দেশের স্বাস্থ্যনীতি কোন দিকে চলেছে? ২০১৯-এর অন্তর্বর্তী বাজেটে দেখা যাচ্ছে, আয়ুষ অর্থাৎ সনাতন ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৭,৩০০ কোটি টাকা। গত বাজেটে স্বাস্থ্য বরাদ্দ যা বেড়েছিল, টাকার অঙ্কে এই বছরের বরাদ্দবৃদ্ধি তার প্রায় দ্বিগুণ।
গত দু’বছরে স্বাস্থ্য খাতে যতটা বরাদ্দ বেড়েছে, তার কারণ প্রধানত আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প। অর্থাৎ এক দিকে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা (মুখ্যত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা বা পিএমজেএওয়াই), অন্য দিকে, হেলথ অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টার (এইচডব্লিউসি) বা উন্নত প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা। প্রকল্পটি চালু হয় ২০১৮-১৯ বাজেট ঘোষণার প্রায় সাত মাস পরে। সেই হিসেবে আয়ুষ্মান ভারতের খাতে এ বারই প্রথম বাজেটে অর্থসংস্থান। তাই ছবিটা ঠিকঠাক বুঝতে হলে ২০১৭-১৮ সালের মোট খরচ, ২০১৮-১৯ সালের সংশোধিত বরাদ্দ ও ২০১৯-২০ সালের ঘোষিত বরাদ্দ, সবটাই দেখা দরকার। প্রথম বছরে, অর্থাৎ ২০১৮-১৯’এর সংশোধিত হিসাবে আয়ুষ্মান ভারতের জন্যে বরাদ্দ ছিল ৩৬০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২৪০০ কোটিই পিএমজেএওয়াই-এর জন্যে। এ বারের অন্তর্বর্তী বাজেটে আয়ুষ্মান ভারতে মোট বরাদ্দ হয়েছে ৮০০০ কোটি (গত বছরের তুলনায় ৪৪০০ কোটি বেশি)— ৬৪০০ কোটি পিএমজেএওয়াই খাতে, ১৬০০ কোটি এইচডব্লিউসি’তে। গত দু’বছরের আয়ুষ্মান ভারত খাতে বরাদ্দ অর্থ বাদ দিলে স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক বরাদ্দ ২০১৮-১৯’এর চেয়ে ৫০৭ কোটি কম। আর এ বছরের বৃদ্ধি মাত্র ২৯০০ কোটি।
গত দু’বছরে আয়ুষ্মান ভারত তথা মূলত স্বাস্থবিমা-নির্ভর পিএমজেএওয়াই খাতে অর্থবৃদ্ধির কোপ গিয়ে পড়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরিষেবার বরাদ্দে, বিশেষত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচএম)। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বৃদ্ধি এবং মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমার পিছনে এনএইচএম-এর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তার বাজেট ছাঁটাইয়ের প্রভাব পড়বে প্রজনন এবং শিশু স্বাস্থ্য পরিষেবা, টিকাকরণ, সংক্রামক (টিবি, ম্যালেরিয়া, ডায়েরিয়া ইত্যাদি) এবং অ-সংক্রামক ব্যাধি নিবারণের মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলির উপর।
লক্ষণীয়, আয়ুষ্মান ভারতের এইচডব্লিউসি চালু হয়েছে এনএইচএম-এর অধীনে, অ-সংক্রামক রোগ নিরাময়ের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মজবুত করতে। অথচ এই বাজেটে মাত্র ১৬০০ কোটি বরাদ্দ হয়েছে দেড় লক্ষ এইচডব্লিউসি বানানোর জন্য। এইচডব্লিউসি বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের প্রকৃত বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ৩১৫২১ কোটি (২০১৭-১৮) থেকে ২৯৪৮৩ কোটি 
(২০১৮-১৯ সংশোধিত) এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী বাজেটে ৩০১৪৫ কোটি (২০১৯-২০)। সোজা কথা, এই বাজেটে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের বদলে অর্থ বিভিন্ন খাতে পুনর্বণ্টিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার (হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার জন্য পরিবার-পিছু বার্ষিক পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি বিমা সুরক্ষা) পিছনে সরকারি মদত আসলে বেসরকারি বা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা কেনার জন্য। জাতীয় নমুনা সমীক্ষা (এনএসএস) ২০১৪-র তথ্য জানাচ্ছে যে আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশ অসুস্থতার চিকিৎসা হয় বহির্বিভাগে (আউটডোর) প্রদত্ত পরিষেবা মারফত, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নয়। এর পাশাপাশি, ভারত সরকারের ২০১৩-১৪’র পরিবার-প্রতি ব্যয় রিপোর্ট অনুযায়ী, রোগ-নিরাময়ে নিজের পকেট থেকে দেওয়া খরচের ক্ষেত্রেও হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসার খরচের (৩২%) তুলনায় বহির্বিভাগে চিকিৎসায় বেশি (৫৫%)। কাজেই পিএমজেএওয়াই না গরিবের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা করছে, না তার পকেটের। অন্য দিকে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা রোগীদের বাধ্য করছে বেসরকারি পরিষেবা কিনতে, ফলত লাভের গুড় যাচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগের পকেটে। সরকারি স্বাস্থ্য কাঠামোর বেহাল অবস্থা পুনরুদ্ধারের বরাদ্দ ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। যেমন চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারের মূলধনী ব্যয়বরাদ্দ ২০১৭-১৮’তে ছিল ৩০৪৮ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯’এর সংশোধিত হিসাবে দাঁড়ায় ২৩৯১ কোটি, আর বর্তমান অন্তর্বতী বাজেটে ১৬৭৬ কোটি।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। ২০১৭ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির প্রধান দুই প্রস্তাব ছিল বাজারে স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্রয় এবং ২০২৫-এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২.৫ শতাংশ করা। প্রথম প্রস্তাবনার বাস্তবায়নই হল আয়ুষ্মান ভারত। লক্ষণীয়, বিভিন্ন রাজ্যে (যেমন পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, কর্নাটক ইত্যাদি) বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসফল। তবু সরকারি নীতি মারফত টাকা ঢালা হচ্ছে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পিছনে। দ্বিতীয় প্রস্তাবনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় গত কয়েক বছরে ধরে জিডিপির ১ শতাংশ থেকে ১.৫ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে।
গোটা বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সফল পরিচালনার জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় হল উন্নত মানের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা এবং সরকার পরিচালিত মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা। অথচ ভারতে সেটাই ক্রমান্বয়ে অবহেলিত। একটি দৃষ্টান্ত এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। কলকাতার অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন জনস্বাস্থ্য শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে বিগত প্রায় এক দশক ধরে ২৯ শতাংশ পদ খালি পড়ে রয়েছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক পদেই অর্ধেকের বেশি (৪৩ টার এর মধ্যে ২৩ টা) শূন্য।
এ বারের অন্তর্বর্তী বাজেট দেখায়, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বাস্থ্যোন্নতিতে সরকার যতটা আগ্রহী, জনসাধারণের প্রধান ভরসা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নতিবিধানে ততটা নয়। এই অসুস্থ স্বাস্থ্য নীতির অবিলম্বে চিকিৎসার প্রয়োজন।

জেএনইউ-তে সেন্টার অব সোশ্যাল মেডিসিন অ্যান্ড কমিউনিটি হেলথ-এ গবেষক