ঢাকায় গিয়ে এক আত্মীয়বাড়িতে বাংলা খবরের কাগজ পড়ছি, প্রথম পাতায় এক বিজ্ঞাপনের দিকে নজর ঘোরালেন এক দাদা। রমজান মাস তখন সবে শুরু হয়েছে, এক মাস পর ইদ-এর প্রতীক্ষা। এই পুরো সময়টায় ঠিক আমাদের পুজো বা দিওয়ালির মতো নানান জিনিসে অফারের ছড়াছড়ি বাংলাদেশে। দেখি, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনে বড় বড় করে লেখা, ‘ইদ হবে অস্থির এবার!’ সে দিকে দেখিয়ে তীক্ষ্ণ, বাঁকা স্বরে দাদা বললেন, ‘দেখেছেন ভাষার অবস্থা?’

বুঝলাম, অনুযোগের তির ‘অস্থির’ শব্দটার দিকে। ভদ্রলোক স্কুলশিক্ষক, উপরন্তু বাংলা পড়ান। আহত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ফেসবুকে বাংলাদেশি বন্ধুদের, বিশেষত এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সৌজন্যে ‘অস্থির’-এর এমন প্রয়োগ আমার পূর্বপরিচিত। তাঁরা ‘অস্থির’ শব্দটা প্রয়োগ করেন দারুণ, দুর্দান্ত, অনবদ্য-এর মতো বিশেষণের প্রতিশব্দ হিসেবে। ‘সাকিবের ব্যাটিং দেখলি? অস্থির!’ ঠিক যেমন কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে শোনা যায় ‘ব্যাপক’ শব্দের ব্যবহার: ‘রান্নাটা তো ব্যাপক হয়েছে!’ বা, ‘সিনেমা কেমন দেখলে?’ ‘ব্যাপক!’

কিন্তু দাদাকে কে বোঝাবে? তিনি ঘন ঘন মাথা নাড়ছেন, ‘বাংলা ভাষার এই তো অবস্থা। মুখের ভাষা এমন হলে লেখাতেও এ সব অশব্দ-কুশব্দ ঢুকবেই!’ ভাবলাম, পরিস্থিতি আর একটু বাজিয়ে দেখা যাক তবে। পশ্চিমবঙ্গে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়— বাংলা ভাষাটাকে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। ভাষা নিয়ে মাতামাতি থেকে হাতাহাতি, সব কিছুতেই তার অধিকার। মাতামাতি ও হাতাহাতির একটা-দুটো উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশের ট্রেনে সেকেন্ড ক্লাস সিটিং ব্যবস্থার নাম ‘সুলভ’, আর ফার্স্ট ক্লাস ‘শোভন’। ঢাকার এক বই-বিপণিতে এক দিদির সঙ্গে দেখা, সঙ্গে তার উচ্ছল চঞ্চল ছোট্ট মেয়েটি। ‘কোন ক্লাসে পড়ো’-র উত্তরে শিশুটি বলল, ‘মঞ্জরী’। আমি থতমত খেয়ে তার মায়ের দিকে তাকাতে তিনি হেসে বুঝিয়ে বললেন, ওদের স্কুলে তিন বছর বয়সীদের ক্লাসের নাম ‘অঙ্কুর’, চারে ‘কিশলয়’, পাঁচে ‘মঞ্জরী’। আমি তো শুনে মুগ্ধ! আর হাতাহাতির কথাও বলছিলাম না? কিছু দিন আগে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘ফণী’ না ‘ফেনি’ (ফেনি বাংলাদেশেরই এক উপকূলবর্তী জেলা) সেই নিয়ে মতান্তরজাত সংঘর্ষে নোয়াখালিতে নয় যুবক আহত, এমন খবর বেরিয়েছে ঢাকার এক নিউজ় পোর্টালে। 
সে অবশ্য মজা আর ব্যঙ্গ করে। ভাষা নিয়ে বাঙালি কদ্দূর যেতে পারে তারই একটা দৃষ্টান্ত। তবে পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার জনপরিসরে যে বাংলা ভাষার প্রয়োগ ইদানীং শুনি আর দেখি, তার পাশে বাংলাদেশের বাংলা ভাষার ব্যবহারে প্রাণের আরাম হতে বাধ্য। কলকাতায় তো মেট্রোয় ওঠামাত্র উপলব্ধি হয় ‘এখানে অগ্নিশমন যন্ত্র উপলব্ধ আছে’। হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে তুলকালাম চলল ক’দিন, কিন্তু এখানকার (এবং এখনকার) বহু বাঙালিই হিন্দি ‘কিঁউ কি’র ছায়ায় আকছার ‘কেন কী’ বলেন, অল্পবয়সি বাঙালি ছেলেমেয়ে কথায় কথায় ‘ইয়ার’ ছোটায়, এফএম রেডিয়ো আর টিভিতে বিনোদনের চ্যানেলগুলোয় বহু অনুষ্ঠান সঞ্চালকের বাংলা শুনলে মনে হয়— কেন বাপু বাংলা বলার ছল, ইংরেজি আর হিন্দিতেই তো কলকলাতে পারো! এ তো সত্য সকলই সত্য। ঠিক করে বাংলা বলাটাও আজ ভোকাট্টা হয়ে, গোত্তা খেয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘ধরাশায়ী’। উৎসবে-পরবে ফেসবুকে সবাই গুরুজনদের ‘প্রনাম’ জানান (মোবাইলে ‘ণ’ লেখায় আলস্য না স্রেফ অপারগতা, কে জানে), লোকসভা ভোটে চোখে পড়ে দেওয়াল লিখন— ‘অমুক প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়ী করুণ’।
অবস্থা সত্যিই করুণ। এতটাই যে ভয় হয়, সুকুমার রায়ের লেখায় সেই যে মাথার ব্যামোওলা মানুষটার জুতোর নাম ছিল অবিমৃশ্যকারিতা, ছাতার নাম প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, গাড়ুর নাম পরমকল্যাণবরেষু আর বাড়ির নাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আজকের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি শ্রেণিভুক্ত বহু মানুষ সেই লাইনগুলো পড়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ই হবেন, এ সব হিজিবিজবিজ বলেই ভাববেন, রস পাবেন না কোনও। পক্ষকালব্যাপী রবীন্দ্র-জন্মোৎসব হয়ে গেল গত মাসে, চারদিকে রবীন্দ্রগানের ঘটাপটা। সে দিন এক গানের শিক্ষক দুঃখ করছিলেন, একটি শিশুকে ‘আয় তবে সহচরী’ শেখানোর পর রাতে তার মা ফোনে জানতে চাইছেন, মাস্টারমশাই, গানের কথায় এই যে আছে ‘পাশরিব ভাবনা, পাশরিব যাতনা’, এই ‘পাশরিব’র মানে কী? পা সরানোর মতো ভাবনা-যাতনাগুলোকে সরিয়ে রাখতে বলছেন রবীন্দ্রনাথ?

বছর দুয়েকও পেরোয়নি, খবরকাগজে এক মোবাইল সংযোগ পরিষেবা সংস্থার দেওয়া পাতাজোড়া বিজ্ঞাপনে বাংলার বহর দেখে তুমুল শোরগোল পড়ে দিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। ‘সম্পর্কতা’, ‘প্রমিস বানান’-এর মতো বাংলা (?) শব্দ ছিল সেখানে, বাক্য গঠনের কায়দা দেখে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছিল মগজ। বোঝাই যাচ্ছিল, মূল ইংরেজি বিজ্ঞাপনের বয়ানটি বাংলায় অনুবাদ করার দুর্বল, অক্ষম চেষ্টা করেছেন সংস্থার অনুবাদক-কর্মী। হাসি-ঠাট্টার পর্ব পেরিয়ে ফেসবুক-টুইটারে প্রতিবাদ জানান অজস্র বাঙালি। পরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাও টুইটারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। জানায়, এ অনুবাদকদের ভুল, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের গভীরতম শ্রদ্ধা আছে। বাংলাপ্রেমী মানুষ প্রশ্ন তুলেছিলেন, সংস্থার নিযুক্ত অনুবাদকেরা আদৌ বাঙালি তো? তাঁদের শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাস দেখে তো তা মনে হচ্ছে না মোটেই; বরং মনে হচ্ছে গুগল ট্রান্সলেটর গোছের প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই কাজ সারা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই ‘বাংলা বাঁচাও’ রব পড়েছিল চারদিকে, এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যা দস্তুর, গালাগালির বন্যা বয়ে গিয়েছিল। তালেগোলে আর এক কাণ্ড হয়েছিল, কিছু মানুষ ওই বিজ্ঞাপনের সূত্রেই ‘মান্যতা’ শব্দটার পিছনে পড়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘সম্পর্কতা’র মতোই ‘মান্যতা’ শব্দটাও হতে পারে না, তা সে যতই বলিউডি হিরোর স্ত্রীর নাম হোক না কেন। অথচ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ জ্বলজ্বল করছে ‘মান্যতা’, অর্থ ‘মান্যভাব, পূজ্যত্ব’। মোবাইল পরিষেবা সংস্থা হরিচরণের দ্বারস্থ হয়েছেন, এ না হয় অবিশ্বাস্য। কিন্তু বাঙালির অজ্ঞতা? অবিশ্বাস্য নয়?

আমার বাংলাদেশোয়ালি দাদাকে গঙ্গাপারের ভাষা-পরিস্থিতির চিত্রটা তুলে ধরে খানিক সান্ত্বনা দেব ভাবছিলাম, তিনি উল্টে তেড়েফুঁড়ে উঠলেন। পদ্মাপারেও ভাষা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল মাস কয়েক আগেই। বিশ্বখ্যাত এক নরম পানীয় সংস্থার বাংলাদেশ দফতর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নরম পানীয়ের বোতলের গায়ে এক-একটা বাংলা শব্দ লেখা থাকবে। কালের নিয়মে একটু পিছিয়ে-পড়া, ভুলে-যাওয়া, কম-প্রচলিত শব্দ। কোনও বোতলের গায়ে লেখা ‘বহুব্রীহি’, কোথাও ‘মনোহারিণী’, ‘শ্লোক’, ‘অবিমিশ্র’, ‘কেউকেটা’, ‘কেতাদুরস্ত’। নীচে লেখা তার অর্থও। সঙ্গতিপন্ন, উচ্চাভিলাষী বাংলাদেশি মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের ঢাকার ‘বিদেশি’ স্কুলে ‘এ লেভেল’ ‘ও লেভেল’ পড়ান, বাঙালি হয়েও এই পড়ুয়াদের বাংলা ভাষার জ্ঞান সীমিত। এদের শেখানোর জন্যই কি ওই ব্যবস্থা? অনেকের চোখ টাটালেও গোড়ায় কিছু বলেননি, আজকের বস্তুবাদী এই বিশ্বে ছেলেপুলে নরম পানীয়ের বোতল কিনতে গিয়েই না হয় শিখল দু-একটা বাংলা শব্দ, ক্ষতি কী? 

কিন্তু পরিস্থিতি ঘোরালো এবং প্রতিবাদ জোরালো হল পরে, যখন বোতলের গায়ে শব্দগুলো পাল্টে গিয়ে এল নতুন শব্দের ঝাঁক—‘কড়া’, ‘অস্থির’, ‘ঢিলা’, ‘মাথানষ্ট’, ‘জটিল’, ‘আগুন’। এ হল এই প্রজন্মের ব্যবহারিক বাংলা, যাকে পপুলার ল্যাংগোয়েজ নামে বেশি চিনি। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী নতুন প্রজন্ম রোজকার কথাবার্তায় একটা শব্দকে পাল্টে নেয় অন্য অর্থে, যেমন ‘অস্থির’ বা ‘ব্যাপক’-এর অন্যতর প্রয়োগের কথা বললাম। এই শব্দদের দেখে সুশীল সমাজে হইহই উঠল— বাংলাকে বিকৃত করে প্রচার হচ্ছে। ব্যাপার গড়িয়েছে আদালতেও। পুরো ঘটনায় আমার শিক্ষক দাদাটি ব্যথিত, ক্ষুব্ধ। তাঁর বছর চোদ্দোর স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি কিন্তু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, জিন্স ফাস্টফুড মল মাল্টিপ্লেক্স মানতে পারলাম, ভাষার বদল মানতে সমস্যা কী?

ভাষা নিয়ে বিশুদ্ধবাদী ও প্রগতিপরায়ণের বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে তারও গোড়ায় যাওয়া ভাল। বাংলা ভাষাটাকে তো আগে টিকে থাকতে হবে মানুষের রোজকার জীবনে, মুখে, লেখায়, আচরণে, ভাবনায়। ঢাকা থেকে কলকাতা ফেরার বিমানে চেপেছি, ঘোষণা হল— এই বিমানের কেবিন ক্রু-রা ইংরেজি, হিন্দি ও নেপালি বলতে-বুঝতে স্বচ্ছন্দ। আর ‘বাংলা’ ভাষা? তার কী হল? পথ হারাইয়াছে? 

 ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য