E-Paper

ওঁদের পাশে দাঁড়াব না?

ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর কারিগর যাঁরা, তাঁরা ঠিক করেছেন, এ দেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের তাড়াবেন। খ্রিস্টানদেরও তাঁরা ছেড়ে কথা বলছেন না। একের পর এক সংখ্যালঘু মানুষ খুন হয়েছেন, গরু পাচারকারীর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নৃশংস নির্যাতন করা হয়েছে তাঁদের উপর।

শান্তিলতা গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৪

আমরা সমাজকর্মীরা বিভিন্ন কর্মশালায় ‘পাওয়ার-ওয়াক’ করি, যার অর্থ, ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার চেষ্টা করা। দেখা যায় আমাদের সমাজে সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটি হলেন ধনী, উচ্চবর্ণের, তথাকথিত ‘উঁচু’ জাতের, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের, তথাকথিত সবল দেহ ও মনের অধিকারী সিস-পুরুষ। এঁদের হাতেই ক্ষমতার ভান্ডার। এর পর পরিচিতির প্রান্তিকতা অনুসারে ধীরে ধীরে নাগরিক ক্ষমতা ও অধিকার হারাতে থাকেন। সবচেয়ে কম ক্ষমতা মুসলমান, দলিত, প্রতিবন্ধী, মেয়ে অথবা কুইয়ার মানুষের হাতে। এই ক্ষমতার তারতম্য স্থান, কাল, ক্ষেত্র রকমফের অনুযায়ী কমবেশি হতে পারে, কিন্তু প্রান্তিকতার মানদণ্ডগুলি এই সমাজে কাঠামোগত।

এই পরিচিতি-ভিত্তিক বঞ্চনা এবং প্রান্তবর্তী অবস্থান আমাদের সমাজের মজ্জাগত। এই যেমন, পম্পা (নাম পরিবর্তিত) এই শহরের এক জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্যাবচালক। সে রূপান্তরকামী মহিলা এবং নিম্নবিত্ত। অর্থাৎ, পম্পার প্রান্তিকতা বহুমাত্রিক। তার উপর সে এমন এক পেশা নির্বাচন করেছে, যে পেশাকে পিতৃতন্ত্র পুরুষের পেশা হিসেবে দেগে দিয়েছে। এমতাবস্থায় পম্পার লড়াই এক জন উচ্চবর্ণের, মধ্যবিত্ত, সংখ্যাগুরু সিস-মেয়ের থেকে বহু গুণ কঠিন। পম্পা তার যৌন পরিচিতির জন্য পরিবার থেকে বিতাড়িত, শ্রেণিগত অবস্থানের জন্য দৈনন্দিন রুটিরুজির সংগ্রামে জর্জরিত, তা ছাড়াও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বলে রাষ্ট্রের দ্বারা নির্যাতিত ও সমাজে ব্রাত্য। এত রকমের বঞ্চনা নিয়েও কিন্তু পম্পা লড়ে গিয়েছে এবং সে এখন এক সফল পেশাদার গাড়িচালক। সবাই তার মতো হয় না। অনেকেই তাঁদের বঞ্চনাগুলি নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে জীবন কাটান অথবা তলিয়ে যান।

এই প্রান্তবর্তিতা হল সমাজের কাঠামোগত সমস্যা, ক্ষমতার সিঁড়িকে জিইয়ে রাখার জন্য কৃত্রিম ভাবে তৈরি। মানুষে মানুষে এমন ব্যবধান আমরাই তৈরি করি, আমাদের রাষ্ট্র তৈরি করে। আর রাষ্ট্র যদি চরম দক্ষিণপন্থী ও সাম্প্রদায়িক হয়, তা হলে তারা এক রকমের নাগরিককেই স্বীকৃতি দেয়, বাকিদের মুছে ফেলতে চায়। যেটা এখন হচ্ছে এ দেশে।

ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর কারিগর যাঁরা, তাঁরা ঠিক করেছেন, এ দেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের তাড়াবেন। খ্রিস্টানদেরও তাঁরা ছেড়ে কথা বলছেন না। একের পর এক সংখ্যালঘু মানুষ খুন হয়েছেন, গরু পাচারকারীর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নৃশংস নির্যাতন করা হয়েছে তাঁদের উপর। বুলডোজ়ার দিয়ে মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেওয়া উত্তরপ্রদেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এনআরসি-র মাধ্যমে মুসলিম বিতাড়নের উদ্যোগ হয়েছে। শুধুমাত্র সন্দেহবশত এ দেশের পরিযায়ী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারকে অত্যাচার, এমনকি গর্ভবতী নারী ও তাঁর আট বছরের সন্তানকে বাংলাদেশি সন্দেহে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে।

এরই মধ্যে প্রাদেশিক নির্বাচনগুলিকে মাথায় রেখে শুরু হয়েছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন। এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রধানত মুসলমান ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের নাগরিকত্ব হরণ। সবর ইনস্টিটিউট-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৬১.৯ লক্ষ মহিলা, যাঁরা মূলত প্রান্তিক অবস্থানের। মুসলমান মানুষ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে এসআইআর-এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। নন্দীগ্রামে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৯৫% মুসলমান, ভবানীপুরে জনসংখ্যার ২০% মুসলমান, কিন্তু যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৪০% ইসলাম ধর্মাবলম্বী। অর্থাৎ, জনসংখ্যার অনুপাতের সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া সংখ্যার কোনও সঙ্গতি নেই।

এই ভয়ঙ্কর কর্মযজ্ঞ যখন চলছে, সেই সময়েই পাল্টে গেল ট্রান্সজেন্ডার আইন। পরিবর্তিত আইনে মোদ্দা কথা হল, নাগরিকের নিজের লিঙ্গ পরিচিতি নির্ধারণের অধিকার হরণ। তোমার জেন্ডার রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে। নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ এবং যাঁরা যৌনাঙ্গের গঠন অনুযায়ী সিস-নারী অথবা সিস-পুরুষ গোত্রীয় নন, তাঁরাই আইনত ট্রান্সজেন্ডারের স্বীকৃতি পাবেন। আইনের এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এক দিকে যেমন মানুষের জৈবিক গঠনকেইপ্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে এবং গোষ্ঠীর মধ্যকার সোপানতন্ত্রকে জোরদার করা হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই ব্যক্তির ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে, অন্তরের ‘আমি’-কে নস্যাৎ করা হচ্ছে।

নাগরিকের ধর্মীয় অথবা লিঙ্গপরিচয়ে রাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ কিন্তু দু’টি সমান্তরাল ঘটনা নয়। মানুষের পরিচয় নির্বাচনের এবং সেই অনুযায়ী জীবন যাপনের অধিকার যে কোনও দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি। আমাদের দেশে এই গণতন্ত্র আজ মুমূর্ষু। ইসলাম ধর্ম যা কিনা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে রয়েছে, এবং ট্রান্সজেন্ডার ও বিভিন্ন লিঙ্গপরিচয়ের মানুষ, যাঁরা সব দেশেই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে আছেন, তাঁদের বাদ দেওয়ার এবং অস্বীকার করার যে নজির আমাদের রাষ্ট্রসেবকরা গড়ছেন— তার মধ্যে একটা ‘হিন্দু রাষ্ট্র প্রোজেক্ট’ জ্বলজ্বলে স্পষ্ট। মুসলমান বিদ্বেষ যেমন সরাসরি হিন্দু আধিপত্য আকাঙ্ক্ষার ফল, তেমনই নতুন ট্রান্সজেন্ডার আইনও হিন্দু কট্টরপন্থী পদক্ষেপ, ভুললে চলবে না।

আজ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা একটু পাল্টে বলতে ইচ্ছে করছে, প্রান্তিক মানুষ বড় কাঁদছে। আমরা কি মানুষ হয়ে তাদের পাশে দাঁড়াব না?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

minorities West Bengal Politics Discrimination Society West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy