আসছে বছর আবার হবে! উৎসবের পরেই আবার উৎসব! বর্ষপঞ্জী নবরূপে প্রকাশ পেলে শুধু সংখ্যা বদলে যায়। বচন মন্ত্রবৎ ধ্রুব! দুর্গামাইক্কি জয়! ক’দিন আগেই ছিল বিশ্বকর্মামাইক্কি, গণেশমাইক্কি! সবাই জানে, মাইক্কি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বল্লোহরি হর্‌রিব্‌ল না বললে মরদেহের যেমন ছন্দে ছন্দে গতি হয় না, তেমনই মাইক্কি না বললে বিসর্জন অচল!

দুর্গোৎসব আয়তনে বৃহৎ বলে তার বিসর্জনের রেশ এখনও চলছে। কোনও কোনও বারো-ইয়ারি মণ্ডপে সাজ খুলে ফেলার পালা চলছে, শুধু মঞ্চ বাকি। সেখানে মা লক্ষ্মী একাকিনী প্রতীক্ষায়। কোজাগরী চাঁদ উঠবে কখন! তারপর পূজা ও পরিত্রাণ! ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ গাইতে গাইতে তিনি চন্দ্রলোকে পিঠটান দেবেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ সব বাঁশ, সব আলো, সব গান খোলা হয়ে গেলেই আবার মুখব্যাদান করবে কতক লৌকিক এবং অবশ্যম্ভাবী চাহিদা! কতক বাস্তব ও নিরলঙ্কার প্রসঙ্গ। মূল্যবৃদ্ধি, ভাতা, বেকারত্ব, কর্মহারা, শেয়ার বাজারের মন্দা, টাকার দামের অবদমন, জিডিপির গতিরোধ! মা লক্ষ্মী একলা কী করবেন?

পূজার মহিমময় ম্যারাপে কান পেতে ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, এবার অনেক পূজায় বাজেট ছাঁটতে হয়েছে। ধারবাকিতে বাজার ছেয়ে আছে। শিল্পী, উদ্যোক্তা, ইলেকট্রিশিয়ান প্রমুখ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে উদ্বিগ্ন ও হয়রান। কেনাবেচাও ব্যবসায়ীদের খুশি করতে পারেনি। উৎসবের সঙ্গে বাণিজ্যের নিবিড় যোগাযোগ। বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলে উৎসবের রোশনাই বাড়ে। আবার লোকের হাতে ব্যয় করার সার্মথ্য থাকলে বাজার চাঙ্গা হয়। সেই সামর্থ্য আসে যদি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্যম, উদ্যোগ ও সাফল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়। আবার সেই উল্লম্ফন তখনই সম্ভব যখন বাজার গরম। এ যেন অনিঃশেষ সম্পর্ক! তাই এ দেশ ও এ রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি প্রশ্ন মহোৎসবেও নাকের ডগায় আঁচিলের মতো স্ফুরিত ছিল। লোকে ততখানি ব্যয় করছে না, যা অতীতে করেছে। এই ব্যয়কুণ্ঠার কারণ বৈকুণ্ঠে বসে লক্ষ্মীদেবী নির্ণয় করবেন হয়তো। আপাতত, সদ্যসমাপ্ত মহোল্লাসের আলো নিভে যাওয়ার পর এই বোধ প্রকট হয়েছে যে, জনমানসে সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ভয় ঘাঁটি গেড়েছে। যাঁরা চিরদরিদ্র, তাঁদের নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। কিন্তু এক নব্য দারিদ্র সমাজে দেখা দিয়েছে, যা স্পষ্ট ও আতঙ্কজনক। সেই নব্যদরিদ্র হচ্ছেন বিপুল সংখ্যক মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ, যাঁরা ক্রমাগত চাকরি খোয়াচ্ছেন, ছোট ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন, এমনকি বহু সংখ্যক ব্যক্তি, যাঁরা খাতায়কলমে কর্মরত কিন্তু মাসের পর মাস বেতনবিহীন! এঁরা শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহক, নির্দিষ্ট মানের জীবনযাপনে অভ্যস্ত। উৎসবের সজ্জা স্বর্ণজড়ির কারুকাজ করা চাদরের মতো ঢেকে রেখেছিল যাবতীয় অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা। আবার সেইসব প্রকাশিত হচ্ছে। দুর্মূল্যের বাজারে বিজয়া দশমীর জোড়া ইলিশ ঘর আনতে পেরেছেন ক’জন? উৎসব শেষ হলে সমস্ত পরিস্থিতির প্রতীকায়ন হয় গঙ্গার ঘাটে। কিংবা অন্যত্র, হয়তো গঙ্গা নয়, হয়তো জলঙ্গী, ইছামতী, তিস্তা বা কালজানি— কিন্তু দৃশ্য এক। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মূর্তি, জলের পানায় জড়িয়ে থাকা চুল, উঁচিয়ে থাকা কাঠামো! দেখলে শিউরে উঠতে হয়।

যে বিপুল সংখ্যার মানুষজন প্রায় দশদিন দশরাতব্যাপী উৎসবে অংশগ্রহণ করেন, তারিফ করেন প্রায়-অলৌকিক মণ্ডপসজ্জার, দেবদেবীর মূর্তি যাঁদের নয়ন তৃপ্ত করে, দলবদ্ধ অঞ্জলিতে যাঁরা ধন দাও, রূপ দাও, আরোগ্য দাও ইত্যাদি প্রার্থনা জানান, তাঁরাই উৎসব-শেষের ওই ছিন্ন-দীর্ণ, টুটা-ফাটা শিল্পদশা কী ভাবে সহজমনে গ্রহণ করেন? যদি ধরে নিই যে, মনে মনে যন্ত্রণা পাচ্ছেন তাঁরা, বাইরে দৈনন্দিন রুজি-রোজগারের তাড়নায় উদাসীন থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তা হলে ওই নদীপাড়ের দেবদেবীর অন্তিম বীভৎসতা ও ঔদাসীন্য মিশিয়ে প্রতীকায়িত করতে হবে। স্বার্থপরতার মতো, দারিদ্রের মতো উদাসীনতাও এক সামাজিক অসুখ, যে অসুখে এ দেশের জনসাধারণ ভুগছেন। কম-বেশি আমরা সবাই তার অন্তর্ভুক্ত! সে কারণেই উৎসবমুখরতার অন্য একটি মুখ আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। সেই মুখ যতই প্রতারক হোক, প্রয়োগকারীরা থাকেন নিঃসংশয়, নির্বিকার! কেমন সেই মুখ?

ধরা যাক, যেবার লাটুরে ভূমিকম্প হয়েছিল, আমরা মহোৎসব করেছিলাম। যেবার গোধরা হল, বাবরি হল, ভুজ হল, যেবার কেদার-বদ্রী ভেসে গেল, মুম্বইয়ে সন্ত্রাসবাদীরা হানা দিল, বন্যায় ভেসে গেল কেরল, এমনকি এবারেও পটনা-সহ বিহারের বিরাট অংশ বন্যায় নাকাল— তখনও আমরা উৎসবের আলোয় মেতেছি। উৎসব কথাটার মধ্যে যে নিহিত বৈভব, তার মাদকতা এড়ানো মুশকিল। সেই মাদকতা অনেক কিছু ভুলিয়ে দিতে পারে। বাচ্চার হাতে সেলফোন ধরিয়ে দেওয়ার মতো! সুখ-শান্তি-নিরাপত্তা, যা কিনা প্রতিটি প্রাণীর কাম্য, তার জন্য মানুষের প্রধানত প্রয়োজন যে অর্থনৈতিক স্থিতি, উৎসব সেই স্থিতির প্রকাশ হতে পারে, আবার তার বিপরীতে অস্থিতি ঢেকে এক মেকি-ঔজ্বল্য রচনা করে মাদক-ধর্মে মানুষকে সাময়িক ভুলিয়ে রাখতে পারে! এই তো গেল দুর্গোৎসব। এর পর কালী, জগদ্ধাত্রী, তারপর বাসন্তী। এরই মধ্যে ঢুকে পড়বে গান উৎসব, নাটক উৎসব, কবিতা উৎসব, খাদ্য উৎসব, বস্ত্র উৎসব, ফিল্ম উৎসব। হাতের কাছে যা মেলে, একটা করে ধরো আর উৎসব লাগিয়ে দাও! ফাউ বড়দিন, মনসা, ঘেঁটু, নববর্ষ, রবীন্দ্রজয়ন্তী— এসব তো আছেই।

সবাই না হোক, এই উৎসব এক একটি অংশকে মাতিয়ে রাখে বটে। এগুলোর জন্য প্রত্যেকবার ম্যারাপ, প্রত্যেকবার আলো, প্রত্যেকবার বাঁশ খোলা, কাপড় খোলা, রাস্তা বন্ধ, আবর্জনার স্তূপ, বর্জিত খাদ্য ও ভুক্তাবশেষে হাওয়া পূতিগন্ধময়।

তা হলে আমরা উৎসবমুখরতায় আসলে কী পেলাম? সুন্দরের পরেই কদর্যতার দার্শনিকতা! ন্যায্য প্রাপ্তি ভুলে থাকার হাতছানি, ন্যায়-অন্যায় বোধের দ্বন্দ্ব লোপ!

হ্যাঁ, উৎসবে কিছু লোক করে খায়। ম্যারাপওয়ালা, মজুর, বিদ্যুৎশিল্পী, রাঁধুনে, ক্যাটারার, মাইকওয়ালা, কিছু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী। বিনিময়ে কিছু লোক আমোদ পায়। কিছু লোক ক্ষমতা সঞ্চয় করে। কিছু লোক ব্যর্থতা ঢেকে দেয় রঙের ফোয়ারায়। কিন্তু বাকি সব?

একটা হিসেব কিছুতেই মেলে না। এ রাজ্যে শিল্প নাই, চাকরি নাই, চারিদিকে হাহাকার! অথচ মা দুর্গার জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ। কারা দেয়? কোথা থেকে আসে? বিজ্ঞাপন? চাঁদা? অনুদান? তা হলে হাহাকারের সামনে-পিছনে চওড়া প্রাচীর আছে। ওপারে অর্থ উদ্ভৃত্ত, এপারে দারিদ্র ক্রমবর্ধমান!

উৎসবের উদ্যোগ যদি সরকারি হয়, যে ব্যয়ভার জনগণের। তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দিচ্ছেন। যদি উদ্যোগ বেসরকারি হয়, তবুও তার মূল্য দেন জনগণ। যে সংস্থা বিজ্ঞাপন দেবে, সেই মূল্য সে তো তার গ্রাহকের থেকেই আদায় করবে। চাঁদা আদায় তো প্রত্যক্ষ পীড়ন! তাই বলে কি উৎসব হবে না? হোক, হোক! এ জীবন দু’দিন বই তো নয়। এই আজই পরের বছরের জন্য কত চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়ে যাচ্ছে! গুগল ক্যালেন্ডারে দেখে রাখতে হবে পরের পুজোর দিনক্ষণ! এখন থেকেই আমোদ-প্রমোদ-ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হবে!

বাজনদারের শান্ত ছেলে আধময়লা জামা পরে কাঁসর-ঘণ্টা বাজায় বলে মা দুগ্গা কি বেনারসি পরেন না?

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)