চিনের আয়বৃদ্ধির হার কমিয়াছে। অতএব, আর দুই বৎসরের মধ্যেই ভারত দুনিয়ায় বৃহৎ অর্থনীতিগুলির মধ্যে দ্রুততম হারে বৃদ্ধি পাইবে— এই মর্মে উল্লসিত হইবার বিপদগুলির কথা এক বার স্মরণ করিয়া লওয়া বিধেয়। প্রথমত, ‘বৃদ্ধির হার’ বস্তুটি নিরবলম্ব নহে। কোন স্তরের উপর বৃদ্ধি, সেই কথাটিকে সর্বদা স্মরণে রাখিতে হয়। চিন ও ভারতের আর্থিক অবস্থানে তুলনা চলে না। ফলে, বৎসরওয়াড়ি বৃদ্ধির হারে ভারত যদি বা চিনকে পিছনে ফেলিয়া দেয়, তাহাতে ইয়াং সিকিয়াং ও গঙ্গায় স্রোতের তারতম্য হইবে না। দ্বিতীয় কথা, চিনের অর্থনীতিই শুধু মজবুত নহে, ক্রমবর্ধমান আর্থিক অসাম্য সত্ত্বেও মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে চিন ভারতের তুলনায় বহু অগ্রসর। আর্থিক বৃদ্ধির হারে চিনকে ভারত খানিক পিছনে ফেলিয়া দিতে পারিলেও এই সূচকগুলির তারতম্য বদলাইবে না। অতএব, বৃদ্ধির হারের দুনিয়ায় এক নম্বর হইবার খোয়াবনামায় নির্বাচনী তরি ভাসিতে দেখিলে সাবধান হওয়া বিধেয়। সেই হারের গভীরে থাকা কথাগুলি স্মরণ করাইয়া দিতে হইবে।

চিনের আর্থিক বৃদ্ধির হার কমিবার তাৎপর্য বুঝিতে হইলে প্রথমে মনে রাখা প্রয়োজন, সেই দেশের অর্থনীতি বদলাইতেছে। এত দিন চিন পণ্য উৎপাদন ও রফতানির জোরে চলিত। তাহার মূল চালিকাশক্তি ছিল সস্তা শ্রম। এবং, অতি অবশ্যই, সস্তা ঋণ। কিন্তু, সেই বৃদ্ধির একটি সীমা আছে। বিশেষত, ডোনাল্ড ট্রাম্প-উত্তর দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদ যে পরিমাণ উগ্র হইয়া উঠিয়াছে, তাহাতে শুধু রফতানির জোরে দুনিয়ার প্রধানতম অর্থনৈতিক শক্তি হইয়া থাকা বিপজ্জনক। কথাটি চিন বুঝিয়াছে। ফলে, তাহাদের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অভিমুখ বিদেশ হইতে স্বদেশমুখী হইয়াছে। এই দফায় চিনের আর্থিক বৃদ্ধির সিংহভাগ ঘটিয়াছে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। ভোগব্যয়ের জোরে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীলতা কমাইয়া অর্থনৈতিক বৃদ্ধি চালাইয়া যাওয়ার বিকল্প মডেলের সন্ধান করিতেছে চিন। ‘মধ্য আয়ের অর্থনীতি’ হইতে ‘উচ্চ আয়ের অর্থনীতি’ হইয়া উঠিবার পথে ইহা জরুরি ধাপ। অন্য দিকে, সস্তা ঋণের কল্যাণে আর্থিক বৃদ্ধি হইলেও তাহাতে মূলধনের উৎপাদনশীলতা ক্রমহ্রাসমান হয়। এই ভারসাম্যগুলি বজায় রাখিবার প্রয়োজন ছিল। ২০১৮ সালে মাত্র ৬.৬ শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধিকে এই প্রেক্ষিতে দেখা প্রয়োজন। এই হার যে অদূর ভবিষ্যতে ফের আট বা দশ শতাংশের কক্ষপথে পৌঁছাইবে না, তাহা বলিবার সময় হয় নাই। 

ভারতীয় অর্থনীতি চরিত্রে পৃথক। পণ্য উৎপাদন কখনও ভারতের জোরের জায়গা ছিল না। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত রফতানি করে মূলত পরিষেবা। আর, অভ্যন্তরীণ বাজারের উপর নির্ভরতা ভোগব্যয়ের খাতে। এই মডেলের দুই প্রান্তে দুই সমস্যা। উগ্র জাতীয়তাবাদের ধাক্কা তো আছেই, তাহার উপর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধির অভ্যুদয়ে পরিষেবা ক্ষেত্রটির চরিত্র বহুলাংশে বদলাইয়া যাইতেছে। এত দিন অবধি যে সব কাজের জন্য প্রথম বিশ্ব ভারতের স্বল্প বেতনের মেধার উপর নির্ভরশীল ছিল, এখন সেই কাজের একটা বড় অংশ অনেক কম খরচে কৃত্রিম বুদ্ধির মাধ্যমে সারিয়া ফেলা সম্ভব। অন্য দিকে, মানব উন্নয়নের খাতে ভারত যাহাদের পিছনে রাখিয়াছিল, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের উপর নির্ভরশীল বৃদ্ধিকে তাহারাই পশ্চাতে টানিতেছে। চিনের সহিত বৃদ্ধির হারের দ্বৈরথে নামিবার পূর্বে এই দিকগুলিতে নজর দেওয়া বিধেয়। কারণ, যে শ্রমশক্তির যথেষ্ট শিক্ষা নাই, কারিগরি প্রশিক্ষণ নাই, যাহার স্বাস্থ্য ভঙ্গুর, তাহার ভরসায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জোরে উচ্চ বৃদ্ধির হার বজায় রাখা দুষ্কর। সমস্যা হইল, এই কথাগুলি নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে দুর্বোধ্য ঠেকে। সেখানে অতএব চিনকে হারাইবার হুঙ্কারই নেতাদের অস্ত্র।