প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘স্মৃতি-বিস্মৃতির হিসাব’ (২৯-১) প্রবন্ধটি প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের দুর্নীতির শাসনকাল, অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং জাতীয় স্তরে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা ভাষাগত আধিপত্যবাদ ও এসআইআর-এর অভিযোগ— দুই মেরুতে বিভক্ত বাংলার রাজনীতি। কোন বিষয়টি নির্বাচনে বেশি প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার।
তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনে একাধিক সাফল্যের পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপশাসনের অভিযোগ একটি বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, কয়লা ও বালি পাচারের মতো অভিযোগ জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তৃণমূলের একাধিক হেভিওয়েট নেতার জেলবন্দি হওয়া দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি এবং পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতির অভিযোগে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট। আর জি কর হাসপাতালে মহিলা ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার মতো কুকীর্তি চাপা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য লোপাটের অভিযোগ, প্রতিটি দুর্নীতিকে প্রশাসনের ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা জনগণ ভাল চোখে দেখেনি।
অন্য দিকে, বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রধান অস্ত্র হল ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব এবং বাংলা-বিরোধী তকমা। এসআইআর বহু মানুষের কাছে এখনও একটি আতঙ্ক। নির্বাচন কমিশন কাজটি করলেও বিষয়টির পিছনে বিজেপি ও আরএসএস-এর পূর্ণ মদত আছে, সেটা জনমানসে পরিষ্কার। একাংশের ধারণা যে, বিজেপি রাজনৈতিক স্বার্থে সিবিআই বা ইডি-কে ব্যবহার করছে। এটি অনেক সময় দুর্নীতির বিষয়কে ছাপিয়ে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। হিন্দি বলয়ের দল হিসেবে বিজেপির পরিচিতি এবং এনআরসি নিয়ে ভীতি, বাংলাভাষীদের একটি বড় অংশকে (বিশেষত মুসলিম ও প্রান্তিক হিন্দুদের) শঙ্কিত করে রেখেছে। ‘বাংলা-বিরোধী’ তকমা থেকে বিজেপি এখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
ইতিহাস বলছে, পশ্চিমবঙ্গে মানুষ দুর্নীতির চেয়েও পরিচিতি, নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যদি বিজেপি নিজেকে একটি ‘বাঙালিবান্ধব’ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না-পারে এবং শুধুমাত্র দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ভোট চায়, তবে তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ ও ‘বাঙালি অস্মিতা’র কার্ড জেতা বিজেপির পক্ষে কঠিন হবে। অন্য দিকে, তৃণমূল যদি তাদের নিচুতলার দুর্নীতি দমন করতে না-পারে, তবে গ্রামবাংলার ‘নীরব ভোট-বিপ্লব’ সব সমীকরণ উল্টে দিতে পারে। মানুষের পেটের টান (দুর্নীতি) বনাম পিঠের টান (পরিচয়)— এই দ্বন্দ্বে ২০২৬-এর রায় নির্ধারিত হবে।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
স্মৃতির মেয়াদ
প্রেমাংশু চৌধুরীর ‘স্মৃতি-বিস্মৃতির হিসাব’ প্রবন্ধটি বাস্তবিকই চিন্তা-উদ্রেককারী। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আমার চিঠি। মানুষ নাকি মাত্র ছয় মাসের স্মৃতিকে সম্বল করে ভোট দিতে যান। রাজনীতিবিদরা কেউ কেউ মনে করেন ভোটারদের স্মৃতিতে কেবল মাত্র দু’-তিন মাসের ঘটনাগুলো থাকে। মানুষের স্মৃতি নিয়ে মতান্তর থাকতেই পারে, কিন্তু এটা সম্ভবত সর্বসম্মত নয়। এই সূত্রে একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ১৯৭০-৭২’এর সময়ে কংগ্রেস এ রাজ্যে যে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, তার তুলনা মেলা ভার। তার পর থেকে কংগ্রেস এ রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় আর আসতে পারেনি। সুতরাং, মানুষের স্মৃতির আয়ু নিশ্চিত ভাবেই এত ছোট নয়। নির্বাচনী ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের অবশ্যই প্রয়োজন ছিল কিন্তু পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেটা মানুষের নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিহারের নির্বাচনে রাহুল গান্ধী ও তেজস্বী যাদব ভোটার অধিকার যাত্রায় প্রচুর সাড়া পেয়েছিলেন। কিন্তু তার দু’মাস পর ভোটের ফলাফল পাল্টে গেল, কারণ নীতীশ কুমার মহিলাদের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা জমা করে আসল কাজটি করে দেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই এসআইআর-এর বিরোধিতা করেছেন এবং আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। কারণ এই ভুয়ো-ভোটার শাসক দলের সম্পদ। গত ১৫ বছরে যে দুর্নীতির বাতাবরণ তৃণমূল এই রাজ্যে ছড়িয়েছে, তার একমাত্র তুলনা শাসক দল নিজেই। এ সব মানুষ কিছুতেই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে না। তৃণমূল দলটাই আজ দিশাহারা, সংখ্যালঘু ভোট হয়তো অনেকাংশেই মুখ ঘুরিয়ে নেবে তার থেকে। কংগ্রেস ও বামেদের ভোটের আগে জোট না হলেও, এদের হাত ধরে একটা তৃতীয় শক্তির উত্থান হতেই পারে। আবার, ভোটের ফল ত্রিশঙ্কু হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে, এ বারের ভোট কতটা গণতান্ত্রিক পথে হয়, তার উপর।
দিলীপ কুমার সেনগুপ্ত, বিরাটি, উত্তর ২৪ পরগনা
বিস্মৃত যাঁরা
অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘পথ দেখালেন যাঁরা’ (২৩-১) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে বাংলায় বোমা তৈরির কাজে উল্লাসকর দত্ত ও হেমচন্দ্র দাসের পাশাপাশি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন রসিকলাল দত্ত, সুরেশচন্দ্র দত্ত, অমৃতলাল হাজরা প্রমুখ বিপ্লবী। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রিয় ছাত্র রসিকলাল দত্ত সে সময় বোমার মশলা নিয়ে রীতিমতো গোপনে গবেষণা করতেন। মুরারিপুকুর বোমা মামলার পর চন্দননগর, রাজাবাজার বোমা তৈরি ও সরবরাহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিপ্লবী অমলেন্দু বাগচীর অগ্নিযুগের আগ্নেয়াস্ত্র বই থেকে জানা যায়, চন্দননগর এবং রাজাবাজার এলাকায় বিপ্লবী ডেরায় তৈরি হত শক্তিশালী বোমা। শ্রীঅরবিন্দের পুদুচেরি প্রস্থানের পর চন্দননগরে বোমা তৈরির দায়িত্ব পড়ে শ্রীরামপুরের সুরেশচন্দ্র দত্তের উপর। এখানে অনুশীলন সমিতির সক্রিয় কর্মী অমৃতলাল হাজরা টিনের কৌটোর বদলে কাস্ট আয়রন ব্যবহার করে প্রবল শক্তিশালী বোমা তৈরি করেন। আক্রমণকে মারাত্মক করতে কাস্ট আয়রনের তৈরি পিকরিক অ্যাসিডের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন এই বোমার ব্যবহার শুরু হয় ১৯০৯-এর পর থেকেই। এক সময় বারীন্দ্রকুমার ঘোষের পরিকল্পনা থেকে জন্ম নেওয়া মুরারিপুকুর কারখানা ছাড়িয়ে বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে বোমা তৈরি হতে থাকে। বোমা তৈরিতে বিপ্লবী নগেন্দ্রনাথ ঘোষের নামও জড়িয়ে পড়ে। এমনকি এ কাজে পরোক্ষে সাহায্য করেন রসায়নের শিক্ষক লাডলিমোহন মিত্র এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রমুখ বিজ্ঞানীও।
স্বাধীনতা-বিপ্লবীদের বন্দিদশা আর বন্দিশালার ‘পিঞ্জরাবদ্ধ পশু’-র মতো জীবনের কথা লিখে গেছেন দীপান্তর-দণ্ডপ্রাপ্ত বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদনমোহন ভৌমিক প্রমুখ বিপ্লবী। এঁদের লেখা থেকে জানা যায় জেলে কত অত্যাচারই না সইতে হয়েছিল তাঁদের। তবু দিনরাত ঘানি টেনে, পিঠে চাবুক সহ্য করে, অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে, ডান্ডা বেড়ি আর চটের লজ্জানিবারণের বস্ত্রখণ্ড পরে নির্জন কুঠুরিতে থেকে দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে স্বপ্ন রচনা করেছিলেন বন্দি-বিপ্লবীরা। আজ তাই তাঁদের কথা বেশি করে ভাবার সময় এসেছে।
সুদেব মাল, তিসা, হুগলি
নজরে আসুক
নবান্ন হওয়ায় হাওড়া শহরের কৌলীন্য বেড়েছে, কিন্তু কিছু মৌলিক সমস্যা থেকে গিয়েছে। শিবপুর ফেরিঘাট যাওয়ার রাস্তায় ফোরশোর রোড সংযোগস্থলটি একটি অতি ট্র্যাফিক-প্রবণ জায়গা। কিন্তু এখানে ট্র্যাফিক পুলিশের দেখা মেলে না। থাকলেও দু’টি রাস্তায় এক জন থাকেন। ফলে মানুষের রাস্তা পারাপারে সমস্যা হয়। গোটা বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনতে চাইছি।
আশিস ঘোষ, শিবপুর, হাওড়া
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)