প্রশ্ন: ৩০ জুলাই কলকাতায় সিপিআইএমএল-লিবারেশন দলের কনভেনশন তো বেশ সফল। লোকসভা ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিেত আজ ২ অগস্টে কী মনে হচ্ছে আপনার, একটা কোনও ইতিবাচক সঙ্কেত আছে কি এই সময়ের মধ্যে?

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য: নির্বাচনের আগে একটা সময় পর্যন্ত বিরাট বিরাট আন্দোলন হয়েছে। গুজরাত, কর্নাটক, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ— পাঁচটা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে এই আন্দোলনগুলোর একটা ছাপ দেখা যাচ্ছিল। লোকসভা ভোটে অন্য অভিজ্ঞতা হল। কিন্তু আমরা মনে করি না যে, এর মানে, আন্দোলনগুলো মিথ্যে হয়ে গেল। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বিক্ষোভ আছে, প্রতিবাদ আছে, নির্বাচনের পরেই আবার আন্দোলন শুরু হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, ঠিক পরেই সেখানেই মজুরির দাবিতে গ্রামের মহিলাদের হরতাল হচ্ছে। সেটা ওই পুরনো সমীকরণটাকে ভাঙছে। এই সূত্রগুলোকে বিচার করে দেখা দরকার।  

দ্বিতীয়ত, আমাদের মাথায় ছিল পশ্চিমবঙ্গ। এখানে দীর্ঘদিন বামপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকেছে। নির্বাচনে তাদের ভোট বিস্তর কমল, তার একটা সিংহভাগ বিজেপির ভাঁড়ারে জমা হল। আমাদের মনে হয়েছিল মোদী সরকারের দ্বিতীয় দফায় পশ্চিমবঙ্গ হচ্ছে লড়াইয়ের সব থেকে বড় জায়গা। এখানে বিজেপির যে আজেন্ডাটা দেখা যাচ্ছে, ওরা আমাদের ১৯৪৭-এ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সব থেকে বড় বিপর্যয়ের জায়গা হল সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, তার পরিণতিতে দেশভাগ। এত দিন ধরে এই বিপর্যয়টাকে, পুরোপুরি ভুলে যেতে না পারলেও খানিকটা পিছনে সরিয়ে রেখে দেশ এগোচ্ছিল। আজকে বিজেপি সেই সাতচল্লিশের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। এটা মারাত্মক। পশ্চিমবঙ্গে এটা তো শুধু রাজ্যের সরকার পরিবর্তনের ব্যাপার নয়। বিজেপির যে রাজনীতি— মূলত দেশভাগের যে অসমাপ্ত প্রজেক্ট, পার্টিশন যেখানে ফেল করে গেল, সেটাকে সে একটা তার্কিক পরিণতিতে পৌঁছে দিতে চায়। সেই সাম্প্রদায়িক আক্রমণকে যদি ঠেকাতে হয়, সেটা পশ্চিমবঙ্গ থেকেই করতে হবে। 

পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী মানসিকতার মানুষ, যাঁরা আজকে উদ্বিগ্ন, এবং খানিকটা লজ্জিত যে, বামপন্থীদের এত বড় ভোট চলে গেল, তাঁদের কাছে আমরা আবেদন করেছি যে, বামপন্থায় ফিরে আসুন। এবং, সেখানে একটা নতুন ছক দরকার। সিপিএমের যে একটা ছক তৈরি হয়েছিল সেটা ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে জনগণের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে একটা বামপন্থা তৈরি করা দরকার। সেই অভ্যেসটা ফিরিয়ে আনতে হবে, আন্দোলনে বামপন্থাকে সম্মান দিতে হবে, দলগত ভাবে না হলেও আন্দোলনগত ভাবে, এবং চিন্তার জায়গায় একটা ঐক্য গড়ে উঠবে।

পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গে ক’মাস ধরে যেখানে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হচ্ছে, সেখানে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। এই সূত্রেই কনভেনশনটার নাম ঠিক করি ‘সংহতি ও প্রতিরোধ’। বিপন্ন মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের হাত ধরতে হবে। সেই জায়গা থেকে মনে হয় যে, কনভেনশনে সাড়া পাওয়া গিয়েছে। এ বার এটা নিয়ে এগোনোর প্রস্তুতি। 

প্র: গত দেড়-দু’বছরে নানা অঞ্চলে নানা বিষয়ে যে সব আন্দোলন হয়েছে তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার কি কোনও উপায় আছে? 

উ: সংযোগের দরকার এবং সম্ভাবনা, দুইই বাড়ছে। ধরুন, সাম্প্রতিক কালে দু’শোর বেশি কৃষক সংগঠন একটা সংগ্রামী মোর্চা গড়ে তুলেছে, তাদের যে শেষ জমায়েত— কৃষক মুক্তি সংসদ— দিল্লিতে হল, তাতে কৃষকদের সমর্থন করে ছাত্র, কর্মচারী, এমস-এর ডাক্তার, তাঁরা এসে কৃষকদের পাশে দাঁড়ালেন। অদ্ভুত একটা অন্য ছবি। এই ছবিটা কিন্তু বেশি বেশি করে উঠে আসছে। 

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে সাংস্কৃতিক চেতনার ওপরেও জোর দেওয়া দরকার। আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ইতিহাস একটা দূরের ব্যাপার। তাকে এ বিষয়ে ভুলভাল বুঝিয়ে দেওয়া সহজ। এক ছাত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল... জিজ্ঞাসা করা হল, গাঁধীজিকে যে গডসে হত্যা করেছিল, সে কে ছিল? সে বলল, গাঁধীর সিকিয়োরিটি গার্ড হবে। মানে, ইন্দিরা গাঁধীকে তাঁর সিকিয়োরিটি গার্ড মেরেছিল, মহাত্মা গাঁধীকেও তাঁর সিকিয়োরিটি গার্ড মেরে থাকবে! এই যে একেবারে ইতিহাস না-জানা, এখানটায় ঢুকে গিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেক নিউজ় ইত্যাদি। এই কারণেই সাংস্কৃতিক চেতনার গুরুত্বের কথা বলছি। বিভিন্ন আর্থিক প্রশ্ন নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি মানুষের চিন্তা-চেতনার স্তরেও আন্দোলন জরুরি। চল্লিশের দশকের যে ইতিহাস— এক দিকে দাঙ্গা হচ্ছে, অন্য দিকে ওই সময়েই কিন্তু ট্রাম শ্রমিকদের একটা আন্দোলন কলকাতার বুকে একটা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। তা হলে আজকে যদি এই ভাটপাড়া অঞ্চলে, এই জুট মিল এলাকায় যে ভাবে হিন্দু-মুসলিম, হিন্দিভাষী-বাংলাভাষী— এই ভাবে একটা বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে অবশ্যই শ্রমিক ঐক্যটাও দরকার। যেমন দরকার কৃষক ঐক্য। আমাদের বাংলায় লালন, শ্রীচৈতন্য থেকে শুরু করে যে পুরনো সম্প্রীতির ঐতিহ্য, সেটাও ফিরিয়ে আনা দরকার। এটা একটা বহুমাত্রিক ব্যাপার, সাম্প্রদায়িকতাকে আটকানোর জন্য যা খুব জরুরি।

প্র: একটু ফিরে যাই। যে সামাজিক আন্দোলনগুলির কথা আপনি বললেন, সেগুলি তো প্রধানত অধিকার রক্ষার আন্দোলন...

উ: অধিকার এবং মর্যাদা, সম্মান— দুটোই খুব অঙ্গাঙ্গি যুক্ত। আমরা দেখেছি, আমাদের পার্টির তো, প্র্যাক্টিক্যালি, পশ্চিমবঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পরে বিহারে যখন আন্দোলন শুরু হয়, সেখানে মানুষের মর্যাদার প্রশ্নটা খুব বড় ব্যাপার ছিল। সবার জমি, মজুরি বৃদ্ধি, এ সব প্রশ্ন নিশ্চয়ই থেকেছে। কিন্তু দলিত জনগণের যে একটা সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন, বিভিন্ন দৈনন্দিন ব্যাপারে, আমরা সেই মর্যাদার প্রশ্নে আন্দোলন করতে করতে বড় হয়েছি।

এ বার এটাকেই যদি আর একটু বাড়িয়ে দেখি, শেষ পর্যন্ত দেশপ্রেমের একটা কাউন্টারন্যারেটিভ তৈরি করা যায়। দেশপ্রেম সম্পর্কে বিজেপির ধারণাটা হচ্ছে আমরা সবাই ভারতমাতার সন্তান, গোমাতার সন্তানও বলতে পারেন। এখন জয় শ্রীরাম বলতে হবে, ইত্যাদি। কিন্তু, যদি ১৮৫৭-য় ফিরে যাই, আজিমুল্লা যে গানটা লিখেছিলেন, প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের অ্যান্থেমটা, জনগণমন বা বন্দে মাতরম্, বা সারে জাহাঁসে অচ্ছা-র পাশাপাশি সেটাও থাকা উচিত: হম হ্যাঁয় ইসকে মালিক, হিন্দোস্তাঁ হমারা। ফিরিঙ্গি বাইরে থেকে এসে দেশটাকে লুটেপুটে নিয়ে যাচ্ছে, এর মালিক হচ্ছি। সেই মালিকের বোধটাই যখন সংবিধানে আসে... 

প্র: দি আইডিয়া অব দ্য রিপাবলিক...

উ: সংবিধানে বলছে: উই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া, এ সংবিধান অন্য কোথাও থেকে আসেনি, আমরা নিজেদের এ ক্ষমতা অর্পণ করছি। দেশের মানুষই ক্ষমতার উৎস, শ্রমজীবী মানুষই দেশের মালিক। এখন যা চলছে, এখানে শ্রমিক কৃষকের, তার মর্যাদা ও অধিকারবোধের কোনও জায়গা নেই। সে অধিকার শুধু এই নয় যে, কোনও সরকার আমাকে একটা ভাতা দেবে, কেউ কন্যাশ্রী দেবে, কেউ একটা ‘রেগা’ দেবে, কেউ স্বচ্ছ ভারতের নাম করে শৌচালয়ের জন্য কিছু পয়সা দেবে, তারা শুধু দেবে, আর আমরা শুধু পাব। আজকের রাষ্ট্র নাগরিককে প্রজার স্তরে নামিয়ে দিয়েছে। 

আগে আমরা অম্বেডকরকে সে ভাবে পড়িনি। ভারতবর্ষে যখন সংবিধান গৃহীত হচ্ছে তখন এই কথাটা অম্বেডকর কিন্তু জোর দিয়ে বলেছিলেন। সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বল-এ লিবার্টি, ইকোয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি, জাস্টিস— এই ব্যাপারগুলো অধিকার হিসেবে আসছে। অম্বেডকরের ভাষণটা দেখুন, সংবিধান সভা বা গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে, একেবারে পরিষ্কার বলছেন, ভারতবর্ষের যে মাটিটা, তার এখনও গণতান্ত্রিকীকরণ হয়নি, একটা অগণতান্ত্রিক জমির ওপরে একটা গণতন্ত্রের পরত— টপ ড্রেসিং অব ডেমোক্র্যাসি— সংবিধানের মধ্যে দিয়ে এল। অর্থাৎ, এই সংবিধানের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনা আছে, কিন্তু ভারতবর্ষের যে সামাজিক প্রেক্ষাপট, যেখানে জাতি-ধর্মের নামে, বিভিন্ন কুসংস্কারের নামে বৈষম্য এত বেশি, সেটার ওপর দাঁড়িয়ে সেটা চরিতার্থ করা যাবে না। এই সংঘাতের সমাধানটা কী? সমাধানটা হচ্ছে, যে-জমির ওপর সংবিধান দাঁড়িয়ে আছে সেই জমিটারও গণতন্ত্রীকরণ— সামাজিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে। আজ রিপাবলিক আছে নামে, কিন্তু তার জায়গায় একটা রাজা এবং প্রজার সম্পর্ক চলে আসছে। সেই মনুস্মৃতি, সেই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, সেই জাতিপ্রথা, সেই মহিলাদের, দলিতদের, আদিবাসীদের দ্বিতীয় শ্রেণির, তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত করা হয়েছে।

আমাদের তিনটে দিকেই খুব ভাল করে ভাবা দরকার। এক, যে ভাবে কর্পোরেটের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছে, এত খোলাখুলি এই বড় পুঁজিপতিদের এ-রকম প্রভাব আগে দেখা যায়নি। দুই, যেটা আরএসএস করে এসেছে— সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ। আর তৃতীয় দিকে হচ্ছে, ওই, মনুস্মৃতি। অম্বেডকর চেয়েছিলেন, সংবিধান যত এগোবে, সমাজকাঠামোটা ভাঙতে হবে, সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গকে এগিয়ে আনতে হবে। সেই জায়গায় আমাদের আবার পিছন দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এই তিনটে জায়গাতেই সমান ভাবে, সচেতন ভাবে, এবং সজাগ ভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।