সুমন্ত্র বসুর লেখা ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ছায়া’ (২৬-১) প্রবন্ধটি পাঠ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পেরে দু’-চার কথা লেখার ইচ্ছা হচ্ছে।
আমরা বর্তমানে যে সমাজে বাস করছি, সেখানে নাগরিক থেকে প্রায় প্রজায় পরিণত হয়ে গিয়েছি। কাগজে-কলমে আমরা দেশের নাগরিকই রয়েছি, কিন্তু অন্তরাত্মায় ক্রমশ রাজতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। হয়তো এখনও আমাদের ভোটাধিকার আছে এবং নিয়মিত নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু সেই সব নির্বাচনে যে ধরনের হিংসা ও ভোটে কারচুপি দেখা যায়, তাতে নির্বাচন আদৌ কতটা সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থশক্তির দাপট, সমাজমাধ্যমের অপব্যবহার এবং ভুয়ো খবরের লাগামছাড়া প্রসার। এর ফলে জনমত এমন ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে যে, প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটছে না। সব কিছুর ঊর্ধ্বে শিক্ষাব্যবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে, কোনটি সমাজের পক্ষে হিতকর আর কোনটি নয়, এই তফাত করার ক্ষমতা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। আজ টেলিভিশন খুললে প্রকৃত খবর পাওয়া দুষ্কর। আলোচনার নামে অকথা-কুকথা ছাড়া বিশেষ কিছু শোনা যায় না। অবশ্য কিছু জ্ঞানী, বিচক্ষণ মানুষ এখনও আছেন, যাঁরা মূল্যবান কথা বলেন। কিন্তু সেই কথাগুলি শাসক দলের বিরুদ্ধে গেলেই এমন চিৎকার শুরু হয় যে দর্শক-শ্রোতা তা ভাল করে বুঝতেই পারেন না।
আসি জনপ্রতিনিধিদের কথায়। আইনসভায় জনগণের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় না; যা হয়, তা অনেক সময় জুতো ছোড়াছুড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকে। আইনসভার সদস্যরা যখন বক্তব্য রাখেন, তখন তা মাছের বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে অত্যুক্তি হয় না। আইনসভায় এমন সব মানুষকে আমরা দেখতে পাই, যাঁদের দ্বারা আইন প্রণয়ন সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এর মূলে বহুবিধ কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম হল, দিন দিন রাজনৈতিক চেতনার মান ক্রমাগত নিম্নগামী হওয়া।
এই দেশের মানুষদের পক্ষে এমন একটি ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’-এর উত্থান রোধ করা অসম্ভব না-হলেও যে অত্যন্ত কঠিন, তা অস্বীকার করা যায় না। তবু হতাশ হওয়ার অবকাশ রাখি না। বরং আশা রাখি, শুভবুদ্ধির জাগরণ ঘটবেই।
জীবন কৃষ্ণ ঘোষ, চুঁচুড়া, হুগলি
হেনস্থার অস্ত্র?
যৌক্তিক অসঙ্গতি নিয়ে ‘নির্দেশ’ (২১-১) শীর্ষক সম্পাদকীয়টি যুক্তিসঙ্গত। বাংলা তথা দেশের নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা চলল, তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া যেন পর্যবসিত হয়ে গেল ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক নির্মম উৎসবে। বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে বয়সের ফারাক কোন যুক্তিতে এক জন ভোটারকে সন্দেহজনক করে তোলে, সাধারণ বুদ্ধিতে তার জবাব নেই। কোথাও প্রশ্ন তোলা হল, ‘আপনার ছয়-সাতটি সন্তান কী ভাবে হল?’ নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জবাব দিতে হবে কেন? এ সব বিষয় আদৌ কী করে সন্দেহের কারণ হতে পারে? শুনানিতে বহু ক্ষেত্রে জানতে চাওয়া হয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম কেন। এর উত্তর চাওয়ার অধিকার নির্বাচন কমিশনের আছে?
তা হলে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ কি শুধুই ভোটারদের হেনস্থা করার জন্য নির্বাচন কমিশনের হাতে এক নতুন অস্ত্র? যে কোনও ছুতোয় নাগরিকদের হাতে শুনানির নোটিস ধরিয়ে দিতে দেখা গেল। চট্টোপাধ্যায় কেন ‘চ্যাটার্জি’, কিংবা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন ‘ব্যানার্জি’ লেখা হল, তার কারণ জানতে চাওয়া হল। এর ফলস্বরূপ অশক্ত, অসহায়, অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মাইলের পর মাইল হেঁটে কমিশনের কর্তাদের কাছে গিয়ে জবাবদিহি করতে হল। তার পরেও ভোটার তালিকায় নাম থাকবে কি না, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই।
একই কষ্ট বিএলও-দের ক্ষেত্রেও। নিত্যনতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, যা এসআইআর প্রক্রিয়াকে সহজ-সরল করার বদলে আরও জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছে, অনেকটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই। একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই যে বাংলায় এসআইআর কার্যকর করতে নামা হয়েছে, তা এমন কর্মকাণ্ডেই পরিষ্কার হয়ে গেল।
রতন চক্রবর্তী, উত্তর হাবড়া, উত্তর ২৪ পরগনা
প্রাণের দাম নেই
নাজিরাবাদে কুড়ি জনেরও বেশি মানুষের নির্মম মৃত্যু— এ কি শুধুই মৃত্যু? পরিবারের আর্তনাদ বাম-ডান রাজনৈতিক দলগুলিকে কি সত্যিই ব্যথিত করেছে? শ্রম কেনার স্বেচ্ছাচারিতা, শ্রমিকের প্রাণের প্রতি নির্লিপ্ততা, শ্রমিকের গণতান্ত্রিক নাগরিক থেকে দাসে পরিণত হওয়ার প্রথা, এগুলিকে অপরাধের কারণ হিসাবে ভাবব না কেন? দেড়শো কোটির দেশে শ্রম সহজলভ্য বলেই কি শ্রমিকের প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ নয়?
কত জন অকালে চলে গেলেন, তাতে কী-ই বা গেল এল? না ভোটে, না জনসংখ্যায়। গেল শুধু পরিবারগুলোর, কানে ভাসে সর্বনাশা হাহাকার। নিশ্চয়ই নাজিরাবাদও আর জি কর-কাণ্ডের মতো অন্য খাতে বইবে। শ্রমের কেনাবেচা যেমন চলছে, তেমনই চলবে। ঘটনাটি ‘ব্যতিক্রমী দুর্ঘটনা’ বলে চিহ্নিত হবে। সত্য রয়ে যাবে অন্ধকারে। মৃত্যুর আগের সেই সম্মিলিত আর্তনাদ নাজিরাবাদের আকাশে ঘুরে ঘুরে এক সময় মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাবে।রাজনৈতিক মঞ্চ বাগ্যুদ্ধে প্রবল ভাবে আন্দোলিত হবে। দু’-চারটি ভোট এ-দিক ও-দিক হবে, এই যা।
আর যৌবন-চঞ্চল প্রাণ শ্রম বিক্রি করতে ঘর ছেড়ে এসে কেবলই পুড়ে মরবে। ফুল, ব্যানার, ফেস্টুন বেঁধে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। তার উপর দাঁড়িয়ে ‘গেল গেল’ রবে দেশপ্রেমের বার্তা দেবে, লাল, সবুজ, গেরুয়া বা তেরঙা, নানা রঙের দল। অথচ আসল সত্য গণতন্ত্রের ফাঁক গলে অতল প্রহরে তলিয়ে যাবে। আবার এক ঝাঁক মৃত্যু ধেয়ে আসবে আমাদের দিকে।
ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া যাবে না তো, কারণ সেটা তো ‘রাষ্ট্রবিরোধী’। শাসনের রক্তচক্ষু, আইনের রশ্মি তাক করে আছে।
মহীদাস ভট্টাচার্য, কলকাতা-৮৪
সম্মান প্রাপ্য
‘বাস আটকাল পুলিশ, রাস্তায় লোহার পাত, অপ্রতিরোধ্য আশাকর্মীরা’ (২২-১) শীর্ষক সংবাদটি পড়ে আশাকর্মীদের উপর পুলিশের অমানবিক আচরণের তীব্র নিন্দা করছি। আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। তাঁরা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করেননি, অগ্নিসংযোগেও জড়াননি। তা সত্ত্বেও পুলিশের পক্ষ থেকে এত বাধা কেন দেওয়া হল?
আশাকর্মীদের দাবিগুলি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। এই বাজারে সামান্য মাসিক ভাতায় সংসার চলবে কী করে? তাঁদের বেতন মাসে ১৫ হাজার টাকা করার দাবি ন্যায়সঙ্গত। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, জল উপেক্ষা করে বছরের ৩৬৫ দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আশাকর্মীরা যে ভাবে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তার পরও তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা ভাবার মতো সময় কি প্রশাসনের নেই? এই কাজের জন্য পরিবারের প্রতি কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাঁদের। বিনিময়ে প্রশাসন কি প্রাপ্য সম্মানটুকু দেবে না? অবিলম্বে তাঁদের বকেয়া পরিশোধ করে বেতনবৃদ্ধির দাবিটি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
অতীশচন্দ্র ভাওয়াল, কোন্নগর, হুগলি
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)