ নেকড়ে: ‘তুই না করিস, তোর বাপ-ঠাকুরদা করেছে।’ বলেই সে মেষশাবকের ঘাড় মটকে পরম তৃপ্তিতে আহার শুরু করল।

ন্যায়পরায়ণ অযোধ্যাপতি রামচন্দ্র 

বিবেচনা করে দেখবেন মেষশাবকটির উপর সুবিচার হয়েছিল কি না।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন