কিছু বছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গে একটি সরকারি স্কুলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি একদল ছেলে স্কুলের সামনে ক্রিকেট খেলছে। কৌতূহলবশত এক জনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অ্যাই, তোরা স্কুলের সময় খেলছিস কেন? ক্লাস নেই?’ বাচ্চাটি নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল, ‘স্যার তো আজ আসেননি।’ স্যারের বাড়ি অনেক দূর, তাই মাঝে মাঝেই এমন আসেন না, তখন তারা খেলে।’
ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার সমস্যাগুলিকে নিয়ে নানা আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, চল্লিশের দশকের শেষের দিকে এ দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নথিভুক্তি বা অন্য নানা শিক্ষা-সূচক চিনের সঙ্গে তুলনীয় ছিল। প্রায় অর্ধশতক পরে ২০০০ সালে ওয়ার্ল্ড এডুকেশন ফোরাম-এর প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যালয়ে নথিভুক্তিকরণ এবং প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মানের পরিপ্রেক্ষিতে চিন ভারত থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে গিয়েছে। এর পরে ২০১০ সালে ইউনেসকো-র একটি প্রতিবেদন বলছে, শিক্ষা উন্নয়ন সূচকের নিরিখে ১২৮টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫তম। সূচকগুলির নিরিখে ভারত এখন পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা আফ্রিকার বেশ কিছু দেশের সঙ্গে একই সারিতে।
গত বছরের শেষ দিকে হাতে এসেছিল প্রাথমিক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং লিঙ্গসমতা— এই তিনটি বিষয়ে প্রতীচী ট্রাস্ট-এর নানা মূল্যবান সমীক্ষা ও বিশ্লেষণের ফলাফল সংবলিত একটি বই: আলোচনার জন্য (গাঙচিল)। তিনটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত, কিন্তু শিক্ষাজগতের মানুষ হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা নিয়ে লেখাগুলি আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। বইটির বিভিন্ন লেখা স্কুলের পরিকাঠামোগত অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়, প্রাথমিক শিক্ষার রূপায়ণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক প্রভাবগুলি কী ভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কেও একটি পরিষ্কার ছবি তুলে ধরে। বিশেষ করে স্কুল চালানোর ক্ষেত্রে এক জন শিক্ষকের স্বাধীনতা, শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবকদের মধ্যে সম্পর্ক, প্রাথমিক স্তরেও প্রাইভেট টিউশনের দাপট এবং সিলেবাসের অত্যধিক চাপ— এ সব বিষয়ে জরুরি কিছু তথ্য উঠে আসে। এ ছাড়াও বইটিতে বেশ কিছু লেখা থেকে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের মান নির্ণায়ক পদ্ধতি (যেমন পাশ-ফেল), এ রাজ্যে ক্রমাগত বেড়ে ওঠা অপুষ্টি ইত্যাদির মতো বিষয়গুলিকে ঠেকাতে মিড-ডে-মিলের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি নানা জটিল ও বিতর্কিত বিষয় সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়। এ সব বিষয় তুলে ধরতে লেখাগুলিতে যেমন নানা জায়গায় তত্ত্বের কথা আলোচনা করা হয়েছে, তেমনই তথ্যের মধ্য দিয়ে সে তত্ত্বের যুক্তিনির্ভর বিচারও করা হয়েছে। আবার কোথাও শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের সাক্ষাৎকারগুলিকে বিশ্লেষণ করে বিষয়গুলিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলা হয়েছে।
যেমন, কুমার রাণা ও অমর্ত্য সেন লিখছেন: অকৃতকার্যতার দায়টা একান্ত শিশুর নয়, এটা একটা বড় সামাজিক সত্য। এই ভ্রান্তি দূর করতে হলে শিশু কৃতকার্য হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারছে কি না এবং কোথায় সে আটকাচ্ছে, এটা দেখা খুবই জরুরি। কোথায় গিয়ে তারা আটকে যাচ্ছে? শুভ্রা দাশ লিখছেন: গ্রামের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম, অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে তাদের মায়েদের সঙ্গে সমান তালে বিড়ি বেঁধে চলেছে। বা রেজিনা খাতুন পড়াশোনার পাশাপাশি দোকানটাও চালায়। আবার কোনও লেখাতে দেখছি, এই সমস্যাগুলো রেখেই শিক্ষক মহাশয় অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে বেরিয়ে ছাত্রদের পড়াচ্ছেন এবং সাফল্যও আসছে হাতেনাতে।
বইটিতে বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার দু’রকম ছবি তুলে ধরা হয়েছে। এক দিকে রয়েছে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকেদের সব কিছুতেই অপ্রসন্নতা— কলকাতায় বসে সমস্ত সুযোগসুবিধার মধ্যে থেকে তাঁরা অনুধাবনই করতে পারেন না, একটা প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক স্কুল চালাতে গেলে কত রকম অসুবিধার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। তাঁরা কখনও শিক্ষকের ওপর বা কখনও গরিব বাচ্চাগুলোর অপারগতা বা বাবা-মায়ের অজ্ঞতার ওপর দায় চাপিয়ে দেন। সমস্যা তো আছেই। যেমন অনেক স্কুলেই পরিকাঠামো তেমন উন্নত নয়। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার থাকে না অনেক ক্ষেত্রেই। এর উপর রয়েছে প্রাইভেট টিউশনের ডামাডোল। এ সব কিছুই শিশুমনে যথেষ্ট চাপ ফেলে।
বইটিতে এক জায়গায় স্বাগত নন্দী লিখছেন: সমাজের উপরতলা থেকে নেমে আসা সর্বগ্রাসী প্রাইভেট টিউশনের ছায়া সমাজের নীচের স্তরগুলোতেও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিক্ষা, দৈনন্দিন জীবনযাপন— সবেতেই তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে, যেখানে এক জন প্রাথমিক স্কুলের শিশু অনায়াসে বলে ফেলে, ডাংগুলি বা চু-কিত-কিত খেললে তার ইমেজ খারাপ হয়ে যাবে। অন্য দিকে, এমন কিছু শিক্ষকও আছেন, যাঁরা স্কুলের বাচ্চাদের নিজের সন্তানের থেকে কম কিছু স্নেহ করেন না। সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি লেখায় পড়লাম, বারুইপুরের এক শিক্ষক বলছেন, স্কুলে বাচ্চাগুলি ইংরাজি শুনলেই ভয় পেত, কিন্তু নতুন নতুন পদ্ধতিতে পড়িয়ে এখন ক্লাসে ইংরাজিতে কথা বললে ওদের আগ্রহ বাড়ে। যে বাচ্চাগুলো দু’দিন আগে বাংলাটাই গুছিয়ে বলতে পারত না, তাদের মুখে ইংরাজি শব্দগুলি শুনলে ওঁর গর্ব হয়। এই ঘটনাগুলিই আমাকে ভেনেজুয়েলার কিছু কমিউনিটি-ভিত্তিক স্কুলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, যেখানে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কটা বেশ আন্তরিক। শহরের দামি প্রাইভেট স্কুলে এই আন্তরিকতা হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
একটি যুক্তিবাদী সমাজ তৈরি করতে গেলে শিক্ষাব্যবস্থাটাকেও যথাযথ ভাবে তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমানের কর্পোরেট সমাজ যেখানে ক্রমাগত সমাজের খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে আরও নীচের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে, সমাজের চরম অসাম্য সৃষ্টি করতে চাইছে, যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমাজের মানবিক মুখটাকে মাথা তুলেই দাঁড়াতে দিচ্ছে না বা ধর্মের নামে মৌলবাদীরা যখন উগ্র দেশপ্রেমকে আরও লেলিয়ে দিতে চাইছেন, তখন যুক্তিনির্ভর শিক্ষাই আমাদের আশার আলো দেখাতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে গবেষণারত