E-Paper

কৃষকের স্বার্থরক্ষা

প্রশ্ন উঠতে পারে, আর কত দিন কৃষির বাজারের দরজা আটকে রেখে ভারতীয় কৃষকদের ‘স্বার্থরক্ষা’ করা হবে? আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়ানোই কি উন্নতির প্রকৃষ্ট পথ নয়?

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:০৫

ভারতের কৃষক, পশুপালক ও মৎস্যজীবীদের সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনও অহিতকারী নীতির সামনে মোদী নিজে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। ভারত নিজের কৃষকদের হিতের সঙ্গে কোনও সমঝোতা করবে না।” নিজেকে প্রথম পুরুষে সম্বোধন করা প্রধানমন্ত্রীর পুরনো অভ্যাস। ২০২৫-এর স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে এ কথাগুলি বলেছিলেন তিনি। ছ’মাস কাটার আগেই ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে কথাগুলি তাঁর দিকে প্রশ্নচিহ্ন সমেত ফিরে আসছে— সত্যিই কি তিনি ভারতের কৃষকদের স্বার্থের সঙ্গে কোনও সমঝোতা করবেন না? অনুমান করা চলে, ভারতীয় কৃষির রাজনৈতিক বাস্তবে ‘কৃষকের স্বার্থরক্ষা’-র অর্থ, কৃষির বাজারটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত না-করা। যে কোনও বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেই ভারত এত দিন কৃষিকে বাইরে রাখতে সমর্থ হয়েছে— এটি ভারতের দীর্ঘকালীন আর্থ-কূটনৈতিক অবস্থান। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে স্পষ্ট যে, ভারত সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তার ভাল-মন্দের কথা পরে, প্রথমে এই বিচ্যুতি লক্ষণীয়।

চুক্তির সমর্থকরা দু’টি যুক্তি পেশ করছেন— এক, ভারত এমনিতেই অনেক কৃষিপণ্য আমদানি করে, ফলে সেগুলিতে শুল্ক কমলে কৃষকের ক্ষতি হবে না, কিন্তু উপভোক্তার লাভ; এবং দুই, ভারত এমনিতেই অনেক কৃষিপণ্য আমদানি করে, ফলে সেগুলিতে শুল্ক কমলে কৃষকের ক্ষতি হবে না, কিন্তু উপভোক্তার লাভ মুশকিল হল, অর্থনীতি বস্তুটি স্বতঃপরিবর্তনশীল। ধরা যাক, আজ যে কৃষিপণ্যের আমদানি ভারতের মোট চাহিদার অর্ধেক, সে ক্ষেত্রে সস্তা আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে ঢুকলে কাল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের চাহিদা কতখানি কমবে, তা আজ জানার উপায় নেই। কাশ্মীর-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফলচাষিরা সে বিপদের আশঙ্কাতেই বিক্ষুব্ধ। পণ্য সস্তা হলে নিঃসন্দেহে উপভোক্তার লাভ, কিন্তু কৃষিজীবীর ক্ষতি। সরকার কার স্বার্থ রক্ষা করছে, সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আবার, আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্যের উপস্থিতি দেশের ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদার ধরনটিও পাল্টে দিতে পারে— তারও প্রভাব পড়তে পারে দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদনের উপরে। কিন্তু, তার চেয়েও বড় কথা হল, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে স্পষ্ট যে, ভারত চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে। এই আত্মসমর্পণের ঘটনাটি গোটা দুনিয়া খেয়াল করল, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকা চলে। অতএব আশঙ্কা থেকেই যায় যে, ভবিষ্যতে অন্য কোনও দেশ— বিশেষত, আর্থিক ভাবে তুলনামূলক উন্নত অবস্থানে থাকা দেশ— ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি রূপায়ণের সময় কৃষির বাজার খোলার জন্য এমন ভাবেই চাপ দেবে। সে চাপ সামাল দেওয়ার সাধ্য ভারতের আছে কি না, মোদী প্রশাসনের দুর্বল কূটনীতি সেই প্রশ্নটি তুলে দিল।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আর কত দিন কৃষির বাজারের দরজা আটকে রেখে ভারতীয় কৃষকদের ‘স্বার্থরক্ষা’ করা হবে? আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়ানোই কি উন্নতির প্রকৃষ্ট পথ নয়? এখানেই ‘কৃষকের স্বার্থরক্ষা’ কথাটির বৃহত্তর অর্থ, যে কথায় রাজনীতি কখনও প্রবেশ করে না। ভারতীয় কৃষি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অসমর্থ, কারণ এ দেশে উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম। এবং, সেই ঘাটতির কারণ হল, কৃষি-গবেষণায় যৎসামান্য বিনিয়োগও হয় না। বিশ্ববাজারের দরজা যদি খুলতে হয়, তবে আগে সে ঘাটতি পূরণ করতেই হবে। ভারত কৃষিক্ষেত্রে বিশ্বায়নের পথে হাঁটবে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতা তাকে প্রভাবিত করলে তা যেমন ভুল, তেমনই আন্তর্জাতিক চাপ ঠেকাতে গিয়ে বিবেচনাহীন ভাবে দরজা খুলে দেওয়াও ভুল। নীতি এবং কৌশলের মধ্যে ফারাক অনপনেয়। কেন্দ্রীয় সরকার যদি সে কথাটি বিস্মৃত হয়, অথবা সচেতন ভাবে দেশবাসীকে তা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা অন্যায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Indian Farmers India-US Trade Deal India-US agriculture

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy