সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘বিধি মেনে খোলে মদের দোকান, টিউশন বন্ধ!

একটি আত্মহত্যা অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শিক্ষিত বেকারদের বহুজন টিউশনের উপরে নির্ভরশীল। করোনাভাইরাসের কারণে তাঁদের আর্থিক সঙ্কট চূড়ান্ত। সুরাহার কিছু উপায়ের কথা বলছেন টিউশন শিক্ষকেরা। শুনল আনন্দবাজার

Tuition
স্কুল বন্ধ। টিউশনও বন্ধ। খুদেদের ভরসা বাড়ির বড়রা। নিজস্ব চিত্র

উচ্চ শিক্ষিত, ইংরেজি ভাষায় স্নাতকোত্তর পাশ। অথচ চাকরি মেলেনি। তা নিয়ে মনোকষ্টে থাকা অস্বাভাবিক নয়। ছিলেন কিনা জানা যায়নি। কিন্তু বেঁচে থাকার লড়াই বজায় রাখতে ঘাটালের অনুপ মাইতি টিউশন করতেন। সেই অবলম্বনও নষ্ট হয়েছিল করোনাভাইরাসের কারণে। তার পরেই আত্মহত্যা। অনুপের মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবেই কিছু প্রশ্ন তুলছে। 

দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে বহু শিক্ষিত বেকার টিউশনের উপর নির্ভরশীল। তাঁদের অনেকেই এই সময়ে অসহায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার বিজ্ঞানের গৃহশিক্ষক বাঙ্ময় মিশ্রের বক্তব্য, ‘‘গৃহশিক্ষকেরা সব দিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার থেকে তো আছেই। আবার বিদ্যালয় শিক্ষকদের কাছ থেকেও বঞ্চনা আসছে। বেকার টিউশনজীবীদের কথা কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের ভাবা উচিত। এই পর্বে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তা নাহলে আরও মৃত্যু বাড়বে।’’ তাঁর অভিযোগ, এই সময়ে টিউশন বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার গৃহশিক্ষকদের বেতন দেননি।

পশ্চিমবঙ্গ গৃহশিক্ষক কল্যাণ সমিতির রাজ্য কমিটির সদস্য বিজিত বিশ্বাস বলেন, ‘‘গৃহশিক্ষকেরা আর্থিক ভাবে একেবারে বিপর্যস্ত এই সময়। অনেকেই ঘর ভাড়া মেটাতে পারছেন না। ঠিক মতো খাওয়াদাওয়াও হচ্ছে না। আত্মসম্মানের কারণে ত্রাণের লাইনেও দাঁড়াতে পারেন না তাঁরা।’’ নারায়ণগড় ব্লক আনএমপ্লয়েড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য সুশান্ত পানিগ্রাহী জানান, ‘‘লকডাউনে মদের দোকান খুলে সামাজিক দূরত্ব বিধির ঘটনা আমরা দেখছি। অথচ বেকার গৃহশিক্ষকেরা কেন সামাজিক দূরত্ব বিধি মেনে টিউশন পড়াতে পারবেন না! শিক্ষিত বেকারেরা কী এভাবেই বঞ্চিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেবে?’’ গ্রামাঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকে গৃহশিক্ষকদের উপর নির্ভর করে। বেলদা গঙ্গাধর অ্যাকাডেমী স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র সমীরণ সিংহ, সুপর্ণ বেরা বলে, ‘‘গৃহশিক্ষকদের পাশে থাকা দরকার। আর এই লকডাউনে নানা প্যাকেজের ঘোষণা হচ্ছে। আমাদের গৃহশিক্ষকেরা কেন অন্তর্ভুক্ত হবেন না।’’

দশম শ্রেণির শেখ মোহাম্মদ জিশান হলদিয়া ডিএভি স্কুলের ছাত্র। তার কথায়, ‘‘স্কুলের পড়ার বাইরেও আমরা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়া করে নিতাম। এ বছর বোর্ডের পরীক্ষা দেব। বিশেষ করে অঙ্ক, পদার্থবিদ্যার মতো বিষয় বুঝতে প্রাইভেট টিউটরের সহযোগিতা খুব দরকার ছিল।’’ জিশান জানিয়েছে, তার বাড়িতে অভিভাবকেরা আলোচনা করেছেন স্যার এবং ম্যাডামদের টিউশনি করে সংসার চলে। তাই এই সময়ে বেতন না দেওয়া অনুচিত। বিপদের দিনে মানুষ যদি সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে দেয় তাহলে কোনও শিক্ষাই সম্পূর্ণ হয় না। হলদিয়ার বাংলা বিষয়ের গৃহশিক্ষক শুভাশিস মিশ্র। তিনি আতঙ্কিত। বললেন, ‘‘জানি না কী ভাবে সংসার চলবে। আমার মতো প্রায় ৪০০ প্রাইভেট টিউটর শুধুমাত্র টিউশন করে সংসার চালান। এই দুঃসময়ে ভাবতে অবাক লাগে অনেক ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবকেরা মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। মার্চ মাসে কিছুদিন পড়ানো হয়েছিল কিন্তু তারও পারিশ্রমিক পাননি অনেকে। অনেক অভিভাবকই কিন্তু শিল্পশহর হলদিয়ায় লক্ষাধিক টাকা বেতন পান। কিন্তু তারা টিউশন শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন না। আবার খুব সাধারণ পরিবারের মধ্যে মানবিকতা দেখেছি। বেশ কয়েকজন অভিভাবক আমাদের বেতন বাড়ি এসে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছেন। আমাদের মধ্যে অনেকেই অনলাইনে প্রাইভেট টিউশন করা শুরু করেছেন। কিন্তু সে-ও হাতেগোনা। ভাল মানের মোবাইল, নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সেই টিউশন কার্যত বন্ধ হতে বসেছে।’’ তিনি জানিয়েছেন, হলদিয়ায় সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরাও শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী পড়ান। তাঁরা যদি টিউশন নিয়ন্ত্রণ করতেন তাহলে শিক্ষিত বেকারদের সুবিধে হত। গৃহশিক্ষকেরা চান, সরকার প্রাইভেট টিউটরদের জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প নিক। 

ঝাড়গ্রাম জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কোঁকড়োর বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক নিত্যানন্দ সাউ প্রায় আশিজন ছাত্র ছাত্রীকে বিভিন্ন ব্যাচ করে পড়ান। তিনি বলেন, ‘‘এটাই আমার একমাত্র পেশা। এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে আর চালানো সম্ভব হবে না।’’ জামবনি ব্লকের প্রত্যন্ত আস্তাপাড়া গ্রামের শিক্ষিত যুবক তুষার বেজ। গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তুষার ঝাড়গ্রাম শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে প্রায় ৫০-৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়ান। সদ্য বিবাহিত তুষার বলেন, ‘‘প্রতিদিন জমা টাকা শেষ হয়ে আসছে। বাড়িভাড়া দিতেও সমস্যা হচ্ছে। অনলাইনে ক্লাস করলেও সেরকম বেতন আসছে না। সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ আমাদের অবস্থা ভেবে দেখা হোক।’’ বিনপুরের আঁধারিয়া গ্রামের ভূগোলে স্নাতকোত্তর যুবক ঝড়েশ্বর পাত্র। ভাইয়ের সঙ্গে ঝাড়গ্রামে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা। বাবাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়েও ওষুধের খরচ আর জোগাড় করতে পারছেন না। চিচড়া গ্রাম থেকে ঝাড়গ্রাম শহরে থেকে গৃহশিক্ষকতা করেন তমাল চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষিত বেকারদের একমাত্র ভরসা এই গৃহশিক্ষকতা। টিউশন বন্ধ হওয়ার পর কোনও বেতন পাচ্ছি না। সরকার ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করছে। যদি সামাজিক দূরত্ব মেনে ছোট ছোট ব্যাচ ও হোম টিউশনির অনুমতি দেন তাহলে একটু সুরাহা হয়।’’ 

বিপাকে পড়েছে আগামী বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। কেকেআই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র অভিলাষ মণ্ডল বলল, ‘‘অধিকাংশ সিলেবাস বাকি। অনলাইনে মাঝে মাঝে ক্লাস হলেও সব ঠিকঠাক বুঝতে পারছি না। খুব সমস্যায় আছি।’’ ঝাড়গ্রাম লায়ন্স মডেল স্কুলের দশম শ্রেণির অর্চিষ্মান কর বলে, ‘‘পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। নিজে তো অনেক কিছুই করতে পারছি না। মাধ্যমিকের প্রস্তুতি কেমন করে সম্পূর্ণ হবে তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’’ শ্রীরামকৃষ্ণ সারদাপীঠের মিনু সাউ ও শ্রেয়া চক্রবর্তী, ঝাড়গ্রাম বাণীতীর্থের তৃষা করণ একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের। এই ছাত্রীরা বলেন, ‘‘টিউশনি বন্ধ হওয়ার পর কোনও সাহায্য পাচ্ছি না। আমার গৃহশিক্ষকরা আসতে পারলে কিছুটা হলেও সমস্যা কাটত। একাদশের পরীক্ষা হল না। উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য এখন থেকেই সব বন্ধ থাকলে খুব সমস্যা।’’ 

পশ্চিমবঙ্গ গৃহশিক্ষক কল্যাণ সমিতির রাজ্য সভাপতি স্বপন সরকারও গৃহশিক্ষকদের অসহায়তার কথা বললেন। ‘‘গত দু’মাস থেকে আমরা টিউশনের বেতন পাচ্ছি না। সংসার চালানো এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা সম্ভব হয়ে উঠছে না। আমরা উচ্চ শিক্ষিত। তাই লজ্জায় লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতেও পারছি না। তাই লকডাউন চলাকালীন প্রতি মাসে যদি আমাদের সাম্মানিক দিয়ে সরকার সাহায্য করত তাহলে খুব ভাল হত।’’ সমিতির পক্ষ থেকে গত ৬ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রীকে সব ঘটনা জানিয়ে ইমেল করা হয়েছিল। তাঁদের অনুরোধ, মুখ্যমন্ত্রী যদি সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছোট ছোট ব্যাচ (৬-৭ জন) পড়ানোর অনুমতি দেন তাহলে তাঁদের সুরাহা হত। 

কোলাঘাটের ক্ষেত্রহাটের গৃহশিক্ষক দিলীপকুমার মাজি সংসার চালাতে হিমসিম। তাঁরও জমানো পুঁজি শেষ। তিনি বলছেন, ‘‘ভেবেছিলাম ১৭ মার্চের পর লকডাউন উঠলে ফের পড়ানো শুরু হবে। কিন্তু নতুন করে লকডাউন শুরু হওয়ায় টিউশনির ভবিষ্যৎ ফের অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।’’ দেউলিয়া হীরারাম উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র দীপন প্রামাণিক বলছেন, ‘‘আমি বরাবর শিক্ষিত বেকার গৃহশিক্ষকদের কাছে টিউশন পড়ি। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যেমন ভালভাবে পড়ান, ওঁরাও শিক্ষাদানে দক্ষ। ওঁদের কাছে টিউশনি পড়ে রেজাল্ট ভাল হয়। আমরা বিপাকে।’’

সময়ের সঙ্গে তাঁদের বিপাক বাড়বে? আতঙ্কিত গৃহশিক্ষকেরা।

 

তথ্য: বিশ্বসিন্ধু দে, আরিফ ইকবাল খান, কিংশুক গুপ্ত, দিগন্ত মান্না

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন